নারীরা অবলা-ই থেকে গেল ‘মানুষ’ হলো না ! প্রসঙ্গ নারী দিবস : সনজীবন কুমার

সনজীবন কুমার

কোন সময়েই নারীরা ভালো ছিল না। তারা কোন কালে সুখে দিন গুজরান করতে পারে নাই, দুখেই তাদের জীবন গড়া । রাষ্ট্র, সমাজ ও  ধর্মের যত খারাপ আইন-আচার, ঝড়-ঝাপ্টা আছে,সব নারীর উপর চালানো হচ্ছে । তাই এরা চিরকাল “অবলা নারী-ই” থেকে গেল, মানুষ হতে পারলো না ।

আদীকাল থেকে পুরুষরা যেমন পদতলে রাখতে চেয়েছে , নারীরাও তা “বিধির লিখন না যায় খন্ডন” মনে করে মেনে নিচ্ছে।

নারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পদে পদে অবহেলিত। ধর্মীয় দিক থেকে তো নারীদের অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর । সেখানে নারী শুধু ভোগের বস্তু এবং সন্তান উৎপাদনের কারখানা।

যুধিষ্ঠির জুয়া ( পাশা ) খেলায় কেন দ্রৌপদীকে বাজি রাখলেন ? নারী বলে ? যখন দুঃশাসন দ্রৌপদীকে কেশে ধরে সভায় টেনে আনে, তখন সভায় ছিলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃষ্ণা (বিদুর), কৃপাচার্য ও আরও অনেকে। কেউ প্রতিবাদ করেননি।

এইখানে প্রশ্ন ওঠে: একজন স্ত্রী কি জুয়ায় বাজি রাখা যায়? নারীকে অপমান করার এই ঘটনা শুধু পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং ধর্ম, ন্যায়, নারীত্ব ও সমাজের মূল্যবোধের উপর এক গভীর আঘাত। এই ঘটনা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়–যে সমাজে নারী অসম্মানিত ।

রাবণ বধের পর সীতার পবিত্রতা প্রমাণের জন্য রামচন্দ্রের আদেশে সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়। লঙ্কাকাণ্ডে রাক্ষসরাজ রাবণ কর্তৃক অপহৃত হয়ে দীর্ঘ সময় অশোকবনে বন্দী থাকার পর, সীতাকে আগুনের মধ্য দিয়ে হেটে নিজের সততা ও সতীত্ব প্রমাণ করতে হয়। অথচ রামও তো ততদিন সীতা ছাড়া একাই বনেই কাটিয়েছে,তিনিও তো নারীগামী হতে পারেন। তবে তার বেলায় কেন কোন সততার পরীক্ষা নেয়া হলো না ?

সতীদাহ নামে পরিচিত মৃত স্বামীর চিতায় চড়িয়ে বিধবা স্ত্রীকে পুড়িয়ে দেয়ার প্রাচীন এক হিন্দু প্রথা আইন ছিল। তা নিষিদ্ধ করেন রাজা রাম মোহন রায়। কিন্ত তাকেও কম হেনস্থা হতে হয় নাই। কিন্ত স্ত্রীর মৃত্যু হলে স্বামীদের কেন চিতায় তোলা হলো না ?

হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন প্রচলনের পর ঈশ্বরচন্দ্র রক্ষণশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতার শিকার হন। তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ, চিঠিতে খুনের হুমকি এবং সমাজে ‘দয়ার সাগর’ নামের বদলে চরম গালিগালাজ সহ্য করেন। তার কুশপুতুল পোড়ানো হয়েছিল। শাস্ত্রীয় অজুহাত ও কট্টর রক্ষণশীলতা দেখিয়ে আইন পাসের সময় তার বিপক্ষে সইয়ের সংখ্যা (৩৬,৭৬৩) পক্ষে মাত্র (৯৮৭)। অথচ ব্রাক্ষ্মনরা একের পর ১২ থেকে ১৪ পর্যন্ত বিয়ে করেছেন,তার বেলায় সমাজ নিরব থেকেছেন।

যে রাজা রাম মোহন ও বিদ্যাসাগর নারীদের জন্য এত কিছু করলো, সেই হিন্দু নারীরা তাকে চেনেই না । তারা লোকনাথ, বালকনাথ, অনুকুল ঠাকুরের পূজা করে । অথচ সব ধর্মের এই ধর্ম ব্যবসায়ীরা সমাজের কোন উপকারে আসে না, শুধু পেট পুরে খেয়েছেন আর  তাদের অনুসারীদের অভিসাপ করেছেন।

সংসদে-ক্ষমতায় নারীরা অপাংতেয় এবং উপেক্ষিত। মৌলবাদ ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দলে গুরত্বপূর্ণ পদে নারী নিষিদ্ধ। উৎপাদন ব্যবস্থায় পুকুষের মত পরিশ্রম ও উৎপাদন করলেও নারীদের মজুরী অনেক কম ।বৈষম্য আকাশ-পাতাল।

এখনকার নারীরা কি বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করেন ? যে রোকেয়া নারীকে ঘর থেকে বের করে সূর্যের আলো দেখাতে শিখেছেন ? বরং কিছুদিন আগে মব সন্ত্রাস করে তাকে অপমান করা হয়েছে । স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগী প্রীতিলতা, ইলামিত্র, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমামের চেতনা-আদর্শ ক’জন নারী লালন করে ?  এখন তথাকথিত বিপ্লবী নারীরা কাউয়া সা.. ,  পুরুষের বিশেষ স্থানের লোম অথবা নারীর নিম্নাঙ্গ ছিঁড়ে ফেলার বিপ্লবে মগ্ন ।

সমাজ ও সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করতে হলে “পুরুষের পায়ের নিচে নারীদের স্থান” এই আদিম মানষিকতা থেকে পুরুষদের বের হয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীদেরকেও লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে ।কাজী নজরুল কিন্ত বলেছেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর 

 সোজা কথা, এ বিশ্বে সুন্দর ও নান্দনিক যা কিছু নির্মাণ হচ্ছে  তার অর্ধেক অবদান নারীরও আছে। তাই নারীদের মনে রাখতে হবে, সেই  অবদানে জমি পুরুষদের  কাছে বর্গা দেয়া যাবে না। নিজেদেরকেই সেই জমিতে ফুল ফোটাতে হবে ।

শামসুর রাহমানের কবিতায় বলতে হবে,  ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো।”

 

 

Exit mobile version