এক নাবিকের রোজনামচা।। পর্ব – দুই

                                                   

                                                      পর্ব – দুই

                                   মূল (ইংরেজি): মনজুরুল মান্নান ।।  অনুবাদ : মাজহারউল মান্নান

[প্রায় দুই যুগ আগের কাহিনী l এক শিক্ষানবিশ নাবিকের চলার পথে পঞ্চাশোর্ধ এক জাপানি মহিলার সাথে ঘনিষ্ট পরিচয়ের সূত্রে তৎকালীন জাপানী সমাজ ব্যাবস্থার কিছু খন্ড চিত্র উঠে এসেছে তার রোজনামচায় সেই সাথে মিশে গেছে নাবিকের ব্যাক্তি আর সামাজিক জীবনের নানা টানাপোড়ন আর চাওয়া পাওয়ার হিসাবের গরমিল l পাঁচ পর্বে লেখা এই রোজনামচার দ্বিতীয় পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। ] 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পার্কের প্রবেশ মুখে বড় একটা পাথরে খোদাই করে জাপানি ভাষায় লেখা ‘ইয়ামাশিতা পার্ক’।

নিচে ছোট করে ইংরেজিতে লেখা পার্কের নাম l  সাথে দুটো ভাষায় লেখা পার্কটি তৈরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস l 

পার্কের ভেতরে প্রবেশ করতেই আমি হতবাক হয়ে গেলাম। মনে হলো নিখুঁত কারিগর  জাপানি  ঐতিহ্য আর আধুনিকতার  পরিমিত সংযোজনে একটা অসাধারণ  ল্যান্ডস্কেপ  তৈরী করেছে  l হরেক প্রজাতির বনসাই বৃক্ষ। নানা প্রজাতির ঘাস। রংবেরঙের ফুলের গাছ। ছোট ছোট ভাস্কর্য । পাশে  কত্রিম জলাশয়। পানির  কুল কুল  ধারা। পাথর কাঠ আর  ইট সুরকির বিস্ময়কর নির্মাণশৈলী  সবকিছু ছবির মতো সুন্দর l গাছের নিচে বাদামি রঙের পাতা ঝরে পড়ে আছে l  মনে হলো, এই পাতাঝরা গাছের নিচে  শুয়ে পড়লে আগামী তিন মাসেও আমাকে জাগাতে পারবেনা কেউ l অসাধারণ।

চারদিকে পাখির মিষ্টি মধুর কাকলী l  চমৎকার আবহ সংগীত যেন l  কিন্তু পাখি কোথায় ? একটি পাখিও কোথাও চোখে পড়লো না। আসলে গাছের ডালে  গোপনে কোথাও পাখির ডাক প্লেব্যাক হচ্ছে l  চমৎকার একটি ফাঁকিবাজি l জীবন্ত পাখিদের পক্ষে এত চমৎকার করে আবহাওয়া সঙ্গীত তৈরি করা সম্ভব নয় l  তাদের  উপর ভরসা নেই l

পাশে ছোট্ট একটি জলাশয়। তার পাশেই একটা কাঠের বেঞ্চ l হেলান দিয়ে কাঠের বেঞ্চে বসে পড়লাম l

বাইরে বেরোলেই  কিছুক্ষণ পর পর আমার  ক্ষুধা পায় l এটা আমার পুরনো একটা অভ্যাস  l  ছোটবেলায় মনে পড়ে, কিছক্ষণ পর পর মার কাছে যেতাম খাওয়ার জন্য l  মা বিরক্ত হয়ে  বলতেন,  ‘আমাকে দেখলেই কি তোর ক্ষুধা পায় ? দীর্ঘদিন পর হঠাৎ মা’র কথা মনে পড়তেই মনটা কেমন হয়ে গেল।

ব্যাগ থেকে একটা সবুজ রঙের আপেল বের করে খাওয়া শুরু করলাম l  খেয়াল করিনি আমার পাশে সামান্য দূরে একটা বেঞ্চে একজন ভদ্রমহিলা বসে আছেন l  পঞ্চাশোর্ধ  বা তার কিছু কম  হবে l  খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছেন l তিনি আমার খাওয়ার ধরণ দেখে কিঞ্চিৎ  হাসলেন  l হাসিটার  মানে  এরকম দাঁড়ায়, ‘তোমার কি খুব বেশি ক্ষুধা পেয়েছে? ঠিক আছে, আরাম করে খাও’ l

ক্ষুধার পরিমাণটা বেশি হলেও কোনো শব্দ না করে একটু ভদ্রভাবে খাবার চেষ্টা করলাম l মনে হলো, ভদ্রমহিলা নিশ্চয় খারাপ কিছু ভাবছেন।

আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রমহিলা পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, তুমি কি আশপাশেই থাকো ?

আমি আমার পুরোনো ভাঙা রেকর্ড বাজালাম, আমি একজন নাবিক l  আমার জাহাজ এই বন্দরে এসেছে l আমি আপনাদের এই  চমৎকার বন্দর শহরটিকে দেখার চেষ্টা করছি l  আপনার সহানুভূতির জন্য অনেক ধন্যবাদ, ইত্যাদি l ‘

ভদ্রমহিলা এবার একটু আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালেন l

:এত অল্প বয়সে নাবিকের জীবন বেছে নিয়েছো তুমি ?

খুব সম্ভব তার ধারণা নাবিক মানে সেই দাড়িওয়ালা বয়স্ক দূরবীন হাতে ক্যাপ্টেন জেমস কুক l

তোমার বাবা মা কোথায় থাকেন ? কতদিন  তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করোনি?  বাবা মার সাথে কবে শেষ কথা হয়েছে?

অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে করে  আমার দিকে ফিরে  বসলেন l হাতের বইটি বন্ধ l

তিনি চশমার রিং মুছতে মুছতে বললেন, নিশ্চয়ই কিছু দিনের মধ্যেই দেশে যাবে ?

মনে হয় না l এরপর জাহাজ ঠিক কোথায় যাবে,  কোন বন্দরে যাবে,  আমি সঠিক জানিনা l তিন বা  ছয় মাস লেগে যেতে পারে l আমি চটপট জবাব দিলাম।

 উত্তরটা সম্ভবত আশা করেননি তিনি l বিস্মিত হয়ে  বললেন, সেটা তো অনেক লম্বা সময়!

মুখের কোনে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,  বাবা মাকে ভালোবাসো না ? নিশ্চয়ই  তাদের কথা মনে পড়ে?’

মাথা নিচু করে জলাশয়ের পানির দিকে তাকিয়ে  থাকলাম l সেটার কোনো  অর্থ হতে পারে, আবার   নাও হতে পারে l  

হফস্টেড’র ‘কান্ট্রি মাসকুলিনীটি -ফেমিনিটির রেঙ্কিং’ পড়েছিলাম  জাপানে আসার আগে l  জাপানিদের ব্যাপারে অনেক কথা বলা হয়েছে l  সারাংশ হল জাপানি জাতি হাই মাস্কুলিন ক্যাটাগরিতে পড়ে l তারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রভুত্ববাদে চরমভাবে  বিশ্বাসী l মেয়েদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর l বাড়িতে একটি মেয়ে যদি কোন কারণে বেঁধে দেয়া সময়ের পরে আসে এবং বাবা যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে ? এই মেয়ে সারারাত অপমানের অনুশোচনায় অন্তত তিনবার আত্মহত্যা করার চিন্তা করবে  l

বইটাতে শেষে অবশ্য জাপানিজ মহিলাদের সম্পর্কে অনেক ভালো কথা বলা  হয়েছে I বলা হয়েছে, তারা হলেন জগতের শ্রেষ্ঠ বধূ , কন্যা এবং মাতা l আরও বলা  হয়েছে ‘মাসকুলিনিটি -ফেমিনিটি’ বিষয় নিয়ে জাপানি মেয়েদের কোনো মাথাব্যাথা নেই l ছেলেরা একটু দয়ালুচিত্তে কথা বললেই তারা   তাদের আগের সব অপকর্ম ভুলে যায় l

মনে হলো ভদ্রমহিলা হলেন এই প্রজাতি ভুক্ত l খেয়াল করলাম, এক ধরণের সহানুভূতির চোখ আমার দিকে তাকাচ্ছেন তিনি। 

চলো একটা কাজ করি। এই পার্কের গেটের কাছে একটি  ফোন বুথ আছে, সেখানে গিয়ে তোমার মাকে একটা ফোন করি l আমার কাছে কিছু খুচরো কয়েন আছে সেটা দিয়ে হয়ে যাবে l  তোমার মা নিশ্চয়ই খুশিতে অবাক হবেন, জ্ঞানও  হারিয়ে ফেলতে পারেন। বলেই  হাসলেন l

শুকনো  মুখে বললাম, আমাদের বাসায় ফোনলাইন নেই l

ও দুঃখিত l একটু আশ্চর্য হয়ে  দ্রুত  প্রসঙ্গ চেঞ্জ করলেন তিনি l

বললেন, তোমার সঙ্গে জাপানি ছেলেদের একটা মিল আছে’ l

আমি বিস্ময়ে আমার নিজের দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কিভাবে, কোনদিক থেকে?

তিনি  কিছুটা চিন্তা করে বললেন, দেখো, তোমার উচ্চতা জাপানি এভারেজ ছেলেদের কাছাকাছি’l  

তার মানে হলো বেটে l একটু অন্য ভাবে বলা হলো l খারাপ লাগলো না l 

আর মাথায় অনেক চুল এবং চুলগুলো সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বলেই হেসে ফেললেন l

 বললাম, আর গায়ের রংটাও  নিশ্চয়ই  কাছাকাছি ?’

একটা বড় রকমের  শব্দহীন হাসি হাসলেন l 

 ছোটবেলায়  মাকে প্রায়শই পাড়াপ্রতিবেশী আক্ষেপ করে বলতো, ভাবি, আপনার ছেলে-মেয়েরা একটাও আপনার গায়ের রং পায়নি  l মা হেসে বলতেন, সাদা কালোর মিশ্রণে একেবারে সাদা কিছু কীভাবে হবে?  

ওহো,  আমার পরিচয়টা  এখনো দেওয়া হয়নিl বলেই  হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি l

আমার নাম ‘এমিকা ইয়ামাশিতা l  আমার বাসা এখন থেকে কাছেই l ডান পাশে এক্সপ্রেসওয়ে টা পার হলে ‘সিয়ামএ শিতা জুনিয়র স্কুল’ তার পরেই আমার বাসা l এই  স্কুলটাতে জুনিয়র ক্লাসে আমি ইংরেজি পড়াই’l যদিও আমি আসলে ইংরেজি অতোটা ভালো জানিনা l

বললাম, আশ্চর্য, এই পার্কের নামে তোমার নাম, স্কুলটার নামও প্রায় তোমার নামের কাছাকাছি l

‘পার্কটির  বয়স  প্রায় চল্লিশ l যে স্কুলটিতে এখন পড়াই, সেখানে আমি  ছোটবেলায় পড়তাম l  সাগরের  ধারে পার্কটি তৈরী করার পর অনেকদিন পর ওপেন করা হলো l স্কুল ছুটির শেষে আমরা সবাই বান্ধবীরা ছুটে  আসতাম এই পার্কে l  সবাই মিলে পার্কে লুকোচুরি খেলতাম l

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় সাতটা বাজে l বাইরে বেশি ঠান্ডা পড়ার  আগেই  জাহাজে পৌঁছাতে হবেl

মাথা নিচু করে জাপানি কায়দায়  বললাম, ‘আমাকে সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ l তোমার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগলো’l

ওহো তোমার নামটাই তো জানা হয়নি। সহসা যেন কথাটা সনে পড়লো তার।

বললাম, আমার নাম মনজুরুল মান্নান l

তোমার বাবা-মা তোমাকে কি এই লম্বা কঠিন নামটি  ধরেই ডাকে?

আমি হেসে বললাম না,  টুটুল বলে ডাকে’ l

ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেবো l তিনি পিছন থেকে ডাকলেন,

টুটুল, তুমি কি কাল এই সময় এখানে আবার আসবে? 

একটু চিন্তা করে মাথা নেড়ে  বললাম, হ্যাঁ আসবো  l

( চলবে )

 

 

Exit mobile version