এক নাবিকের রোজনামচা ।। পর্ব – চার

                                                                    পর্ব – চার

                          মূল (ইংরেজি): মনজুরুল মান্নান ।।   অনুবাদ : মাজহারউল মান্নান

[প্রায় দুই যুগ আগের কাহিনী l এক শিক্ষানবিশ নাবিকের চলার পথে পঞ্চাশোর্ধ এক জাপানি মহিলার সাথে ঘনিষ্ট পরিচয়ের সূত্রে তৎকালীন জাপানী সমাজ ব্যাবস্থার কিছু খন্ড চিত্র উঠে এসেছে তার রোজনামচায় সেই সাথে মিশে গেছে নাবিকের ব্যাক্তি আর সামাজিক জীবনের নানা টানাপোড়ন আর চাওয়া পাওয়ার হিসাবের গরমিল l পাঁচ পর্বে লেখা এই রোজনামচার চতুর্থ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। ]

  মার্চেন্ট শিপ। সহজ বাংলায় সওদাগরি জাহাজ l এর প্রশাসনিক কর্মকান্ডে  এখনো ব্রিটিশ আমলের শেখানো আধা সামরিক ব্যবস্থা  বিরাজমান l ক্যাপ্টেন হলেন জাহাজের মাস্টার বা প্রভু  l  ব্রিটিশ নৌবহরের পরিচিত দাড়িওয়ালা দূরবীন হাতে ক্যাপ্টেন জেমস কুকের সেই দাপট না থাকলেও ক্যাপ্টেন হলেন জাহাজের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এককথায় তিনি হলেন জাহাজ মালিকের প্রতিনিধি l তবে এই নিয়মটার কিছু ভালো দিক আছে  l জাহাজে কিছুটা একনায়কতন্ত্র না চললে ডিসিপ্লিন রক্ষা করা সম্ভব হয় না l বলা হয় ক্যাপ্টেন অ্যান্ড হিজ ক্রু l মানে হলো,  জাহাজে শুধু ক্যাপ্টেন আর  বাকিরা সবাই তার কর্মচারী l 

বিষয়টা সেরকমই ছিল এই ব্যাবসার আদিকালে। ক্যাপ্টেনই ছিলেন এক একটি জাহাজের মালিক  l পরবর্তীতে যখন এই  ব্যবসার প্রসার বাড়লো , কার্গো ওনার, রিসিভার আর  অন্য প্রতিষ্ঠিত  ব্যাবসায়ীরা   এই ব্যাবসায় লগ্নি করা শুরু করলেন l তারা নিজেরাই জাহাজের মালিকানা নিয়ে ক্যাপ্টেনকে মোটা অংকের বেতন বা শেয়ার দিয়ে তাকে শুধু চাকুরীজীবী  বানিয়ে রাখলেন  l

জাহাজে সাধারণত  ক্যাপ্টেন এর সঙ্গে চিফ ইঞ্জিনিয়ার, চিফ অফিসার আর সিনিয়র  অফিসারদের  সাথে কথা বার্তা হয়, বাকিদের সাথে হাই হ্যালো আর  আমাদের মত শিক্ষানবিশদের সাথে শুধু একটু হাসির আদান-প্রদান মাত্র l

 সকালে ব্রেকফাস্ট করার পর সাহস সঞ্চয় করে ক্যাপ্টেনের কেবিনের সামনে হাজির হলাম l কেবিনের দরজা খোলা l টেলিফোনে কথা বলছেন l হাতের ইশারায় সোফায় বসতে বললেন l  টেলিফোন শেষ হতেই দাঁড়িয়ে  বললাম, গুড মর্নিং স্যার। 

একটু হেসে বললেন, গুড মর্নিং ইয়ং বয় l  কিছু বলতে চাও ? কোন সমস্যা?

 কাচুমাচু করে বললাম, আজ সন্ধ্যায় জাহাজে  একজনকে দাওয়াত করতে চাই l

একটু ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন l 

গার্লফ্রেন্ড? 

মাথা নাড়লাম l

তাহলে বয়ফ্রেন্ড, নাকি কোনো আত্মীয়? 

 বললাম ঠিক সে রকম কিছু না,  পঞ্চাশোর্ধ একজন জাপানি মহিলা l

 ঘুরে  নড়েচড়ে বসলেন l

 ইন্টারেস্টিং, কোথায় কিভাবে পরিচয়? 

পার্কে পরিচয় l গতকাল তিনি আমাকে তার বাসায় নিয়ে ডিনার করিয়েছেন   l

ও,  তাহলে তো আমাদের অবশ্যই উচিত উনাকে একদিন  জাহাজে ডিনার করানো l

কথার ধরণে সামান্য  ভয় পেয়ে গেলাম  l  রাগ করলেন কিনা l 

টেলিফোনে চিফ কুককে ডাকলেন l

সন্ধ্যায় আমার একজন লোকাল গেস্ট থাকবে l  দু’একটি জাপানি ডিশ করা যাবে ?

ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা পেলাম না l এতো সহজে অনুমুতি পাওয়া যাবে, ভাবিনি l জাহাজে  সাধারণত  সেফটি  রিজনে, মহিলাদের এক্সেসটা খুব কড়াকড়ি l তারমধ্যে একজন পঞ্চাশোর্ধ  জাপানি মহিলা l কোনো দুর্ঘটনা হলে  জাহাজ এখানেই অ্যারেস্ট হয়ে যাবে l

ঠিক ঘড়ির কাটায় পাঁচটায় ইয়ামাশিতা গেটের সামনে হাজির হলো l  সাথে দুই ঝুড়ি স্ট্রবেরি, কিছু আপেল আর কিছু চকলেট l ব্যাগগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে একসঙ্গে হাটতে থাকলাম জাহাজের সিঁড়ির দিকে  l  

ফিসফিস করে কানের কাছে বলল, আমি যে তোমার জাহাজে আসছি , তোমার ক্যাপ্টেন রাগ করবে নাতো ?  বললাম, তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছে  l

আমাকে অবাক করে দিয়ে ইয়ামাশিতাকে রিসিভ করার জন্য জাহাজের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন ক্যাপ্টেন ।

জাপানি কায়দায়  মাথা নিচু করে হাত বাড়ালেন , আমি এই  জাহাজের ক্যাপ্টেন, ওয়েলকাম অন বোর্ড।

 ইয়ামাশিতা হতবাক বিস্ময় আমার দিকে  তাকালো  l এতটা হয়তো সে আশা করেনি l

 ক্যাপ্টেন তার হাত ধরে সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে উপরে  উঠাতে লাগলেন l  ফলের ঝুড়ি হাতে আমি পিছে পিছে হাঁটতে লাগলাম l

জাহাজের সিড়িতে অথবা এলিওয়েতে যার সাথে দেখা হচ্ছে, হ্যান্ড শেক করে বলছে, কোনিশিবা (হ্যালো), ওজেনিদেসুকা? (তুমি কেমন আছো?

টাইটানইকু নো ইও নি  ( টাইটানিক এর মত দেখতে)l

পনেরো বছরের পুরনো জাহাজের সাথে সে কীভাবে  বিখ্যাত  টাইটানিকের সামঞ্জস্য  খুঁজে পেলো  বুঝতে পারলাম না  l আমার ধারণা, টাইটানিকের শুধু নামটি শুনেছে, ছবি দেখেনি  l বিস্ময়ে চারিদিকে ছবি তুলছে আর নোটবুকে কিছু একটা  লিখে নিচ্ছে l  হয়তো স্কুলের বাচ্চাদেরকে তার এই টাইটানিক দেখার গল্প বলবে l

ডিনারের সময় ক্যাপ্টেন নিচে নেমে এলেন l যেহেতু ক্যাপ্টেনের আদেশ, চিফকুক মনের মাধুরী মিশিয়ে জাপানি খাবারে  টেবিল ভর্তি করে ফেলেছে l  টেবিলে এত খাবার দেখে ইয়ামাশিতা  বিস্ময়ে হতবাক l

বারবার আমার দিকে  ফিরে তাকিয়ে  বলছে ‘ওসি তাবমন’,  খুবই সুস্বাদু খাবার l  ‘টাকুসান নো তবেমন’ অনেক খাবার I  কানে  ফিসফিস করে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করছে  যার অধিকাংশই  আমি বুঝি নাl ক্যাপ্টেনের ধারণা হল আমি তার  সব জাপানি কথা বুঝি l 

টোটেম ওটেক,  খুব ভালো মানুষ,  দয়ালু মানুষ l  তোমার ক্যাপ্টেন খুবই দয়ালু মানুষ।

আমি মাথা নাড়লাম l 

ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন , তুমি কি তার সব কথা বোঝো ?

জি না স্যার, দু একটা বুঝি, আর বাকিটা মাথা নাড়াই l

খাওয়া শেষে আমার কেবিনে চলে আসলো l ছোট্ট ঘর l জাপানিদের ঘরের মতোই l সকালে গুছিয়ে রেখেছি  l   জিজ্ঞেস  করলো , তোমার অফিস কোথায় ?  চলো, তোমার অফিস দেখি l 

এবার বিপদ l আমি  কাজ করি  ইঞ্জিন রুমে l  সেখানে সব সময় বিকট আওয়াজ, অসহ্য গরম l বাইরের মানুষের কাছে এক ভীতিকর পরিবেশ  l বড় বড় ইঞ্জিন মনে হবে সিংহের মত গর্জন করছে l  এখনই কাউকে খেয়ে ফেলবে  l যদিও আমাদের কাছে এটি স্বাভাবিক l

বললাম,  তুমি কি আসলেই দেখতে  চাও ?

 তাকিয়ে বলল,  ‘কোন সমস্যা  আছে ?

না ঠিক আছে,  শুধু দূর থেকে  একবার দেখে আসতে  পারো l

 ইঞ্জিন রুমের দরজা খুলতেই একটা বিকট আওয়াজ আর ভ্যাপসা গরম  l  কিছুটা ভয় পেয়ে গেল l  তারপরও সাহস  সঞ্চয়  করে উপর থেকে পুরোটা দেখার চেষ্টা  করলো l  বাইরে এসে দেখলাম মুখটা একেবারে ফ্যাকাশে l  জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে  l মনে হলো জাহান্নাম থেকে ফিরে এসেছে   l

ঘড়ির  দিকে  তাকালো l  তার মানে এখন ফিরতে হবে l

ক্যাপ্টেন এর কাছে  বিদায় নিয়ে  সাবধানে হাত ধরে জাহাজের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি l গাড়ি পর্যন্ত কিছুটা হাঁটার রাস্তা  l  

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি  শরীর খারাপ লাগছে ?

সামলিয়ে নিয়ে বলল, না, তোমার ওই ইঞ্জিন রুমে  দিনে কতক্ষন থাকতে হয় ?

প্রসঙ্গ চেঞ্জ করার জন্য বললাম বললাম, ওটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো, এখন বলো, আমাদের  টাইটানিক তোমার কেমন লাগলো? ‘

কোনো উত্তর নেই l মাথা থেকে  ওই জাহান্নামের দৃশ্য সরানো গেলো না  l

মনে পড়ে, আমি জাহাজে যোগদান করার একমাস পর গাইবান্ধা থেকে বাবা-মা এসেছিলেন চিটাগাংয়ে আমার সাথে দেখা করার জন্য l  কোনভাবেই মাকে জাহাজে নিয়ে আসা গেল না  l  তার ভয় হলো যে বস্তুটি পানির উপর ভেসে থাকে এবং সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ায়, নিশ্চয়ই অদ্ভুত টাইপের কিছু l সেখানে তার ছেলে কিভাবে থাকে সেটা  দেখার চাইতে না দেখাই ভাল l

বাবা একা জাহাজে এলেন। অধ্যাপক মানুষ l সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন l একটি সহজ সাধারণ জটিলতা হীন জীবন। জীবনে কখনো জাহাজ দেখেন নাই l জাহাজের সিঁড়ি বিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট হলো l এসেই দেখলেন  যার যার মত কাজ নিয়ে  চারিদিকে মানুষের ছুটাছুটি l ক্রেন চলছে l কার্গো উঠানামা করছে l শুধু  শব্দ  চারিদিকে l  তার মাঝে বিকট শব্দে একমোডেশনে জেনারেল অ্যালার্ম টেস্ট করা হচ্ছে  l

আমাকে ইঞ্জিন রুম থেকে ডেকে নিয়ে আসা হলো দেখা করার জন্য l গায়ে তেল কালি মাখা  বয়লার স্যুট l চেনার কোনো উপায় নেই  l  আমাকে দেখে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন l কেবিনে  এসে  উদাস চোখে বললেন, এই কঠিন জীবন তোমার দরকার নেই,  তোমার মাকে গিয়ে আমি কিছু  বলতে পারবোনা l  জীবনে দুটি বছর নষ্ট হলে কিছু যায় আসেনা, তুমি আবার পড়াশুনাটা শুরু করো l

মাথা নিচু করে বসে থাকলাম,  কিছু বলার নেই  l

জাহাজ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বাবা  প্রধান প্রকৌশলীর ( চিফ ইঞ্জিনিয়ার) সাথে দেখা করলেন l নরম সুরে প্রধান  প্রকৌশলীর হাত ধরে বললেন, আমার ওই একটি মাত্র ছেলে, ও আসলে একটা ভিন্ন পরিবেশে মানুষ হয়েছে ,  জানিনা আপনাদের এই কঠিন  প্রতিকূল পরিবেশে  সে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা l  যদি না পারে আপনি আমাকে একটু  জানাবেন l আমি এসে ওকে নিয়ে যাবো l বাবা চোখ মুছলেন।

প্রধান প্রকৌশলী চেয়ার ছেড়ে উঠে  বাবাকে নিয়ে সোফায়  পাশাপাশি বসলেন।

বললেন, আঙ্কেল,  আজকে আপনি যেভাবে আপনার ছেলেকে দেখার জন্য এসেছেন,  ঠিক আজ থেকে পনেরো বছর আগে আমার  দরিদ্র  স্কুল শিক্ষক বাবাও একদিন  ইঞ্জিন রুমে আমাকে তেল কালির মধ্যে ডুবে থাকতে দেখে কেঁদেছিলেন l এরপর আজপর্যন্ত আর কোনোদিনই তিনি জাহাজে আসেন নাইl আমি আজ জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী l আপনি লিখে রাখুন,  আপনার এই ছেলে সবকিছুর সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে  আমার মতোই একদিন জাহাজের  প্রধান প্রকৌশলী হবে l  আপনি নিশ্চিন্ত মনে বাসায়  চলে যান l

গাড়িতে উঠে ইয়ামাশিতা  জিজ্ঞেস করলো , জাহাজ আর কয়দিন থাকবে?

বললাম, পরশু দিন  ভোরে এই বন্দর ছেড়ে যাবে l

ঠিক আছে,  কাল দেখা হবে l  সন্ধ্যায় তুমি সরাসরি  বাসায় চলে আসো l  তোমার সাথে কিছু কথা আছে আমার l

গাড়ি  যাওয়ার পথের দিকে  তাকিয়ে থাকলাম , কি এমন কথা থাকতে পারে? ( চলবে )

Exit mobile version