দখল আর দূষণে নাকাল রাজধানী শহর ঢাকা। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এর সঙ্গে জেঁকে বসেছে শব্দদূষণ। বায়ুদূষণে যখন শ্বাসরোধ অবস্থা, তখন শব্দদূষণের তীব্রতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রাজধানীবাসীর যাপিতজীবন। অবস্থা এমন যে, ঘরের চৌকাঠ পার হলেই ধুলা ও ধোঁয়ায় ধূসর চারদিক।
যানবাহনের হর্নের উচ্চ শব্দ আঘাত করে কানের গভীরে। হাঁসফাঁস অবস্থা হৃদরোগীদের। আঁতকে ওঠে শিশু। বুক ধড়পড় করে আবালবৃদ্ধবনিতার। এমন বৈরী পরিবেশ এখন নিত্যসঙ্গী। যার গবেষণামূলক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) প্রতিবেদনে।
রাজধানীর যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ে সংসদে সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল। বৃহস্পতিবার পয়েন্ট অব অর্ডারে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন মানুষকে যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এতে একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকা অকার্যকর শহরে পরিণত হবে।’
পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘গ্রামের মানুষ যিনি গ্রামে থাকেন, তার খুব একটা সমস্যা হয় না। ঢাকা এখন শব্দদূষণে এক নম্বরে, বায়ুদূষণেও এগিয়ে। ঢাকায় যারা বসবাস করেন, যানজটের কারণে তারা সকালে বের হলেও দুপুরে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন কিনা, এর নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে বছরে ৮৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন কাজে কোনো সমন্বয় নেই। এক সংস্থা রাস্তা তৈরি করে আবার কিছু দিনের মধ্যে অন্য সংস্থা রাস্তা কাটে। কোন বাস কোথায় থামবে, তার কোনো ঠিক নেই। রাস্তা বন্ধ করে রেখে তারা যাত্রী তোলে।’ পীর ফজলুর রহমান যানজট নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানান।
গত রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনের মৌলিক তথ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় শব্দদূষণ বিশ্বের অন্য যে কোনো শহরের চেয়ে বেশি। রাজশাহী রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। বিশ্বের ৬১ শহরের শব্দদূষণের মাত্রা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘ফ্রন্টিয়ারস ২০২২ : নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকায় শব্দের সর্বোচ্চ তীব্রতা ১১৯ ডেসিবল। আর ১০৩ ডেসিবল মাত্রার শব্দ হয়ে থাকে রাজশাহীতে।
অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ১৯৯৯ সালের গাইডলাইন অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার জন্য শব্দের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ৫৫ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবল। এছাড়া ২০১৮ সালের সর্বশেষ হালনাগাদ গাইডলাইনে সড়কে শব্দের তীব্রতা ৫৩ ডেসিবলের মধ্যে সীমিত রাখার সুপারিশ আছে।
এদিকে দেশের পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এই দুধরনের দূষণ নয়, ভয়ানকভাবে অন্তত নয় ধরনের দূষণের কবলে পড়েছে ঢাকা। বাকি দূষণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদী দখল, পানি, বর্জ্য, মাটি, আলো ও দৃশ্যদূষণ। সাম্প্রতিক সময়ে অণুজীব দূষণ নতুন এক অনুষঙ্গ। তারা বলেন, এসব দূষণের ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কেবল বায়ুদূষণেই জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ চলে যাচ্ছে। আর বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার ২৮ শতাংশই মারা গেছে পরিবেশ দূষণজনিত নানা অসুখ-বিসুখে। এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।
তারা মনে করেন, এই দূষণের জন্য সরকার এবং জনগণ সমানভাবে দায়ী। জনগণ যেমন সচেতন-অসচেতনভাবে নির্বিচারে দূষণ করে যাচ্ছে। তেমনি সরকারি তরফে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনা অন্যতম। এছাড়া আইন পালনে প্রভাবশালীদের অনীহা ও বাধা বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশ সুরক্ষায় রাজনৈতিক চাপও বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, বিভিন্ন ধরনের দূষণ মানুষই করে থাকে। দূষণকারীদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে এই ক্ষতি করে চলেছে। আবার কেউ না জেনে অসচেতনভাবে করে যাচ্ছে। এই দূষণ বন্ধে প্রথমত সরকারের হাতে থাকা আইনের প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জনগণকে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান দ্বারা ক্ষতির ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। এছাড়া দূষণে মানুষের অকালমৃত্যু বাড়ছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাসহ নানাভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এক বায়ুদূষণেই ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ৫ শতাংশ। এসব মানুষকে জানালে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।
পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘শব্দদূষণ দূর করতে হলে মানুষের অভ্যাসের পরিবর্তন করতে হবে। এরপরও এটির জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কাজ বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে নির্মাণ খাত ও ইটভাটা অন্যতম।
বর্ষা মৌসুমে একটি স্বস্তিকর পরিবেশ আসতে পারে। আসলে বিভিন্ন ধরনের দূষণ আছে, যা নিয়ন্ত্রণের কাজটি সরকারের। তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।’
গত রোববার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ইউএনইডির বরাত দিয়ে জানায়, ঢাকার বাসিন্দাদের দ্বিগুণ মাত্রার শব্দের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে। এর ফলে বধিরতা, হৃদরোগ, মানসিক বৈকল্যসহ নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ঢাকার মানুষ। সম্প্রতি এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের এক সেমিনারে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত জানান, শব্দদূষণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন ধরনের রোগে মানুষ আক্রান্ত হয়। কোনো ধরনের উৎস থেকে কী রকম শব্দদূষণ হচ্ছে সে বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
এ নিয়ে সোমবার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় মোহাম্মদ রাজ নামে এক অভিভাবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া তার মেয়ে নাজিমউদ্দিন রোড এলাকা থেকে আসা-যাওয়া করে। শব্দদূষণ থেকে বাঁচতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর চানখাঁরপুল মোড়ে আসার আগে তার মেয়ে কান চেপে ধরে। আর বকশিবাজার পেরিয়ে জগন্নাথ হলের সামনে এসে কান ছেড়ে দেয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এভাবে নগরীর কতজন কান চেপে ধরে চলতে পারবে?’
বায়ুদূষণে ঢাকা কয়েক বছর ধরে ওপরের দিকেই থাকছে। কখনো শীর্ষে উঠে যায়, আবার ১০-এর মধ্যে কোনো একটিতে নেমে আসে। গত ১৮ মার্চ ছিল শুক্রবার। কিন্তু এই ছুটির দিনেও বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বায়ুদূষণে বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে রাজধানীর ঢাকার অবস্থান ছিল এক নম্বরে। বৈশ্বিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘আইকিউ এয়ার’ এই তথ্য জানায়। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে ওই সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই অবস্থান ছিল তৃতীয়, যা দুই ঘণ্টা আগে ছিল দ্বিতীয়।
