নিউইয়র্কে পরিবেশিত ‘বহ্নিশিখা’ নাটক চেতনার গভীর অন্বেষণে মূর্ত হয়ে উঠেছে

সনজীবন কুমার————–

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল‍্যান্ডের নাট্য সংগঠন ‘ক্যালচারাল ক্রিয়েশন মেরিল্যান্ড’ নিউইয়র্কে তাদের নাটক ‘বহ্নিশিখা’ পরিবেশন করলো।
গত ২৯ আগষ্ট সন্ধ্যায় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে এই নাটকটি দর্শক-শ্রেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়।
অনুতোষ সাহা নাটকের রচনায় রামমোহনের সমকালীন ধারা তুলে এনেছেন। নাট্যকারের মেধা ও মননের সঙ্গে সুতীব্র অনুভূতির মিশেলে নির্মিত হয়েছে নাটকের পেক্ষাপট। নাটকটিতে রামমোহনের সেই সময়ের খুঁটিনাটি ঘটনা ধরে রাখার প্রচেষ্টা ছিল।


দর্শক-শ্রোতাদেরকে গতানুগতিক তরল -স্রোতে এড়িয়ে চেতনার গভীর অন্বেষণে মূর্ত হয়েছে আর্তি এবং সুগভীর আবেদন। দর্শকদের কাছে এই প্রযোজনাটি অবশ্যই একটি নতুন স্বাদ এনে দিয়েছে। নাটকের লেখক অনায়াস দক্ষতায় নানা স্মৃতি,নানা টুকরো ঘটনাবলী তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
ছোট বেলার অহনা (অলকমঞ্জুরী) নিজের গড়ে উঠা এক আশ্চার্য দ্বীপে বাস করেন-একা। এরপর কৈাশর-যৌবনে অস্থির ও ধূসর উজ্জ্বলতা,আপাত বিস্মৃতি স্বপ্নে জীবন্ত হয়ে খেলা করেছিল। নস্টালজিয়া আক্রান্ত বিনিদ্র রাত,কায়াহীন নিজের মুখোমুখি, একান্ত আলাপচারিতা কথকের মত দর্শকদের সামনে তুলে আনার মধ্য দিয়ে নাটকের সুত্রপাত হয়।

নাট্য প্রযোজনার সম্পর্কে সব সময় একটা আশঙ্কা থাকে যে, দর্শকদের বশীকরণের সবরকম তুকতাক প্রয়োগে সেখানে বোধহয় কোন ঘাটতি থাকবে না। কিন্ত এই নাটকে বেশ কিছু ঘাটতি দর্শকদের ‘বিষম’ খেতে হয়েছে। যেমন, ডাক্তারের সাথে অহনার বাবা ও মায়ের দীর্ঘ ইংরেজিতে কথা বলা দর্শকের কানে ঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে নাই। এখানে যদি ডাক্তারকে দিয়ে বলিয়ে নিতে পারতেন যে, আমি অল্প অল্প বাংলা বুঝি ও বলতে পারি তা হলে হয়ত নাটকের লেখক মুন্সীয়ানার পরিচয় দিতে পারতেন।


উপস্থিত অনেক দর্শক ছিলেন মধ্য ও পরিনত বয়স্ক, ইংরেজিটা তারা ঠিকভাবে গ্রহন করতে পারেন নাই। ফলে নাটকে ইংরেজিতে অতিকথন অনেক দর্শকের সাথে নাটকের সফল যোগাযোগ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। নাটক রচয়িতাকে মনে রাখতে হবে,নাটকে প্রত্যেকটি বিষয় নিখুঁত করার চেষ্টা থাকতে হবে। ইংরেজি সংলাপ উচ্চারণ সেই অর্থে এখানে অনুপস্থিত ছিল। এছাড়াও সংলাপ নির্ভর আধুনিক প্রসেনিয়াম অভিনয়ের বদলে এখানে ছিল সংগীত নির্ভর এক ধরণের স্টালাইজ্ড চলন, যা সবসময় চলতে থাকে।
ফ্লাসব্যাগ ব্যবহার এবং মঞ্চের বিশাল পর্দায় চিত্রধারণ করেছেন নাটকের প্রয়োজনীয় সাসপেন্সের জন্য। কিন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্দার ছবি দেখতে গিয়ে দর্শকরা অনেক সংলাপ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।


দার্শনিক এরিস্টটলের  নাট্যতত্বে যে ক্যাথারসিসের (বিমোক্ষণ ) কথা বলেছেন, বহ্নিশিখা নাটকেও তা প্রয়োগ করা হয়েছে।
এতবড় একটা কর্মযজ্ঞের  অভিনয়পত্র ( স্যুভিনিয়র ) থাকাটা খুব জরুরী ছিল, তা হলে দর্শক নাটকের তথ্য ও কলা-কুশলীদের দেখে নিতে পারতো।
রামমোহনের চরিত্রে একেএম খায়রুজ্জামান লিটন ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও অনুভূতিকে সহজতর ভাবে কথনে-উচ্চারণে এবং শরীরীক ভাষায় ধরে রাখার কৌশল ভালোভাবে রপ্ত করেছেন। তার সংলাপে অহেতুক জটিলতা ছিল না। ছিল নিবিড় এক নিবেদন। রামমোহনের অভিনয় দুইজন শিল্পী দুইভাগে ভাগ করে নিয়েছে।

কিন্ত প্রথম রামমোহন ছিল নিষ্প্রভ ও ব্যক্তিত্বহীন। তার সংলাপও ঠিক ভাবে দর্শকরা শুনতে পারেন নাই। যার ফলে দর্শকসারী থেকে দুই/একজনকে বলতে শোনা গেছে ‘জোরে বলেন,শোনা যাচ্ছে না”।

বৌ ঠাকুরন অলক মঞ্জুরীর অভিনয়ে তনিমা মল্লিক নিপুন দর্শকদের যে দিকটি হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছিল ,সেটি হলো তার আন্তরিক উচ্চারণ। ছোট বেলার অলকমঞ্জুরী নিজের গড়ে উঠা এক আশ্চার্য দ্বীপে বাস করেন-একা। এরপর কৈাশর-যৌবনে অস্থির ও ধূসর উজ্জ্বলতা,আপাত বিস্মৃতি স্বপ্নে জীবন্ত হয়ে খেলা করেছিল। নস্টালজিয়া আক্রান্ত বিনিদ্র রাত,কায়াহীন নিজের মুখোমুখি, একান্ত আলাপচারিতা কথকের মত দর্শকদের সামনে তুলে আনেন।

তরুণী অহনা অতনী ভট্টাচার্য কিছুটা ¤্রয়িমান ছিল। তবে পরিনত অহনা অলকমঞ্জুরীর ভূমিকায় তনিমা মল্লিক নিপুন ভাবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে নজর কাড়ে, শেষের দিকে মঞ্চের জলন্ত চিতা একটা ঠান্ডা ছায়া-ছায়া পরিবেশ ছড়িয়ে দেয়া তার আবেগী অভিনয়। মুহূর্তেই তনিমা মল্লিক আগুনে পুড়ে যাওয়া নারীদের অতিত-কাতর এক বিষন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। দর্শক এ সময় তার অভিনয়শৈলীতে আবেগপ্রবণ হয়ে যান। অহনার স্বামী আবীরের দুই/একটি সংলাপ করা ছাড়া তেমন কোন ভূমিকা ছিল না।
রামমোহনের মা তারিণী দেবীর চরিত্রে শুকলা বিশ্বাসের অভিনয়ে ফুঁটে উঠেছে তেজস্বিনী, প্রখর বুদ্ধিশীলা ও নিষ্ঠাবতী মহিলার ক্যানভাস। দৃঢ় ছিল তার উচ্চারণ,তীক্ষ্নতায় উজ্জ্বল।
বাবা রামকান্ত রায়ের ভূমিকায় প্রতিটি সংলাপেই তার আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে।
রামমোহনের স্ত্রীর চরিত্র উমা‘র নাম ভূমিকায় সৌমিনী চক্রবর্তী তিনার স্বপ্ন,স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে তার নিবিড় উচ্চারণে খেলা করে যায় নেশাময় এক বিষাদ।

দলগত কাজ ছিল এই প্রযোজনার ভিত্তি, সে দিক থেকে অভিনয়ে কয়েকজন নৈপুন্যের স্বাক্ষর রেখেছে। আর বাদবাকিরা ছিল কিছুটা নিষ্প্রভ ,আরও যত্নবান হলে ভালো হতো। ইংরেজদের জড়তা কিছুটা হতাশ করেছে। শরীরী অভিনয়ের সাফল্যে সবাই সমান অংশীদার হতে ব্যর্থ হয়েছেন।
দৃশ্যকল্প নির্মাণে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত আলো ও নানাভাবে ব্যবহৃত মঞ্চসামগ্রী ছিল দৃষ্টি নন্দন। সাজ পোষাকের পরিকল্পনায় চিন্তার ছাপ প্রকাশ পেয়েছে।
রামমোহন প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, সেই লড়াই এখনও জারি রাখতে হবে। এই ছিল নাটকের মূলবার্তা। নাটকের শেষ অংশে উপস্থিত দর্শকদেরকে রামমোহন হবার আহ্বান,নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। প্রবাসে যারা উগ্রবাদী ধর্মীয় রাজনীতিতে মগ্ন থাকে, তারা নাটক দেখার পর তাদের ধর্মান্ধ মনোজগকে কি পরিবর্তন করবে? সতীদাহ প্রথা বন্ধসহ যে রামমোহন শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে জলন্ত চিতা থেকে বিধবাদের উদ্ধার করতেন,যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগররা নিজেদের জীবনকে বাজী রেখে সমাজকে পরিবর্তন করেছেন,অসহায় নারীদেরকে রক্ষা করেছেন, সেই নারীরা কি জানে রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্রের কথা ? বাবা বালকনাথ,অনুকুল ঠাকুরের ভক্ত কয়জন নারী রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্রের স্মরণ করে ? বহ্নিশিখা নাটক বাঙালির কুসংস্কার আচ্ছন্ন চরিত্রধর্মকে পরিবর্তনের ঝড়ে উড়িয়ে দিতে পারবে কী ?
বহ্নিশিখা নাটকের রচনা ও পরিচলানা করেছেন অনুতোষ সাহা, শিল্প নির্দেশক দেবাঞ্জন বিশ্বাস ও কন্ঠ শিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন শেীনক চট্টোপাধ্যায়।


মিলনায়ত পরিপূর্ণ দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে বহ্নিশিখা নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, অতনি ভট্টাচার্য, নবনীতা নাগ,সনজীত মুখার্জী,হাবিব সিলভার,তামিনা মল্লিক, দেবান্জন বিশ্বাস,অনুতোষ সাহা, মাসুদ হাসান,সুকলা বিশ্বাস,অরিহান ভট্টাচার্য,ঐক্য বড়–য়া,আদ্রিকা ভৌমিক সেন,তিলক কর,রাজন গুহ,দেবাশীষ বিশ্বাস, নির্ভান সেনগুপ্ত,শুভাঙ্গীনী চক্রবর্তী রিমা, একেএম খায়রুজ্জামান লিটন,সৌমিনি চক্রবর্র্তী তিনা,অভিক দাশ, সুপ্রিয় পাইন,আদিত্য চক্রবর্তী,অনিক সাহা,অনুতোষ সাহা,অনুরাগ বিশ্বাস, লুচি সিলভারসহ অনেকে।
অনেক বড় কল-কুশলীর সমন্বয়ে নাটকটিতে ভুলক্রটি থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল।তাই ভালো মন্দ মিলেই নাটকটি দর্শক গ্রহন করে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়-“যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি।”
তবে দ্রোহ,দ্বন্দ্ব, প্রথা ভাঙ্গার আলো হিসেবে দেখার রেশটা যেন নাটক শেষ হবার পরেও আমাদের সাথে থেকে যায়। বহ্নিশিখা ভবিষ্যতের আরও নাটক দেখার প্রত্যাশা জাগিয়ে দিয়ে গেল।

Exit mobile version