বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনী রয়েছে রাশিয়ার। কিন্তু এরপরও ২২ দিনে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অভিযানে খুব বেশি সফলতা অর্জন করতে পারেনি রাশিয়া। যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর এই চিত্র দেখে অনেক সামরিক বিশ্লেষক রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে রুশ বাহিনীর দক্ষতা রীতিমতো হতাশাজনক।
চলতি সপ্তাহে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, ‘রাশিয়ানরা স্পষ্টতই তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এবং সম্ভবত দিনের শেষে পারবেও না।’
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে রাশিয়ার ভুলটা কোথায়? পশ্চিমা সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রাশিয়ার কিছু ভুল চিহ্নিত করেছেন।
ভুল অনুমান
রাশিয়ার প্রথম ভুল ছিল ইউক্রেনের প্রতিরোধের ক্ষমতা ও ছোট সশস্ত্র বাহিনীটির সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা। রাশিয়ার বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। অথচ ইউক্রেনের খরচ মাত্র ৪০০ কোটি ডলার। এছাড়া রাশিয়া তাদের নিজস্ব সামরিক শক্তিকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেছে বলে মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন তার সামরিক বাহিনীর জন্য একটি উচ্চাভিলাষী আধুনিকীকরণ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন।
এক জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাশিয়া তার সামরিক বাজেটের বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় করা হয়েছে, যার মধ্যে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নতুন অস্ত্র তৈরিও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ট্যাঙ্ক টি-১৪ আরমাটা তৈরি করেছে। কিন্তু এই ট্যাঙ্কটি রেড স্কোয়ারে মস্কোর বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে দেখা গেলেও ইউক্রেন যুদ্ধে অনুপস্থিত। রাশিয়া যা মাঠে নামিয়েছে তার বেশিরভাগই পুরানো টি-৭২ ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান, আর্টিলারি ও রকেট লঞ্চার।
আক্রমণের শুরুতে রাশিয়ার বিমানবাহিনীর একটি সুস্পষ্ট সুবিধা ছিল। যুদ্ধ বিমানগুলো ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ওই সময় ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমানের বিপরীতে রাশিয়ার তিনটিরও বেশি যুদ্ধ বিমান ছিল। অধিকাংশ সামরিক বিশ্লেষক ধরে নিয়েছিলেন যে ইউক্রেনের আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে রুশ যুদ্ধ বিমান, কিন্তু তা হয়নি। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে, যা রাশিয়ার যুদ্ধবিমানের চলাচলের ক্ষমতাকে সীমিত করছে।
মস্কোর ধারণা ছিল, তাদের বিশেষ বাহিনী দ্রুত ও চূড়ান্ত আঘাত হানতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
এক ঊর্ধ্বতন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, রাশিয়া ভেবেছিল তারা স্পেটস্নাৎজ ও ভিডিভি প্যারাট্রুপারের মতো হালকা ও দ্রুতগামী ইউনিট মোতায়েন করতে পারবে যারা ‘অল্প সংখ্যক প্রতিরোধকামীকে নির্মূল করতে পারবে।’কিন্তু প্রথম কয়েকদিনে কিয়েভের ঠিক বাইরে হোস্টোমেল বিমানবন্দরে তাদের হেলিকপ্টার হামলা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে রাশিয়া সেনা, সরঞ্জাম এবং সরবরাহ আনার জন্য একটি এয়ারব্রিজ নামাতে পারেনি। এর পরিবর্তে, রাশিয়াকে তার সরঞ্জামের বেশিরভাগই সড়কপথে পরিবহন করতে হয়েছে। এগুলো ট্র্যাফিক জ্যাম ও আটকে থাকার পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য অতর্কিত হামলার সহজ লক্ষ্যবস্তু ছিল। কিছু ভারী সামরিক যান কাদায় আটকে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
উত্তর থেকে রাশিয়ার দীর্ঘ সাঁজোয়া যানের সারি এখনও কিয়েভকে ঘিরে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দক্ষিণ থেকে এসেছে। সেখানে তারা সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য রেল লাইন ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও কম মনোবল
রাশিয়া এই আক্রমণের জন্য প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার সেনা জড়ো করেছে। কিন্তু এই বাহিনী ইতোমধ্যে তাদের শক্তির প্রায় ১০ শতাংশ হারিয়েছে। রাশিয়ার বা ইউক্রেনের সেনা হতাহতের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। ইউক্রেনের দাবি, তারা ১৪ হাজার রুশ সৈন্যকে হত্যা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমান, এর অর্ধেক সেনা হারিয়েছে রাশিয়া।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়ার সেনাদের মনোবল হ্রাস পাওয়ার প্রমাণও রয়েছে। সেনারা ‘ঠান্ডার মধ্যে রয়েছে, তারা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত’। কারণ হামলার আদেশ পাওয়ার আগে তারা বেলারুশ ও রাশিয়ায় কয়েক সপ্তাহ তুষারপাতের মধ্যে অপেক্ষা করেছিল।
সরবরাহ ও রসদ
একটি পুরানো সামরিক প্রবাদ আছে, অপেশাদাররা কৌশল নিয়ে কথা বলে যখন পেশাদাররা রসদ নিয়ে গবেষণা করে। রাশিয়া যে রসদ সরবরাহের বিষয়টি যথেষ্ট বিবেচনা করেনি তার প্রমাণ রয়েছে। সাঁজোয়া যানগুলোর জ্বালানি, খাদ্য ও গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেছে। যানবাহনগুলো অচল ও পরিত্যক্ত হয়ে গেছে এবং পরে এগুলো ইউক্রেনীয় ট্রাক্টর দিয়ে টানা হয়েছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারাও বিশ্বাস করেন যে রাশিয়ার হয়তো কিছু অস্ত্রশস্ত্র কম রয়েছে। তারা ইতোমধ্যেই ৮৫০ থেকে ৯০০টি দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া তার কিছু ঘাটতি পূরণ করতে চীনের সাথে যোগাযোগ করেছে। এর বিপরীতে, ইউক্রেনে অবাধে পশ্চিমা অস্ত্র যাচ্ছে, যা দেশটির মনোবলকে বাড়িয়ে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা প্রতিরক্ষা সহায়তার আওতায় ইউক্রেনকে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার দেবে। এছাড়া আরও ট্যাঙ্ক ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি, ছোট কিন্তু নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম সুইচব্লেড ড্রোন সরবরাহ করবে।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এতো বিপত্তি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট পুতিনের ‘পিছু হটার সম্ভাবনা কম এবং এর পরিবর্তে হামলা জোরদার করতে পারেন। তিনি সম্ভবত আত্মবিশ্বাসী যে রাশিয়া সামরিকভাবে ইউক্রেনকে পরাজিত করতে পারবে।’ ইউক্রেনীয় বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধ সত্ত্বেও পুনঃ সরবরাহ ছাড়াই পুতিন অনেক বেশি গোলাবারুদ ও অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন।
