রুদ্ধশ্বাস অভিযানে সিরাজগঞ্জে ৪ জঙ্গি আটক, অস্ত্র উদ্ধার

সন্ধান২৪.কম : জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার উকিলপাড়া এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। এসময় চার সন্দেহভাজন জঙ্গি আত্মসমার্পণ করেছে বলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম। এছাড়া একতলা টিনশেডের ওই বাড়ি থেকে অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করছে বাহিনীটি।   

রাজশাহীতে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের দেয়া তথ্যে সিরাগঞ্জের শাহজাদপুরে মিলেছে জঙ্গি আস্তানা। প্রশিক্ষণের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে শাহজাদপুরের পৌর এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে জঙ্গিরা ২৪ দিন আগে আস্তানাটি গড়ে তোলে। জঙ্গি আস্তানা থাকার তথ্যে শুক্রবার (২০ নভেম্বর) ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত শাহজাদপুরের পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ওই বাড়ি ঘেরাও করে। পরে টানা ৬ ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর রক্তপাতহীন অভিযানের মধ্যদিয়ে অভিযানের সমাপ্তি ঘটিয়ে আটক করা হয় ৪ জঙ্গিকে। আস্তানা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর ২টি পিস্তল, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, মাদকসহ নানা উপকরণ উদ্ধার করেছে র‌্যাব। জঙ্গিরা উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে আস্তানায় নিরাপদে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। এ ঘটনায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদক ও পুলিশ অ্যাসল্টের পৃথক ধারায় ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে র‌্যাবের পক্ষ থেকে।

অভিযান শেষে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার জানান, রাজশাহী শাহ মখদুম এলাকায় মাসিক সভা করার সময় আঞ্চলিক কমান্ডার মাহমুদসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাবের একটি দল। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শাহজাদপুরের পৌর এলাকার উকিলপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে জঙ্গিরা আস্তানা পেতেছে বলে খবর মিলে। গোয়েন্দা নজরদারির পর জঙ্গিরা আস্তানায় অবস্থান করছেন নিশ্চিত হওয়ার পর শুক্রবার ভোরে র‌্যাব বাড়িটি ঘেরাও করে। প্রাথমিক অবস্থায় র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে চার থেকে পাঁচটি গুলি ছোড়া হয়। এ অবস্থায় ওই বাড়ির আশপাশ থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। সকাল ১০টার দিকে চূড়ান্ত অভিযান শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতরে থাকা ৪ জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় বাড়ি থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, গান পাউডার, ফিউজ, জিহাদি বই, বিভিন্ন নির্দেশনামূলক বই, একটি চাপাতি ও দুটি রামদা উদ্ধার করা হয়। আত্মসমর্পণকারীরা হলেন, জেএমবির আঞ্চলিক সেকেন্ড ইন কমান্ড কিরণ ওরফে শামীম ওরফে হামিম, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাইমুল ইসলাম, দিনাজপুরের আতিয়ার রহমান ওরফে কলম সৈনিক ও সাতক্ষীরার আমিনুল ইসলাম ওরফে শান্ত।

সংবাদ সম্মেলনে কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার আরও বলেন, বাড়িটি মূলত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখানে অনার্স-মাস্টার্স, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাদ্রাসা ছাত্রদের মধ্যে আদর্শগত প্রচারণা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। ২০ থেকে ২৫ দিন আগে তারা ছাত্র পরিচয়ে বাড়িটি ভাড়া নেন। বাড়ির মালিক বগুড়ায় থাকেন।

শুক্রবার ঘটনাস্থল ঘুরে জানা গেছে, ২৪ দিন আগে জঙ্গিরা নিজেদের তাবলীগ জামায়েতের অনুসারী পরিচয় দিয়ে শাহজাদপুর পৌর এলাকার শেরখালী উকিলপাড়ার সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (শিক্ষা) শামসুল হক রাজার বাড়ি ভাড়া নেয়। ওই বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার বিষয়টির নিশ্চিত হয়ে র‌্যাব সদস্যরা শুক্রবার ভোর ৪টার দিকে গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে এবং জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করার জন্য সময় বেধে দেন। এর আগে র‌্যাবের সদস্য গোটা এলাকা কর্ডন করে। আশপাশের বাসাবাড়ি থেকে সাধারণ মানুষকে বের না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। জঙ্গি আস্থানার আশপাশে ১ কিলোমিটার জুড়ে র‌্যাব কর্ডন করে সব ধরনের মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এমনকি সব ধরনের যানবাহনও চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সাংবাদিকরাও ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যেতে পারেননি।

ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার যাওয়ার পর অভিযানের মূল কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমদিকে রাজি না হলেও অভিযানের ৬ ঘণ্টার মাথায় এসে জঙ্গিরা আত্মসমর্পণে রাজি হয়। এরপর তারা একে একে বেরিয়ে আসলে তাদের আটক করে র‌্যাব হেফাজতে নেয়া হয়। জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করার পর আস্তানাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় র‌্যাবের সদস্যরা। কমান্ডো বাহিনী, বোম ডিস্পোজাল ইউনিট আস্তানার ভেতরে প্রবেশ করে অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন আলমত জব্দ করে। জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানকে ঘিরে এলাকায় সকাল থেকে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। আশপাশের লোকজনের মধ্যে কিছুটা উৎসুক পরিস্থিতি তৈরি হয়। জঙ্গি আস্তানা খুঁজে বের করা এবং অভিযানের খবরে আশপাশের এলাকা থেকে শত শত লোক ভিড় জমায়। তবে অভিযানকে ঘিরে র‌্যাব আশপাশের এক কিলোমিটারজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। এলাকাবাসীর দেয়া তথ্যে শুক্রবার ভোর ৪টায় শাহজাদপুরের শেরখালী উকিলপাড়া অস্থায়ী ওই আস্তানাটির চতুর্দিক প্রায় দেড়শ’ র‌্যাব সদস্য ঘিরে ফেলে । এ সময় তারা ৪ থেকে ৫ রাউন্ড গুলির শব্দ পান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ৪ জঙ্গি আত্মসমর্পণ করে। আটক জঙ্গিরা নিজেদের জেএমবির সদস্য বলে পরিচয় দেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, যে বাড়িটিতে র‌্যাব জঙ্গি আস্তানা খুঁজে পেয়েছে সেই বাড়ির মালিক বগুড়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দফতরে চাকরি করেন। তিনি বাড়িটি স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিনে ভাড়া দেয়ার জন্য দায়িত্ব দেন তার ভায়রা ভাইকে। সেই ভায়রা ভাইয়ের কাছ থেকে জঙ্গিরা ২৪ দিন আগে বাড়িটি ভাড়া নেয়। এ গ্রুপের আগে আরও একাধিক গ্রুপ একইভাবে ভাড়া নিয়েছিল। ৪ থেকে ৫ জনের গ্রুপ এসে ২ মাস অবস্থান করত। এরপর আবার নতুন কেউ এসে ভাড়া নিত। অভিযানের পর থেকে বাড়ির মালিকের ভায়রার খোঁজ মিলছে না। তাকে র‌্যাব আটক করেছে নাকি সে আত্মগোপনে আছেন এ বিষয়ে স্থানীয়রা কেউ কিছু জানে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বাড়িটি উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে ৫শ’ গজ দূরে। ওই আস্থানা থেকে থানার দূরত্ব ১ কিলোমিটারের মতো। থানার ১ কিলোমিটারের মধ্যে এতদিন ধরে জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আসলেও এলাকাবাসী কেউই বিষয়টি টের পায়নি।

র‌্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেনেন্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ শুক্রবার টেলিফোনে সংবাদকে জানান, অভিযানের পর আত্মসমর্পণ করা জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ ঘটনায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে অস্ত্র আইনে একটি, বিস্ফোরক আইনে একটি, পুলিশকে অ্যাসল্ট এবং সরকারি কাজে বাধা দেয়ার ঘটনায় একটি এবং মাদক আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলো তদন্তের জন্য র‌্যাবের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে। মামলাগুলো তদন্ত দায়িত্ব হাতে পাওয়ার পর তদন্ত করা হবে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ভাড়া নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। সেখানে বোমা তৈরি, অস্ত্র চালানো, হামলা করা, টার্গেট ঠিক করাসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, খুব শীঘ্রই হামলার পরিকল্পনা ছিল। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক হামলা চালানোর টার্গেট নিয়ে ওই আস্তানাটিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। আস্তানাটি খুঁজে পেতে র‌্যাবকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। রাজশাহীতে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিরা তথ্য দেয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব নজরদারি বৃদ্ধি করে। অভিযানের শুরুতেই র‌্যাব নিশ্চিত হয় জঙ্গিরা ভেতরে অবস্থান করছে। র‌্যাবের লক্ষ্য ছিল আস্তানায় থাকা জঙ্গিদের জীবিত অবস্থায় আটক করা। এ কারণে অভিযানের শুরুতে র‌্যাব সর্তক অবস্থান নেয়। জঙ্গিরা যখন ভেতর থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি করে তখন কৌশল পাল্টে র‌্যাব নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। এরপর বার বার মাইকিং করে র‌্যাব জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ধরে ধৈর্য ধরার পর সকাল ১০টার দিকে জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। এরপর সেখানে যাওয়া হলে জঙ্গিরা র‌্যাবের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে। এক পর্যায়ে জঙ্গিদের পরাস্ত করে র‌্যাবের সদস্যরা ৪ জনকে আটক করে ফেলে। সূত্র জানায়, ভোর বেলা পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ড পুরোপুরি ঘেরাও করে র‌্যাব। সে সময় তাদের সঙ্গে রাজশাহীতে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডারও ছিল। মূলত তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে ওই আস্তানাটি শনাক্ত করে র‌্যাব।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিরা আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেছিল। এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণের জন্য রাজি হলে তাদের যখন আটক করতে যাওয়া হয় তখন তারা ধস্তাধস্তি করে কিছু একটা বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু র‌্যাবের কৌশলের কারণে জঙ্গিরা পরাজিত হয়েছে। জীবিত গ্রেফতার হওয়ার কারণে এসব জঙ্গিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যাবে। সূত্র জানায়, আস্তানায় মাদকদ্রব্য মিলেছে। ধারণা করা হচ্ছে এখানে যেসব জঙ্গি ছিল তারা মাদক সেবন করত। অথবা মাদকের ব্যবসার সঙ্গে তাদের সম্পৃত্তা থাকতে পারে। জঙ্গি আস্তানা থেকে মাদক উদ্ধার এই প্রথম।

 

Exit mobile version