অভূতপূর্ব বিগ্রেড,কেঁপে উঠলো পশ্চীমবঙ্গ, মানুষের সরকার গঠনের প্রত্যয়

সন্ধান২৪.কম ডেস্ক : পশ্চীমবঙ্গসহ ভারতের মানুষ চাক্ষুষ করল নজিরবিহীন এক সমাবেশ। একটা চমক দিল ২০২১ এর সংযুক্ত ফ্রন্টের ২৮ শে ফেব্রুয়ারির ব্রিগেড। জন জোয়ারের বন্যায় ভেসে যাওয়া একটা ব্রিগেডিয় জনসভা। এই জনসভা গত দেড় দশকেও দেখা যায়নি । মেনে নিয়েছে রাজনৈতিক মহল।

 কলকাতার ব্রিগেডের জনসমুদ্র হয়ত প্রমাণ করবে অনেক কিছুই।হাজার হাজার তরুণ-যুবকের উপস্থিতি এ বিগ্রেডকে নতুুন মাত্রা এনে দিয়েছে।  থাকছে এমন কিছু ইঙ্গিত , যেটা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণকে অনেকটাই প্রভাবিত করবে। 

 বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাম-কংগ্রেস জোট এবং তাদের নতুন সঙ্গী ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)  রবিবার কলকাতা ক্রিকেট প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজন করেছিল তাদের নির্বাচন সমাবেশ।  ব্রিগেডের সমাবেশ থেকে বাম কংগ্রেস নেতারা হুংকার দিলেন, বিকল্প চায়।  আইএসএফ ঘোষণা দিলো তারাও এ লড়াইয়ে শামিল।

 সমাবেশে ছিলেন বামনেতা বিমান বোস, মোহাম্মদ সেলিম সূর্যকান্ত মিশ্র কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরী কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন সদ্য রাজনীতিতে পা রাখা আইএসএফ নেতা আব্বাস সিদ্দিকি।

ব্রিগেডে দুটি জিনিষ প্রমাণ করার ছিল , ১) রাজ্যের শাসক দল ,তৃণমূল কংগ্রেস ও প্রধান বিরোধী তথা কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি’কে ছাপিয়ে কতটা নিজেদেরকে প্রমান করতে পারবে বাম ও কংগ্রেস ( সঙ্গে আব্বাস সিদ্দিকির , ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট ) , ২) গত একমাসে বাম ও কংগ্রেসের মাটি ফিরে পাওয়ার লড়াই তে কতটা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে , বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণ যোগ্যতার নিরিখে পৌছাতে পেরেছে দুটি দল ? দুটিকে যদি নম্বর দেবার বিষয়টি থাকে , তাহলে বলা যেতেই পারে , রাজনৈতিক দিক থেকে একেবারে একশোতে একশো। আর সেখান থেকেই নতুন ভাবে অক্সিজেন নিয়ে বাম ও কংগ্রেস আবার তাঁদের পুরোনো মাটি ফেরত পাবার লড়াইতে আগামী নির্বাচনী লড়াইতে ঝাপিয়ে পরতে পারবেন।

কলকাতার বিগ্রেডে আসা লক্ষ লক্ষ মাানুষ দুপুরে লক্ষ্য রাখছিলেন ব্রিগেডের দিকে। তাঁরা যে কথা শুনতে চাইছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দলের কাছ থেকে, সেদিক থেকে তাঁরা অনেকটাই খুশি। কেননা , বামেরা কর্ম সংস্থান থেকে বন্ধ চা বাগানের মানুসের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি কংগ্রেসের কথাতেও স্বচ্ছ শাসন ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে।  অন্য দিকে শিল্পায়নের কথাও এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। ফলে প্রতিদিনকার রাজনৈতিক খেউড় মার্কা একটা বক্তব্য থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছেন ।  সব মিলিয়ে আজকের ব্রিগেড সংযুক্ত ফ্রন্টের হয়ে যে বার্তা দিল, সেটি পশ্চীমঙ্গ আবার আবার রাজনৈতিক ভাবে পরিবর্তন হতে চলেছে, আবার মানুষের হাতে ক্ষমতা যেতে চলেছে । এটা বলা যেতেই পারে ।

হাজার হাজার তরুণ-যুবক ও নারীর উপস্থিতিতে সত্যিই নজিরবিহীন ব্রিগেড সমাবেশ। বসন্তের শুরুর দিকেই এবার রোদের তেজ বেশি। দুপুরে যত দূর চোখ যায়, ব্রিগেড ময়দানে তত দূরই কাস্তে আর লাল নিশান আর মাথার ভিড়। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাম-কংগ্রেস জোটের সমাবেশে এবার নতুন সঙ্গী ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট । বঙ্গের ভোটে সদ্যগঠিত দলের জনপ্রিয়তা যে কতটা, তা বোঝা গেল এই সমাবেশেই। মঞ্চে ভাষণ রাখতে গিয়ে আব্বাস সিদ্দিকি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানালেন। কার্যত হুঁশিয়ারির সুরেই তিনি বললেন, ”নারীদের স্বাধীনতা হরণ করে নিয়েছে মমতা। আমরা স্বাধীনতা ফেরানোর যুদ্ধে নেমেছি। রক্ত দিয়ে মাতৃভূমিকে রক্ষা করব। মমতাকে জিরো করে দেব।” পাশাপাশি বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে অবশ্য তিনি বামেদের স্লোগানই খানিকটা ধার করলেন। স্লোগান তুললেন, ”বিজেপির কালো হাত ভেঙে দেব।” 

‘‌ঐতিহাসিক’‌ বসন্ত ব্রিগেডের মঞ্চে যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল বামেরা। ‌লোকসভা নির্বাচনের পর আত্মবিশ্বাসে যে ভাটা পড়েছিল, তাই যেন পুনরুদ্ধার করা গেল। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ দেখে আত্মপ্রত্যয় যে বেড়েছে, তা মহম্মদ সেলিমের বক্তব্যেও স্পষ্ট। বললেন, ‘‌বসন্ত এসে গেছে, লালরঙা ফুল ফুটবে। কেউ আটকাতে পারবে না।’‌ একসঙ্গে এত লালঝান্ডা উড়তে সত্যিই দেখা যায়নি সাম্প্রতিক অতীতে। সেলিম বলেন, ‘‌লাল ঝান্ডাকে কেউ শেষ করতে পারেনি। কাল ভি হম জিতে থে, আজ ভি জিতেঙ্গে।’‌ সভার শুরুতেই বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, ‘‌‌এমন সমাবেশ অতীতে দেখা যায়নি। বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে এসে বাম–কংগ্রেস। যাঁরা বলেন বামেদের দূরবিন দিয়ে দেখতে হয়, তাঁরা সমাবেশের খবর নিন। আজকের পর একদিকে বিজেপি–তৃণমূল, অন্যদিকে আমরা।’‌ 

তবে সেলিমের ভাষা ছিল একে বারে চাঁচাছোলা। ‘‌দিনবদলের ডাক’ দিয়ে মমতাকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‌লকডাউনের সময়ে মানুষ যখন অনাহারে মরছিলেন, তখন আমরা তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আর এখন যেই ভোট এসেছে, পাঁচ টাকায় ডিম–ভাত দেওয়া হচ্ছে।’‌ তৃণমূল–বিজেপিকে একযোগে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‌লুটেরা লুটেরাদের ধরতে পারে না‌। লুটেরাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে আমাদের যেমন একজোট হতে হবে, তেমনই লুটেরাদের চিহ্নিত করতে হবে।’‌ এই প্রসঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জিকেও আক্রমণ করে বলেন, ‘‌যারা লুট করেছে, আমরা ক্ষমতায় এলে তাদের বাড়ি, সে ‘শান্তিনিকেতন’ হলেও নিলাম করব। চাকরি ক্ষেত্রে সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করব। নিয়মিত এসএসসি হবে, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা হবে।’‌ হুঁশিয়ারি দিয়ে সেলিম বলেন, ‘‌তাপ বাড়ছে আর তৃণমূল গলছে। বিজেপি বাষ্পের মতো উবে যাবে।’‌ দেবলীনা হেমব্রমকেও বলতে শোনা যায়, ‘‌সমাজে ভাইরাস বাসা বেঁধেছে। তার জন্য ভ্যাকসিনের দরকার নেই। আমরাই মারব। পদ্মফুল জলে ভাল, কিন্তু এলাকায় ফুটতে দেওয়া যাবে না।’‌


বাংলার মমতা সরকারের বিরুদ্ধে যেমন তোলাবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তেমনই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘‌দেশ বেচে দেওয়া’র অভিযোগ তুলতে দেখা গেছে বাম–নেতৃত্বকে। গেরুয়া শিবিরের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ‌বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন সূর্যকান্ত মিশ্র, সীতারাম ইয়েচুরি থেকে শুরু করে আরএসপি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য এবং ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা নরেন চ্যাটার্জিদের। তৃণমূলকে ‘‌স্বৈরাচারী’‌, আর বিজেপি ‘ভারতীয় ঝঞ্ঝাটিয়া পার্টি’ আখ্যা দিয়ে গ্রামে গ্রামে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়াজ গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন নরেন চ্যাটার্জি। অন্যদিকে মনোজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্যে রয়েছে ফ্যাসিবাদী সরকার। বিরুদ্ধ–কণ্ঠকে জেলবন্দি করা হচ্ছে। ধর্ম ও ভাষার নামে অসহিষ্ণুতা চলছে। এই লড়াই নিয়ে যেতে হবে গ্রামে গ্রামে। গরিবের ঐক্যই ভারতের বৈচিত্রকে রক্ষা করবে।’‌


সংখ্যালঘুদের জন্য নয়া প্রকল্প, আর্থিক সাহায্য প্রসঙ্গে তৃণমূলকে বিঁধে ইয়েচুরি বলেন, ‘‌ভোটের আগেই কেন এই সাহায্য দেওয়া হচ্ছে?‌ আগে দেওয়া হয়নি কেন?‌ ঘুষ দিচ্ছেন?‌’‌ মমতা এবং এনডিএ জোটের এককালীন সখ্যতার প্রসঙ্গ টেনে ইয়েচুরি বলেন, একুশের ভোটে কোনও দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বিজেপির সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন মমতা ব্যানার্জি। কেন্দ্রের মোদি সরকারকেও আক্রমণ করে বলেন, ‘‌নিজের নামে ক্রিকেট মাঠের নামকরণ করছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই মাঠেই আবার দুই প্রান্ত আম্বানি–আদানির নামে। কর্পোরেটদের ঋণ মকুব করছেন, আর কৃষকদের করতে পারছেন না?‌’ একই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন সিপিআই নেতা ডি রাজাও। 

Exit mobile version