সন্ধান২৪.কম : অবিবাহিত প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার তার আত্মসাতের সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ৭০ থেকে ৮০ জন নারীর অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছেন। ওইসব নারীর অধিকাংশই ব্যবসায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং পিকে হালদারের বান্ধবী ও ঘনিষ্টজন। লুট করা ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে পিকে হালদার বিদেশে মাত্র ৪শ’ কোটি টাকা পাচার করেছেন।ওইসব টাকায় কানাডায় বাড়ি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সিঙ্গাপুর এবং ভারতে বিনিয়োগ ও সম্পদ গড়েছেন।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পিকে হালদার । বাকি সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা পিকে তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে সরিয়েছেন। ওই টাকা দেশেই তার ঘনিষ্টজন রুনা ও আবন্তটিকাসহ অনেকের কাছে আছে। কিন্তু পিকে দেশে না ফেরায় এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না দুদক। এছাড়া পিকে হালদারের গ্রেফতারি পরোয়ানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। রোববার (২০ ডিসেম্বর) দুদক আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের বিষয়ে আমরা আরও কিছু তথ্য পেয়েছি। দুদকের অনুসন্ধানে জানতে পেরেছি, তিনি অবিবাহিত এবং অবিবাহিত থাকার সুবাদে পাচারের কোটি কোটি টাকা ৭০ থেকে ৮০ জন গার্লফ্রেন্ডের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছেন। আমরা সেসব অ্যাকাউন্টের বিষয়েও অনুসন্ধান করছি। দুদক সূত্র জানায়, দেশে ফেরার পর গ্রেফতারের নির্দেশ জারি করার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেকো পিকে হালদার আদৌ দেশে ফিরবে কিনা এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পিকে হালদার দেশে ফেরার জন্য আদালতে একটি আবেদন করেছেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে দেশে ফেরা মাত্র তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয় আদালত। এর পরই তার দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে। মূলত ১০ হাজার টাকার মধ্যে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা দেশের ৮৫ ব্যক্তির ৩৫ থেকে ৪০ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ রয়েছে। এসব টাকা সরিয়ে নেয়ার জন্য পিকেসহ ২০ থেকে ২২ জন জড়িত। দুদক ৮৫ ব্যক্তির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করলেও টাকা আদায় হয়নি। মূলত ২০ থেকে ২২ জনের অধিকাংশই পিকে হালদারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মী। এরা সবাই দেশে আছে। এরা চাচ্ছে না পিকে হালদার দেশে ফিরুক। কারণ দেশে ফিরলেও অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারে পিকের সঙ্গে এরাও ফেঁসে যাবে।
দুদকের কাছে তথ্য আছে, এখন পর্যন্ত ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এরমধ্যে ৪শ’ কোটি টাকা ভারত, কানাডা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা। বাকি ৯ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা দেশে থাকা ২০ থেকে ২২ জনের পকেটে। তারা দেশেই বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ মা মামলার মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচতে ওই চক্রের সদস্যরা ১০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের দায় শুধু পিকে হাদলারের ওপর চাপাচ্ছে। কারণ পিকে হালদার বর্তমানে দেশে নেই অথবা কানাডায় অবস্থান করছেন। ২০ থেকে ২২ জনের ওই চক্রটি সব দায় পিকে হালদারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা গিলে হজম করার চেষ্টা করছেন। কোন কারণে পিকে হালদার দেশে না ফিরলে অথবা তাকে দেশে না আনা গেলে পুরো টাকাটাই হজম করা সম্ভব বলে মনে করছে দেশে থাকা পিকের সহযোগীরা।
দুদুক সূত্র জানায়, হাল ইন্টারন্যাশনাল, এমওএইচ ফ্যাশন লি., আনান কেমিক্যাল, ডেনিম প্রসেসিং প্ল্যান লি., সন্দীপ করপোরেশন, পদ্মা ওয়েভিং লি., রেপলাইট ফার্ম, দেয়া সিপিং লি., আমারা হোল্ডিং লি., মুন এন্টারপ্রাইজ, মেলেডি হোমস, ওরিয়াল লি., পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, এসএ এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া হয়। অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের ঘটনায় প্রশাস্ত কুমার হালদারকে সহযোগিতা করেন রেপটাইল ফার্মের চেয়ারম্যান রাজিব সোমের স্ত্রী শিমু রয়, পরিচালক মোস্তাসিন বিল্লাহ উজ্জ্বল কুমার নন্দী, হাল ইন্টারন্যাশনাল লি.-এর পরিচালক স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অমিতাভ অধিকারী, হাল ইন্টারন্যাশনাল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুস্মিতা সাহাসহ অনেকেই। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক, পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. নুরুজ্জামান, এভিপি আল মামুন সোহাগ, সিনিয়র ম্যানেজার রাফজান রিয়াদ চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং-এর পরিচালক নওশেরুল ইসলাম, মো. আনোয়ারুল কবির, রাশেদুল হক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং-এর সাবেক চেয়ারম্যান এমএ হাসেম, পরিচালক নাসিম আনোয়ার, বাসুদেব ব্যানার্জী, মোহাম্মদ আবুল হাশেমসহ অনেকেই অর্থ লুটের সঙ্গে জড়িত।
জানা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেই ১৫শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে। এছাড়া সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ সময় গোপনে কানাডায় পাড়ি জমান তিনি। এদিকে আদালতের পূর্ব নির্দেশনা অনুসারে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার অগ্রগতি প্রতিবেদন, মামলার এফআইআর ও সম্পত্তি-অর্থ জব্দের আদেশ হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়। পিকে হালদারের আত্মীয় পিপলস লিজিংয়ের সাবেক পরিচালক অমিতাভ অধিকারী এবং পিকে হালদারের সাবেক সহকর্মী ও পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দীকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় পক্ষভুক্ত করা হয়। এরপর আদালত মামলার পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৩ জানুয়ারি শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। গত ৯ ডিসেম্বর বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একই বেঞ্চে দেশে ফেরত এলে পিকে হালদারকে কোনরকম গ্রেফতার না করার নির্দেশনা চেয়ে একটি আবেদন করে তার প্রতিষ্ঠান আইএলএফএসএল। সে আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত জানিয়েছিলেন, পিকে হালদার কবে, কখন, কীভাবে দেশে ফিরতে চান, তা আইএলএফএসএল লিখিতভাবে জানালে সে বিষয়ে পরবর্তী আদেশ দেয়া হবে। পরবর্তী সময়ে পিকে হালদারের দেশে ফেরার বিষয়ে গত ২০ অক্টোবর হাইকোর্টকে জানায়। পিকে হালদারের প্রতিষ্ঠান আইএলএফএসএল’র পক্ষ থেকে হাইকোর্টকে জানানো হয়, ২৫ অক্টোবর দুবাই থেকে অ্যামিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা আসার জন্য টিকিট কেটেছেন তিনি। বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনার পর প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারকে দেশে ফেরার অনুমতি দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে পিকে হালদার দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশের আইজি এবং ইমিগ্রেশন পুলিশকে নির্দেশ দেন আদালত। পাশাপাশি কারাগারে থাকা অবস্থায় পিকে হালদার যেন অর্থ পরিশোধের সুযোগ পান সে বিষয়ে সুযোগ দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পিকে হালদারের দেশে ফেরার বিষয়ে আইএলএফএসএলের করা আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব আদেশ দেন। তবে পরে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দেশে ফেরেননি।


