নিউইয়র্কে দুটি বইমেলা : কয়েক ভাগে বিভক্তির বেড়াজালে কমিউনিটি  ।। পর্ব-এক

আগামী কাল শেষ পর্ব

সন্ধান ২৪.কম প্রতিবেদন:  নিউইয়র্কে দুটি বইমেলাকে কেন্দ্র করে কমিউনিটিতে এখন চলছে এক চরম হতাশা ও অস্থিরতা । নিউইয়র্কের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার হোটেল, রেষ্টুরেন্ট, ফুটপাতে এখন দুটি বইমেলাকে কেন্দ্র করে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও চর্চা।

গত বছর ২০২৫ সালে একটি বই মেলা থেকে দুটি বইমেলা হওয়ায় আদর্শিক বিচ্যুতি, নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে কমিউনিটি ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বিভক্তি এই সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে, যা নিউইর্য়কের শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের  মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি করেছে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই ভাঙনের সূচনা হয় গত বছর মুক্তধারার বইমেলা থেকে বেড়িয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলার মাধ্যমে। তখন থেকেই এই ভাঙন একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে ,উদ্বেগ তৈরি করেছে। কর্মী সমর্থকদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব বেড়ে গেছে।

২০২৫ সালে ‘২৪’র লাল বদরদের বর্জনের সংকল্পে’ মুক্তধারার বইমেলা থেকে বেড়িয়ে এসে ড.নুরন নবী,তাজুল ইমাম,গোপাল স্যানাল,স্বীকৃতি বড়ুয়া প্রমুখের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা’র আয়োজন করা হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা’ শুধু একটি বইমেলা নয়—এটি প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম।সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সমাজে বাঙালি জাতির মহান নেতা বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে চিরজাগ্রত রাখতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন বলে কতৃপক্ষ জানান।

তবে নিন্দুকেরা বলছেন অন্য কথা । তাদের মতে, মুক্তধারার বইমেলায়, অতিথি  ও শিল্পী-সাহিত্যিক নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য, পদ-পদবী, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, ইগো সমস্যা ও  কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েই নাকি বইমেলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে ড. নবীর নেতৃত্বে আর একটি বইমেলার সৃষ্টি হয়েছে।

 অপর দিকে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের বিশ্বজিৎ সাহার নেতৃত্বে নিউইয়র্ক ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা শুরু হয়। প্রথম কয়েক বছর এই বইমেলা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত ছিল। কিন্ত সময় যইত গড়িয়ে যেতে থাকে ততই  এর জৌলস হারাচ্ছে বলে, অনেকে মনে করছেন । কমিটির কাছে বইমেলা আয়-ব্যয়ের হিসাব,ব্যাংক একাউন্ড উপস্থাপন করা হয় না বলে খোদ কমিটির  দুই/একজন সদস্যদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও  বইমেলার আড়ালে ‘আদম ব্যবসা’ লুকিয়ে আছে বলে নিউইয়র্কের বাজারে একটি অপপ্রচার চালু আছে। যদিও এর সত্য-মিথ্যা সন্ধান২৪.কম‘র পক্ষ থেকে যাচাই করা হয় নাই।

দুটি বই মেলার নেতা-কর্মীরা একে অপরকে ‘ লাল বদর-জামায়াতের অনুসারী’ ও ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে অভিযুক্ত করছেন। দুটি বইমেলার বিভাজন-বিভক্তির কারণে ‘ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ বিভেদ বাড়তে পারে অনেকে মনে করছেন।

এ ছাড়াও বইমেলায়  সৃজনশীলতার সাফল্যের বদলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হৈ-হুল্লোড়, আড্ডা,সেলফি-ছবি তোলাই এখন প্রধান বিষয় হয়ে গেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

মুক্ত চিন্তার মানুষরা মনে করছেন,বিভক্তির বইমেলা নিউইয়র্কে সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদী চর্চা রক্ষার লড়াই যে আরো কঠিন হয়ে উঠবে, সে বাস্তবতাই সামনের বছরগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে ।

এই ধরনের বিভক্তির পরিবেশে অস্বচ্ছতা নিয়ে আসে ও অসাধু কার্যকলাপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। সেই সাথে তৈরি হচ্ছে নৈতিকতার সংকট।

সর্বজন গ্রহনযোগ্য একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব  বলেন, ‘যখন সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার, ঠিক সে সময়ে আলাদা হয়ে অপ্রীতিকর আচরণ করা আমাদের অশুভ বার্তা দেয়। তিনি বলেন, ভিন্ন মত ও পথ থাকলেও প্রগতির চিন্তা থেকে সবাইকে এক হওয়া দরকার।’

‘বই হোক একাত্তরের শাণিত বর্ম’ স্লোগানে গত ১৫ মে থেকে ১৭ মে  নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড সিটিতে  ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বই মেলা-২০২৬’ বইমেলা আয়োজন করে  ‘নিউ ইয়র্ক একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশন’।

 অপর দিকে “যত বই তত প্রাণ ” প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে গত ২২ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের ‘আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’র ৩৫তম আসর বসে।

দুটি বইমেলাতেই বই বিক্রী ছিল প্রায় শুণ্যের কোঠায়। বই বিক্রী নিয়ে প্রকাশকরা  চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন।

 

 

Exit mobile version