সন্ধান ২৪.কম:সাবেক সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালকে পরবর্তী প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদ। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও আনিছুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ রাশেদা সুলতানা এমিলি এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবীব খানকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শনিবার প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ এই পাঁচজনকে নিয়োগ দিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন শনিবার জারি করা হয়।
নতুন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। চাকরি জীবনে প্রতিরক্ষাসহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা হাবিবুল আউয়াল আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে সুপার নিউমারি সচিব ছিলেন। সেখান থেকে তাকে ধর্ম সচিব করা হয়।
পরে প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৮ই জুন তার চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ায় সরকার। ২০১৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা ছিল হাবিবুল আউয়ালের। ২০১৫ সালের ২১শে জানুয়ারি পিআরএল বাতিল করে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার। ২০১৭ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে অবসরে যান তিনি।
নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. আলমগীর ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে অবসরে যান। এ ছাড়া তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আনিছুর রহমান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব হিসেবে ২০২০ সালের ৫ই জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে যোগদান করেছিলেন। এরপর ২০২১ সালের ৩০শে ডিসেম্বর তিনি পিআরএল (এক বছরের অবসরোত্তর ছুটি) এ যান। আনিছুর রহমান শরীয়তপুর জেলায় ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের সদস্য আনিছুর রহমান ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে চাকরিতে যোগ দেন। চাকরিজীবনে তিনি সহকারী কমিশনার, উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কাজ করেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সবাইকে নির্বাচনে আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ-নতুন সিইসি: বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনাকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেছেন, নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিএনপি’র মতো বড় রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য দলকে নির্বাচনে আনা। আপেক্ষিক হলেও নির্বাচনকে সার্বজনীন রূপ দেয়া। সবাই যে আসবে তা নয়, তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে সবাইকে আস্থায় নেয়া। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলামোটরস্থ নিজের বাসভবন ওয়ালসো টাওয়ারে সাংবাদিকদের এই প্রতিক্রিয়া দেন হাবিবুল আউয়াল।
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে নির্বাচন কমিশন এককভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে না। অনেকগুলো স্টেকহোল্ডার থাকে। সকলই যদি সহযোগিতা করেন, রাজনৈতিক পরিবেশ যদি অনুকূল থাকে তাহলে হয়তো কিছুটা সফলতা আমাদের আসবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে নবনিযুক্ত সিইসি বলেন, এক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা লাগবে।
কমিশনের সামনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবকিছুই চ্যালেঞ্জ, জীবনটাই চ্যালেঞ্জ, নির্বাচন চ্যালেঞ্জ, সরকার চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ ছাড়া জীবন হয় না। চ্যাঞ্জে ছাড়া মানুষের অগ্রগতি হয় না। চ্যালেঞ্জ ফেস করেই এগিয়ে যেতে হবে।
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর মো. আলমগীর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি কী বলবো? বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি যে নির্বাচন কমিশনার হবো, এমনটা আমার ধারণাতেও ছিল না। দু’-একদিন যাক, একটু দেখি-বুঝি, তারপর বলবো। তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে আমরা শিক্ষা নেয়ার চেষ্টা করবো এবং অতীতের ইসি’র ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না বলে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। এ সময় তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিয়ে কমিশন পরিচালনার চেষ্টা করা হবে। ইসি’র কর্মকাণ্ড যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় সেদিকে তারা সতর্ক থাকবেন। বিরোধী দল বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ইসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি তাহলে তারা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন জানতে চাইলে সাবেক এই ইসি সচিব মো. আলমগীর বলেন, আমরা কমিশন মিটিংয়ে বসব, সবাই তাদের মতামত দেবেন। অবশ্যই আমরা সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করবো।
নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আরেক সাবেক সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান অবশ্য নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আইন ও বিধি অনুযায়ী সংবিধান আমাকে যেটুকু ক্ষমতা দিয়েছে তার আলোকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করবো। নির্বাচন কমিশনের প্রতি জাতির প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আগে বসি, আলাপ-আলোচনা করি। কী আছে কী করতে হবে। এককভাবে তো হবে না, কমিশন মানে সবাই মিলে। আমাদের শপথ হবে। আমরা বসবো, আলাপ-আলোচনা করবো। আমাদের সামনে কী অপেক্ষমাণ, সেগুলো দেখেশুনে এ বিষয়ে বলাটা ঠিক হবে।
নতুন নির্বাচন কমিশনার হয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা জানান, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চান তিনি। সবার সহযোগিতা থাকলে সহজভাবেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। কমিশনের শপথগ্রহণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ২৭শে জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রথমবারের মতো আইন প্রণয়ন করে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ই ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করে দেন প্রেসিডেন্ট। এরপর সার্চ কমিটির প্রথম বৈঠকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও সুধীজনের কাছ থেকে নাম আহ্বানের সিদ্ধান্ত হয়। একইসঙ্গে বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠক আহ্বান করে সার্চ কমিটি। সরাসরি ও ই-মেইলের মাধ্যমে সার্চ কমিটির কাছে যেসব নাম আসে তার মধ্য থেকে ৩২২ জনের তালিকা প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এরপর বিশিষ্টজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের মাধ্যমেও বেশকিছু নাম পায় সার্চ কমিটি। সেখানেও কিছু কমন নাম বাদ দিয়ে তালিকায় প্রস্তাবিত নামের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২৯ জনে। এসব নাম থেকে একাধিক দফায় বৈঠক করে ২০ জনের নাম বাছাই হয়, দ্বিতীয় দফায় সেটা ১২-১৩ জনে আসে। গত মঙ্গলবার (২২শে ফেব্রুয়ারি) সার্চ কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত হয়।
