সন্ধান২৪.কম : নিউইয়র্কে প্রবাসী বাঙালিদের প্রাণকোন্দ্র জ্যাকসন হাইটসে জিহানের চিরায়ত গ্রামবাংলার কিশোরী-শাপলা-নৌকার দৃষ্টিনন্দন দেয়াল চিত্র কমিউনিটিতে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা,সভা-সমাবেশ, ও অবসর সময় কাটানোর জন্য এই পার্কটিকে সুন্দর ও আকর্ষনীয় করতে স্থানীয় প্রশাসন নানা ভাবে উদ্যোগ । সেই উদ্যোগটি সফল হয়েছে জিহান ওয়াজেদ’র শিল্পকর্ম বাংলাদেশ ম্যুরাল-এর মধ্য দিয়ে। ডাইভারসিটি প্লাজার দক্ষিণের মুনলাইট গ্রিল রেস্টুরেন্ট ভবনটির প্রশস্থ দেয়ালে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের চিরাচরিত দেয়াল চিত্র। নৌকায় বসে এক কিশোরীর শাপলা-শালুক সংগ্রহের চিত্রটিতে পাল্টে গেছে ডাইভারসিটির চেহারা। অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাপ ট্যাপ সেন্ড, স্থানীয় সিটি কাউন্সিল মেম্বার শেখর কৃষ্ণান ও রেস্টুরেন্ট মালিক মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশ ম্যুরাল নির্মাণের নেপথ্যে।

গত ১৯ মে শুক্রবার অপরাহ্নে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশ ম্যুরাল উদ্বোধন করেন সিটি কাউন্সিল মেম্বার শেখর কৃষ্ণান। “সেলিব্রেশন অব ডাইভারসিটি: মেমোরি অব বাংলাদেশ” নামের ম্যুরালটি ফিতা কেটে উদ্বোধন করার সময় শিল্পী জিহান ওয়াজেদ, মূর্যালের স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাপ ট্যাপ সেন্ড কর্মকর্তা নওশীন খান সহ নিউইয়র্ক স্টেট এ্যাসেম্বলী মেম্বার মিঃ রাগাহসহ বিভিন্ন কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণীপেশার ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

জ্যাকসন হাইটসে অংকিত ম্যুরালটিতে বাংলাদেশের চিরায়ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য তুলে ধরেছেন জিহান ওয়াজেদ। বাংলাদেশের রূপ, গন্ধ সুষমার ছোঁয়া রয়েছে ম্যুরালটিতে। ভাসমান নৌকা থেকে ঝিলের পানিতে ফুটন্ত জাতীয় ফুল শাপলা তুলছে এক কিশোরী। গ্রাম-বাংলার এমন দৃশ্য আপ্লুত করছে অনেককেই।
ম্যুরালটির উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য রাখেন কাউন্সিলম্যান শেখর কৃষ্ণান, শিল্পী জিহান ওয়াজেদ, ট্যাপ ট্যাপ সেন্ড’র কর্মকর্তা নওশীন খান, কান্ট্রি ম্যানেজার রিমি রশীদ, নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলীম্যান স্টিভেন রাগাহ, অ্যাসেম্বলী ওম্যান জেসিকা রোজাস, কমিউনিটি এ্যাক্টিভিস্ট মোফাজ্জল হোসেন প্রমুখ। শেখর কৃষ্ণান শিল্পী জিহান ওয়াজেদ’র শিল্প কর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ডাইভারসিটি প্লাজার এ মূর্যালটি যেমন জ্যাকসন হাইটস এলাকার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে তেমনি সমৃদ্ধ করেছে নিউইয়র্কের বাংলাদেশী কমিউনিটিকে। ট্যাপ ট্যাপ সেন্ড এবং মাসুম চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

জিহান ওয়াজেদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাংলাদেশ ম্যুরালটি তার অন্যান্য ম্যুরালের তুলনায় ব্যতিক্রমী একটি সৃষ্টি। তিনি বলেন, বাংলাদেশী আমেরিকান হিসেবে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত এ ম্যুরালটি জ্যাকসন হাইটসের মতো জায়গায় আঁকতে পেরে। এই ম্যুরালের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও স্মৃতি ধরে রাখার প্রয়াস পাবো বলে মন্তব্য করেন জিহান।
নওশীন খান জিহানকে সৃষ্টিশীল শিল্পী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ম্যুরাল নিউইয়র্ক সিটিতে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। রিমা রশীদ বলেন, বাংলাদেশী কমিউনিটিকে কাছাকাছি আনতে এবং আমাদের সংস্কৃতিকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে ধরতে এটি একটি উদ্যোগ। অ্যাসেম্বলিম্যান স্টিভেন রাগাহ বাংলাদেশ ম্যুরালের প্রশংসা করেন। নিউইয়র্কে ভবিষ্যতে এধরণের শিল্পকর্মকে আরো উৎসাহিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। কমিউনিটি এ্যাক্টিভিস্ট মোফাজ্জল হোসেন বলেন, বাংলাদেশী আমেরিকান নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি জিহান ওয়াজেদ। আমাদের প্রথম প্রজন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্মৃতি ধরে রাখতে ম্যুরালটি ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করেন তিনি। উদ্বোধনের পর প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ভীড় করছেন ম্যুরালটি দেখতে। অনেকে ছবি তুলে সাটছেন ফেসবুকে।
মুন লাইট গ্রীল রেস্টুরেন্ট’র স্বত্বাধিকারী মাসুম চৌধুরী বাংলাদেশ ম্যুরালের অংশীদার হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করেন। তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা এখন তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে।

উল্লেখ্য জিহান ওয়াজেদের স্টুডিও ম্যানহাটানের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। তার অন্যতম শিল্প কর্মের মধ্যে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবন, নিউইয়র্ক আস্তর্জাতিক স্পোর্টস কমপ্লেক্স বিলি জিন কিং ন্যাশনাল টেনিস সেন্টার, এস্টোরিয়ায় ১৭৭ ফিট দীর্ঘ ম্যুরাল ‘ওয়েলকাম এস্টোরিয়া’ মুর্যালটি অন্যতম। এছাড়া নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন বরোতে বড় বড় মুরাল্য অঙ্কণ করেছেন জিহান ওয়াজেদ। মুর্যাল ছাড়াও নিউইয়র্কে ম্যানহাটানস্থ গ্যালারীতে তার বেশ কয়েকটি একক চিত্র প্রদর্শনী ব্যাপক সাড়া জাগায় মুলধারার দর্শকের মাঝে। মিকৌলে অনারি জিহান ওয়াজেদ বারুখ কলেজ থেকে পারসেপচুয়াল সাইকোলজিতে গ্রাজুয়েশন করলেও তার মনোযোগ একমাত্র ছবি আঁকায়। স্টুডিওতে ছবি আঁকার পাশাপাশি তার নিজস্ব স্টাইলে ম্যুরাল আঁকছেন দেয়ালে। কারণ তার প্রাথমিক আগ্রহ ছিল গ্রাফিটি আঁকায়। কিন্তু গ্রাফিটি আঁকা আইনসিদ্ধ নয়। তার গ্রাফিটি থেকেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন ম্যুরালের নিজস্ব ও নূতন ধারা। জিহান ওয়াজেদ তার কাজে সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই লাল এবং সবুজ পাশাপাশি ব্যবহার করেন। কেন করেন ? সকলের কাছেই তা বোধগম্য। তাহলো এই লাল ও সবুজ বাংলাদেশের পতাকার রঙ। বাংলাদেশ তাই তার ম্যুরালে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। নিউইয়র্ক সিটিতে এইভাবেই জিহান বাংলাদেশীদের গর্বিত করে চলেছেন।
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নতুন প্রজন্মের শিল্পী জিহান ওয়াজেদ। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, ইউএস ওপেন স্টেডিয়াম সহ বহুজাতিক নিউইয়র্ক নগরীর বড় বড় স্থাপনায় শোভা পাচ্ছে তার আঁকা দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল।


