ঋণ সহায়তা পাওয়ার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ঋণ সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ওয়াশিংটনভিত্তিক এ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিয়ান জর্জিয়েভাকে এ সংক্রান্ত চিঠি দিয়ে বাজেট সহায়তা হিসাবে ঋণ চাওয়া হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক এ দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া নিয়ে সৃষ্ট ধূম্রজালের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে রোববার পাঠানো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঋণের অঙ্ক ও সুদহার উল্লেখ করা হয়নি। যদিও বিশেষ বরাদ্দের অধিকারের অঙ্ক হিসাবে বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে ৭শ কোটি মার্কিন ডলার (৭ বিলিয়ন) পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এর আগে ২০১২ সালে এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ৯৮ কোটি ৭০ লাখ (৯৮৭ মিলিয়ন) ডলার ঋণ সহায়তা নিয়েছিল আইএমএফ থেকে। এটি ছিল আইএমএফ থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ঋণ। এ ঋণ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি এককভাবে নির্ভর করছে আইএমএফের ওপর। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই সংস্থাটি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিগত সময়ের রেকর্ড ভালো। এর আগেও আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। সার্বিক দিক ইতিবাচক হলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থার পক্ষ থেকে সাড়া মিলবে। এরপরই উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে। ওই সময় ঋণ পাওয়ার শর্ত ও সুদহার নির্ধারণের বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে আলোচনার মাধ্যমে। ঋণ পাওয়া গেলে এটি ঘাটতি বাজেট মেটানো, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু মোকাবিলায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে।

জানা যায়, এরই মধ্যে পাকিস্তানকে ৪শ কোটি মার্কিন ডলার (৪ বিলিয়ন) এবং তানজানিয়াকে ১০৫ কোটি মার্কিন ডলার (১.০৫ বিলিয়ন) ঋণ সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি। সংকটে পড়ে পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ঘানাও এ সংস্থার কাছে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার (১.৫ বিলিয়ন) ডলার চেয়েছে।

বর্তমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর এসে পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। এতে দেশের আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত বিদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮১৫ কোটি মার্কিন ডলার। এটি আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। এছাড়া ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, ইউরিয়া সারসহ ৯টি পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৮২০ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণও কমেছে। এতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত বছর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের (৪৫ বিলিয়ন) কাছাকাছি ছিল। বর্তমানে এটি নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৭০ কোটি ডলারে (৩৯.৭ বিলিয়ন)।

এছাড়া দেশের ভেতর মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক ঋণ সহায়তাকে এ মুহূর্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইএমএফের ঋণ প্রসঙ্গে গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, চূড়ান্ত কোনো আলোচনা হয়নি। আইএমএফের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা আগেও নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে ঋণ সহায়তা নেওয়া হবে।

আইএমএফের ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরি বলেন, আর্থিক সংকটে পড়লে আইএমএফ সহায়তা করে থাকে। এটি তাদের কার্যক্রমের অংশ। ইতঃপূর্বে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ এ সংস্থার কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নিয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা হিসাবে ঋণ নেওয়া হলে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে কম ঋণ নিতে হবে। এতে সরকারের ঋণ ব্যয় কমবে। কারণ আইএমএফের ঋণের সুদের হার কম। দেশে এখন বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আছে। আমাদের প্রয়োজন তাদের ঋণ সহায়তার। এ ঋণ পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে অনিশ্চয়তাও কাটবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইএমএফকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, এটি এখন প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। ঋণের অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কারণ, নির্দিষ্ট ঋণের অঙ্ক উল্লেখ করে ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। সূত্র আরও জানায়, আইএমএফের ইতিবাচক সাড়ার পর সুদহার নিয়ে আলোচনা হবে। অর্থ বিভাগের ধারণা, সেটি দেড় শতাংশ হতে পারে। তাও নির্ভর করে উভয়পক্ষের নেগোসিয়েশনের ওপর। ওই সময় তারা কিছু শর্ত দিতে পারে। সেটিও আলোচনায় সমাধান করা হবে।

আইএমএফ সাধারণ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়, যা অনেক দেশের বাস্তবায়ন খুব কঠিন হয়। এদিকে গেল সপ্তাহে বাংলাদেশে নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসাবে সফর করেছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। এর মিশন প্রধান ছিলেন রাহুল আনন্দ। এ সময় প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিবিধির সার্বিক খোঁজখবর নিয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে বলে মন্তব্য করলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রপ্তানি আয় অর্জন নিয়ে। এছাড়া রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত এবং আমানত ও ঋণের সুদহার ৯ ও ৬ শতাংশ সীমা প্রত্যাহার করার আহ্বান জানায়। এছাড়া বৈশ্বিক মূল্যের ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া বাজেট অর্থায়ন থেকে সঞ্চয়পত্রকে আলাদা করতে বলা হয়।

Exit mobile version