সন্ধান২৪.কম : নিউইয়র্কে ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড’ প্রতারণা,তামাশা ও দূর্নীতিতে ভরা ছিল। এমন হাস্যকর অনুষ্ঠানের আয়োজনে নিউইয়র্কের বাঙলাদেশী কমিউনিটি ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে।
গত ৯ আগস্ট নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে অনুষ্ঠিত হলো ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড’। ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড’ নাম হলেও বাংলাদেশের কয়েকটি আঞ্চলিক ও বিভিন্ন সংগঠন ছাড়া সাউথ এশিয়ার ৮টি দেশের কোন দেশ অংশ গ্রহন করে নাই। পোষ্টারে যে সব অতিথি ও শিল্পীদের নাম ছিল তাদের সিংহভাগ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিল। শেষ মুহূর্তেও চালানো প্রচারণায় নিউইয়র্ক সিটি মেয়র জোহরান মামদানিকে ‘প্যারেড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মেয়রের থাকাতো দূরের কথা, তার কোনো প্রতিনিধিও আসেননি এ প্যারেডে। এতে কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট ডনাভ্যান রিচার্ডস এবং ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ ছিলেন বিশেষ সম্মানীত অতিথি। তারাও ছিলেন অনুপস্থিত।

দর্শক সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। প্যারেডের কোন কোন ব্যানারের পিছনে ৪/৫ জনকে দেখা গেছে । দুই/একটি ব্যানার ভাড়া করা শ্রমিকদের ধরতে দেখা গেছে। শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও সেটিও হয় নাই। পুরো আয়োজন ছিল অগোছালো,বিশৃঙ্খলা আর ভূলভালে পরিপূর্ণ ।
আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশ সোসাইটির নাম থাকলেও ওই দিন তাদের কোন ভূমিকা চোখে পড়ার মত ছিল না। এ ব্যাপারে সোসাইটির সাবেক এক নেতা মন্তব্য করেন, প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের এই সংগঠনের ওজন,গুরত্ব এবং এর বিশালতা বুঝার জ্ঞান, ক্ষমতা ও দক্ষতা এই সংগঠনের কর্মকর্তাদের নেই। যার ফলে তারা সংগঠনের অর্থ দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করছেন ।
সোসাইটির সাবেক আর একজন কর্মকর্তা বলেন, যারা সোসাইটির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তারা ২০ ডলার দিয়ে কিছু মেরুদন্ডহীন প্রাণীর বিবেক কিনে নির্বাচিত হন। এদের না থাকে যোগ্যতা ও দক্ষতা। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে, সোসাইটি দিন দিন প্রশ্নের সন্মুখিন হচ্ছে।
কমিউনিটি থেকে প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে খোলো একটা প্যারেডের আয়োজন করে কর্মকর্তারা বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ধংস করেছে। তাদের প্রশ্ন,এমন ছেলেখেলার আয়োজন করে বাংগালীর মর্যাদাকে ধূলার সাথে মিশিয়ে দেয়ার অধিকার তাদেরকে কে দিয়েছে ? সীমাহীন এই ব্যর্থতার দায় কার ? বাংলাদেশ সোসাইটির না গুটিকয়েক মানুষের ?
আয়োজকরা সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি উদযাপনের মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যেকার ঐক্যকে বহুজাতিক সমাজে আরো বলিষ্ঠতার সাথে উপস্থাপনের লক্ষ্যে এই প্যারেডের আয়োজন। কিন্ত দৃশ্যত তা সবাইকে হতাশ করেছে। কারণ, এই প্যারেডে প্রধান অতিথি, বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে যাদের নাম প্রচার করা হয়েছিল তাদের কেউই আসেননি। এমনকি প্যারেড শেষে জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে বলে যে প্রচারণার চালানো হয়েছিল সেটিরও কোনো আলামত ছিল না।
গেস্ট অব অনার হিসেবে কেবল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘ডিস্ট্রিক্ট লিডার এ্যাট লার্জ’ অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী উপস্থিত থাকলেও বক্তৃতার সুযোগ পাননি। কমিউনিটি সম্পর্কিত চেয়ারওম্যান সিফা আমিন উপস্থিত থাকলেও হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির জন্য শুভেচ্ছা বক্তব্যের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও মঞ্চে উঠতে সক্ষম হননি। এমনি একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে এই প্যারেডের গ্র্যান্ড মার্শাল শাহনেওয়াজ মাইক হাতে নিয়ে দুয়েক মিনিট কথা বলেই ঘোষণা দেন যে, এক্ষুণি আমাদের প্যারেড শুরু হবে। তাই বক্তৃতা পর্ব বাতিল করতে হলো বলে দুঃখিত।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্যারেডের নাম ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড’ হলেও হোস্ট কমিটির সকলেই ছিলেন বাংলাদেশি। আয়োজক সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’র নাম উচ্চারিত হলেও প্যারেডে তা দৃশ্যমান হয়নি।
শুরু থেকেই এ আয়োজন নিয়ে কমিউনিটিতে নানা গুঞ্জন ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশ অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলংকার কাউকে রাখা হয়নি হোস্ট কমিটিতে। সংগঠন হিসেবে কেবল নেপালের ‘গীরিজা প্রসাদ কৈরালা ফাউন্ডেশন’ আর পাকিস্তানিদের মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট জ্যাকসন হাইটসের ‘ডেরা’র ব্যানার ছিল প্যারেডে।
একটি অন-লাইন পত্রিকা দাবী করেছে, ”আয়োজনের দৈন্যতার প্রকাশ ঘটেছে ‘চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা’র ব্যানারে মেক্সিকানদের উপস্থিতিতে। হোস্ট কমিটির বানানো ব্যানারে চট্টগ্রামের ওই সংগঠনের কাউকে না পেয়ে মেক্সিকানদের দাঁড় করিয়ে দেয়ার ঘটনায় পুরো সময়ের জন্য হাস্যরস তৈরী হয়। ‘যদিও প্যারেডের পুরো পথে দেখা গেছে মাত্র ১৭টি সংগঠনের ব্যানার। এগুলো হচ্ছে ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিটি সার্ভিস, ইয়ুথ ফর দ্য ইয়ুথ, কুষ্টিয়া জেলা সমিতি, বগুড়া সোসাইটি ইউএসএ, প্রবাসী সিরাজগঞ্জ জেলা সমিতি, চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা, বাংলাদেশ আমেরিকান সোসাইটি, প্রবাসী মতলব সমিতি, গীরিজা প্রাসাদ কৈরালা ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা, হৃদয়বীনা সঙ্গিত নিকেতন, বহ্নিশিখা সঙ্গীত নিকেতন, পুলিশ ব্যান্ড, এনওয়াইপিডি দেশী, এনওয়াই সাইবার বিজনেস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লায়ন্স ক্লাব, নবাবগঞ্জ এসোসিয়েশন এবং ডেরা রেস্টুরেন্ট।
ফ্লট ছিল ৯টি। এগুলো হচ্ছে অ্যল কাউন্টি হোমকেয়ার, হাজিগঞ্জ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসী, ডেরা রেস্টুরেন্ট, জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা ইনক, বাংলাদেশ সোসাইটি, গোল্ডেন অ্যাজ হোমকেয়ার, অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী এবং চ্যানেল আই।
প্যারেড প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী বলেন, বহুজাতিক সমাজে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে ঐক্যের ভীষণ প্রয়োজন। সে তাগিদেই এ প্যারেডের আয়োজন করা হয়েছিল,তবে হোস্ট কমিটির মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া গেল না।
প্যারেডের অনুমতি সংগ্রহকারি শাহ শহীদুল হক সাঈদ বলেন, নানাবিধ কারণে বিশেষ করে প্রস্তুতির সময় খুব কম হওয়ায় কিছুটা জটিলতা দেখা গেলেও সামনের বছর সবকিছু কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো।”