পর্ব – পাঁচ
এক নাবিকের রোজনামচা ।।
মূল (ইংরেজি): মনজুরুল মান্নান অনুবাদ : মাজহারউল মান্নান
(প্রায় দুই যুগ আগের কাহিনী l এক শিক্ষানবিশ নাবিকের চলার পথে পঞ্চাশোর্ধ এক জাপানি মহিলার সাথে ঘনিষ্ট পরিচয়ের সূত্রে তৎকালীন জাপানী সমাজ ব্যাবস্থার কিছু খন্ড চিত্র উঠে এসেছে তার রোজনামচায় l সেই সাথে মিশে গেছে নাবিকের ব্যাক্তি আর সামাজিক জীবনের নানা টানাপোড়ন আর চাওয়া পাওয়ার হিসাবের গরমিল l পাঁচ পর্বে লেখা এই রোজনামচার পঞ্চম পর্ব (শেষ পর্ব) আজ প্রকাশিত হলো। )
একটা বন্দরে কিছুদিন থাকার পর বন্দরের আশেপাশের কিছু মানুষ, দোকান পাট, এজেন্ট , স্টিভেডর, সবার সাথে একধরণের সখ্য গড়ে উঠে l খুব বেশি দূর গড়ায় না l জাহাজ বন্দর ছেড়ে দিলে এক দুই দিনের মধ্যেই সব ভুলেও যায় l নতুন বন্দরে আসার পর নাবিক আর এক নতুন মানুষ I পেছনের মেমরি ডিলিট করে দেয় সে l অনেকটা যাযাবর জিপসিদের জীবন l এই জিপসি জীবনের ধারাবাহিকতা এবং অভ্যস্ততা নাবিকদের ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গভীর দাগ রেখে যায়। সেটা কারো ক্ষেত্রে কম কারো বা বেশি l
বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে সমাজের কলুষতা আর সংকীর্ণতা যেমন তাদের ভিতর প্রবেশ করেনা, তেমনি সময়ের সাথে সমাজের জটিল পরিবর্তনগুলোকে মানিয়ে নিতে পারে না l ব্যাতিক্রম যে নেই, তা নয় l সেটার জন্য কঠিন ধর্মীয় অনুশাসন আর আত্মার অনুশাসন (ইনার ডিসিপ্লন) খুব দরকার l
অনেকে হয়তো আমার সাথে দ্বিমত প্রকাশ করবেন, বিংশ শতাব্দীর এই উন্নত কমুনিকেশনের যুগে (স্যাটেলাইট ফোন, ইন্টারনেট) জাহাজের জীবন বিচ্ছিন্ন কোন জীবন ধারা নয় l জাহাজীদের মাঝে একটি প্রচলিত কথা আছে যে বিধাতা তিন ধরণের মানুষ প্রজাতি তৈরি করেছে,l ম্যান, ওম্যান এন্ড সিমান, নাবিক l এই বিংশ শতাব্দীতে বসে নতুন জেনারেশনের নাবিকরা হয়তো সেই প্রবাদের অপবাদ কিছুটা হলেও লাঘব করতে পেরেছে l তবে আমার চোখে এখনো নাবিক হলো উড়ন্ত সাদা এক গাংচিল, যার ভৌগোলিক সীমানা হলো খোলা আকাশ l ধর্মীয় এবং সামাজিক সকল বন্ধনের বাইরে এক ইউনিভার্সাল সিটিজেন l
ইঞ্জিন রুমে একটা প্রয়োজনীয় কাজ সেরে জাহাজ থেকে যখন বের হলাম তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে l জাহাজের ইঞ্জিন রুম চলে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা l কোনো কাজ ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই l
ইয়ামাশিতার বাড়িতে পৌঁছতে ছয়টা বেজে গেলো l গেট থেকে দেখলাম বাগানের পাশে একটা হেলান চেয়ারে চোখ বুজে শুয়ে আছে সে l কুকুরটা পশে l চেনা মানুষ দেখে কোনো সাড়া শব্দ করলো না l
ইয়ামাশিতার খুব কাছে এসে বললাম,কোনবানানা চোষি দো, শুভ সন্ধ্যা,কারাদ নো চোষি ওয়া দো,তোমার শরীর ঠিক আছে?
চোখ খুলে একটা ম্লান হাসি দিয়ে সে ইশারায় পাশের চেয়ারে আমাকে বসতে বললো l
তোমাকে কিছুটা অসুস্থ লাগছে, কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা মাপার চেষ্টা করলাম l হালকা জ্বর l
কাল তোমার ওখান থেকে আসার পর শরীর কিছুটা খারাপ লেগেছে, বয়স হয়েছে তো, একটু কায়িক পরিশ্রম করলেই শরীর নিতে পারেনা। ওষুধ খেয়ে নিয়েছি , ঠিক হয়ে যাবে l

আমার ধারণা, জাতিগতভাৱে জাপানিরা খুব একটা সমাজবদ্ধ নয় l এরা একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা , বিচ্ছিন্নতা পছন্দ করে l সেটা হয়তো তাদের কন্সেন্ট্রেশন আর ক্রিয়েটিভ ক্ষমতা বাড়ায় l প্রতিবেশীদের সাথে এদের সম্পর্কটা মাথা নিচু করে ‘অজিজি’(বাউ) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ l এর বাইরে একটা কথাও বলা যাবেনা l ছেলে মেয়ে, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন, সবজায়গায় সম্পর্কের একটা অলিখিত বাউন্ডারি l ইতিহাস বলে ‘অজিজি’ (বাউ) কালচার এসেছে চারশো বছর পূর্বের সামুরাই তথা ওয়ারিয়র বা সামরিক বাহিনীর প্রচলিত কঠোর নিয়ম থেকে l কিন্তু সেটা কীভাবে প্রতিটি সাধারণ মানুষের ভেতর গেঁথে গেলো সেটা একটা গবেষণার বিষয় l এটা কতোটা চাপিয়ে দেয়া, কতোটা শতবর্ষের অভ্যস্ততা আর কতোটা পুরাতন মূল্যবোধের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকা তা আর এখন জানার উপায় নেই l হফস্টেড’র ‘কান্ট্রি মাসকুলিনিটি – ফেমিনিটির রেঙ্কিং’ এ তাদের অবস্থান এখনো সবার উপরে l আজকের এই নারী পুরুষের সম অধিকারের যুগে, এই রেঙ্কিং তাদের ‘অজিজি’(বাউ) কালচারের সাথে সামঞ্জস্যহীন l আর সেটা কোনো ভাবেই সম্মানের বিষয় নয় I
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বললাম , এই যে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিঃশব্দে একাকী জীবন কাটাচ্ছো, এটা কি আনন্দের না কষ্টের? কথাটা নিজের কাছেই রূঢ় শোনালো l
মনে মনে ভাবলাম, এদের আনন্দ আর কষ্টের সাইকোলোজিক্যাল নার্ভটা বিধাতা আদৌ যোগ করতে ভুলে গেছেন কিনা ?
উদাস ভাবে আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলো ইয়ামাশিতা l
একটু পরে প্রসঙ্গ চেঞ্জ করে বললো, তোমরা কি প্রতিদিনই এই রকম টেবিল ভর্তি খাবার খাও ? বুঝলাম, সে গতকালের জাহাজের ডিনারের কথা বলছে।
বললাম, বলতে পারো, খাওয়া দাওয়াটা আমাদের জীবনের একটা আনন্দের বিষয়। আসলে খুব বেশি আনন্দের বিষয় আমাদের জীবনে নেই l
বলেই মনে হলো, এই হতাশার কথাটা ওকে বলা ঠিক হলো না l
তুমি কি একটু কষ্ট করে ডিনারটা কিচেন থেকে টেবিলে নিয়ে আসবে ? সব রেডি করা আছে’ l
কোনো অসুবিধা নেই, বলে কিচেনের দিকে পা বাড়ালাম l
একই খাবার। আগের দিনের মতোই। তবে এবার সে সবকিছুতে লাল মরিচ দিয়েছে l বুঝলাম, এই শিক্ষা সম্ভবত গতকাল জাহাজ থেকে নিয়েছে সে l
বললাম, তোমার জন্য কি আলাদা সু্প রেখেছো ? এই লাল মরিচের সুপ তুমি তো খেতে পারবেনা।
পারবো, চেষ্টা করে দেখি l
চপস্টিক আর কাঠের চামুচের ঠুক ঠাক শব্দ হচ্ছে l কারো মুখে কোনো কথা নেই।
সহসা নীরাবতা ভেঙে ইয়ামাশিতা বললো, তুমি যে জায়গায় কাজ করো সেটা তো জোকোকো, জাহান্নাম l এতো বিকট আওয়াজ, গরম আর ভীতিকর, আমি ওখানে পাঁচ মিনিট থাকলে নির্ঘাত দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো l কিভাবে এতো কষ্ট করো? তোমার বাবা মা জানে?
মনে মনে বললাম, এই জাহান্নাম তৈরির শ্রেষ্ঠ কারিগর তো তোমরাই।
প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে জাপান শিপবিল্ডিং-এ ছিলো এক নম্বরে। এরপর কোরিয়া, শেষে চীন এখন অর্থসাশ্রয়ী জাহান্নাম তৈরির পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বাকিদেরকে মার্কেট থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছে l
বললাম, তুমি যেভাবে এটাকে ভয়ঙ্কর কিছু মনে করছো, আসলে সেরকম কিছুনা I হাজার হাজার জাহাজ পানিতে ভাসছে I মানুষই তো সেগুলো চালাচ্ছে l পার্থক্য এটুকু, একসময় জোর করে আফ্রিকান দাস নিয়ে এসে এগুলো চালানো হতো আর এখন নুতন প্রজন্মের শিক্ষিত দাসদেরকে জোর করতে হয়না, ডলারের গন্ধে তারা নিজেরাই আগ্রহভরে চলে আসে l
এতগুলো কথা বলার পর মনে হলো এই কঠিন কথাগুলো ওকে না বললেই চলতো l
আমারদিকে সরাসরি তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে সে বললো, তোমার এই কাজ করার দরকার নেই I তুমি আমার এখানে থেকে যাও l গতকাল আমি বাসায় আসার পর ওই রুমটি পরিষ্কার করে রেখেছি তোমার জন্য I তুমি ওখানেই থাকবে l রাতে ব্যাগ রেডি করে রাখবে l কাল সকালে জাহাজ ছাড়ার আগেই আমি গিয়ে ক্যাপ্টেনকে হাত ধরে রিকোয়েস্ট করবো তোমাকে তিনি যেন ছেড়ে দেন l ক্যাপ্টেন খুবই দয়ালু মানুষ l উনি নিশ্চয়ই আমাকে নিরাশ করবেন না।
কথাগুলো মাথানিচু করে শুনলাম l
গতকাল জাহাজ থেকে আসার সময় বলেছিলো , কিছু কথা আছে l এই হলো তার বিশেষ কথা।
আবার নুতুন আগ্রহ নিয়ে শুরু করলো, তুমি যদি পড়াশুনা করতে চাও, আমি সে ব্যবস্থ্যাও তোমার জন্য করে দেব। পাশেই টোকিওতে বেশ কয়েকটি মেরিটাইম কলেজ আছে l এখান থেকে মাত্র ২৫ মাইল রাস্তা l লেখাপড়া শেষ করে একটি ভালো চাকুরী করবে, বাবা মাকে দেখতে যাবে l
তার এই কথাওলোর শোনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না l বিশেষ করে তার দ্বিতীয় বাক্যটি I স্কুল কলেজে জীবনে মোটামুটি মেধাবী ছাত্র ছিলাম l বাবা মা চেয়েছিলেন ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করি l তাদের কথা না শুনে, না বুঝে জীবনের সর্বশ্রেঠ সম্পদ জ্ঞানার্জনের দরোজা বন্ধ করে ডলারের মোহে এই জীবনকে বেছে নিয়েছিলাম I বন্ধু বান্ধব যখন উনিভার্সিটির মুক্ত পরিবেশে জ্ঞানার্জনের আনন্দে ময়ূর পাখির মতো পেখম মেলে বেড়াচ্ছে , তখন আমি সাগরে সাগরে ঠিকানাহীন লক্ষ্যহীন ভাবে ভেসে বেড়াই l ভাসতে ভাসতে যখন কিনারায় পৌঁছলাম, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে l ডলারের মোহ কেটে গেলেও, জ্ঞানার্জনের ক্ষমতা ততদিনে হারিয়ে ফেলেছি I এই মহিলা না জেনে না বুঝে আমার জন্ম জন্মান্তরের চাওয়া কে স্পর্শ করেছে। খুব স্বাভাবিকভাবে কিন্তু নিবিড় স্নেহে l আবেগ সামলানোর জন্য ওয়াশ রুমে গেলাম I
ডিনার শেষ l দুজনে ঘরের বাইরে বাগানের পাশে দুটি হেলান চেয়ারে বসে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি l ইয়ামাশিতা নীরাবতা ভেঙে কথা বলা শুরু করলো, আমাদের জীবনের একটা বড় সময় কঠিন আর্থিক কষ্টে পার করতে হয়েছে l দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর তার পরের দশটি বছর প্রায় অন্ধকার সময় I কোথাও কোন কাজ নেই I পুরো দুনিয়া থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন I কোথাও কোনো সাহায্য নেই l একজনের সামান্য বেতন দিয়ে তিন জন মানুষ কোনো ভাবে জীবন যাপন করছি I আরেকটি যে সন্তান নেবো সে সক্ষমতাও নেই l আজ মনে হয় আমার একটি ছেলে থাকলে জীবনটা অন্যরকম হতো l
বললাম, তুমি কি নিশ্চিত যে তোমার সেই ছেলে তোমার সাথে থাকতো ?
না তা হবে কেন ? সে হয়তো টোকিওর কাছাকাছি কোথাও থাকতো, সাথে একটা বউ থাকতো , দুটো বাচ্চা থাকতো I আমি মাঝে মাঝে ওদের জন্য ফ্রেশ কিছু ফল নিয়ে যেতাম আর রবিবারে ওরা সবাই এসে আমার বাড়িটা চিৎকার চেঁচামেচিতে ভরে দিতো l
অতি সরলভাবে বলা কথাগুলো শুনে মনে হলো এটি কোনো স্বপ্নের কথা নয়, একজন অতি সাধারণ মায়ের মৌলিক চাওয়া পাওয়ার কথা I
হতাশার সুরে চোখ বুঁজে যোগ করলো সে, একা একা থাকি l সরকার চিঠি দিয়েছে, যেহেতু আমার সাথে কেউ থাকে না, আমার নিরাপত্তা আর চিকিৎসার জন্য তারা উদ্বিগ্ন l উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক l হয়তো জোর করেই একদিন ওল্ড হোমে নিয়ে যাবে l সেটি হবে আমার প্রথম মৃত্যু l আহা, মৃত্যুটা যদি এই বাড়িতেই হতো ? কথাগুলো এক বাক্যে বলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো l
দুইজনেই চুপচাপ l আমি কি করবো সেটা আমার জানা কিন্তু কি বলা উচিত সেটা আমি জানি না l কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছিনা l
অন্ধকারে ওর হাতটা ধরে বললাম, তুমি যেটা চাইছো, আমি সেটা চাইলেও সম্ভব না l ইমিগ্রেশন, সাইন অফ, আমার এমপ্লয়মেন্ট টার্মস, কমিটমেন্ট সব মিলিয়ে ব্যাপারটা খুবই জটিল l তবে তোমাকে একটা সুখবর দেই, আমার জাহাজ এখন চায়নায় যাচ্ছে, একমাস পরে আবার এখানে আসবে l তোমার সাথে একমাস পরেই আবার দেখা হবে l
বিদায়ের আগে পরিবেশ হালকা করার জন্য বললাম, তুমি তো চা পছন্দ করো, তোমার জন্য বিভিন্ন ফ্লেভারের চাইনিজ টি নিয়ে আসবো I
ব্যাগটা ঘাড়ে নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছি l আমার হাতটা ধরে গেট পর্যন্ত এলো সে l গলার উলেন স্কার্ফটা ভালো করে পেঁচিয়ে দিয়ে বললাম, বাইরে বেশ ঠান্ডা, তুমি ভেতরে যাও তারপর আমি রওনা দেবো I
বাইরে গাঢ় অন্ধকার l সেই অন্ধকার নিজেই এগিয়ে এসে দুই মেরুর দুই মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আবেগকে সযত্নে ঢেকে দিলো l