গুজব ছড়িয়ে জুয়েলকে পুড়িয়ে হত্যার অভেযোগে মসজিদের খাদেমসহ গ্রেফতার ১০

সন্ধান২৪.কম :লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারীতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে আবু ইউনুস মো. সহিদুনবী জুয়েলকে (৫০) পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় বুড়িমারী মসজিদের খাদেম জাবেদ আলীসহ (৬১) আরো ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দায়ের করা ৩টি মামলায় ১০ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

খাদেম জোবেদ আলী

এদিকে এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় বুড়িমারী জামে মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীসহ (৬০) আরও ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে মোট গ্রেফতার ১০ জন। তদন্তের সার্থে বাকী ৪ জনের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। এ দিকে মামলা এহাজারভুক্ত আসামী ডেকোরেটর হোসেন আলী (৩৭) কে গত শনিবার রাতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তুলে নিয়ে গেছে বলে তার পরিবার জানান।

ঘটনার পর থেকে প্রথম দফায় ৫ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে গত রোববার (১ নভেম্বর) আদালতে নেয় পুলিশ। এরপর সোমবার দুপুরে আরও ৫ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এ ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলায় মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে প্রথম দফায় গ্রেফতার ৫ জনকে হত্যা মামলায় ৫ দিন করে রিমান্ড আবেদন জানায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পরিদর্শক মাহমুদুন্নবী।

আদালত মঙ্গলবার রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করে গ্রেফতারকৃতদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় দফায় গ্রেফতারকৃত খাদেমসহ ৫ জনকে সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে আদালতে উঠানো হয়েছে।

 

প্রথম দফায় গ্রেফতারকৃতরা হলেন-বুড়িমারী এলাকার ইসমাইল হোসেনের ছেলে আশরাফুল আলম (২১) ও বায়েজিদ (২৪), ইউসুব আলী ওরফে অলি হোসেনের ছেলে রফিক (২২), আবুল হাসেমের ছেলে মাসুম আলী (৩৫) এবং সামছুল হকের ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৫)। এই ৫ আসামিকে ৫ দিনের রিমান্ড চেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। নিহত শহিদুন্নবী জুয়েলকে হত্যার দায়ে নিহতের চাচাত ভাই সাইফুল আলম বিপ্লব বাদি হয়ে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় গ্রেফতার ৫ আসামীকেই ৫ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক মাহমুদুন্নবী। মঙ্গলবার রিমান্ড আবেদনের শুনানীর দিন ধার্য করে আসামীদের হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন আমলি আদালত ৩ এর বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ফেরদৌসী বেগম।

নিহত যুবক শহিদুন্নবী জুয়েল

এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত যুবক শহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রিপাড়ার আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। তিনি রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গ্রন্থাগারিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। গত বছর চাকরিচ্যুত হওয়ায় কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হারিয়ে ফেলেন তিনি।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শহিদুন্নবী জুয়েল বৃহস্পতিবার বিকেলে সুলতান যোবাইয়ের আব্দার নামে একজনকে সঙ্গে নিয়ে বুড়িমারী বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা।

নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরিফ নামাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়। এ সময় কোরআর ও হাদিস বই তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান যোবাইয়েরকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখে। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে যান।

সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় স্থানীয়রা। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

 

Exit mobile version