স্বাধীনতা সংগ্রামী ডাঃ শ্রীশ চন্দ্র সরকার
জন্ম ঃ ২৬ ডিসেম্বর ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ
মৃত্যু ঃ ১৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ
***********************************************************************************************************************
বৈ । দ্য । না । থ প্রা । মা । ণি । ক
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তথা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে নাম না জানা অজস্র সশস্ত্র বাঙালী বিপ্লবীদের মধ্যে এক অনন্য আদর্শের নাম, আপোষহীন লড়াকুর নাম, গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুর নাম, আজীবন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর চিন্তাধারায় বিশ্বাসের নাম ডাঃ শ্রীশ চন্দ্র সরকার।
গাইবান্ধা শহরের পশ্বিমে অবস্থিত তুলশীঘাটস্থ মধুপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ইংরেজী ১৯০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর তারিখে ডাঃ শ্রীশ চন্দ্র সরকার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শ্রী গিরিশ চন্দ্র সরকার ও মাতার নাম শ্রীমতি সরোজিনী সরকার। মধুপুর নিবাসী ১০৪ বৎসর বয়স্ক শ্রী হরিপদ বর্মণ বলেন গিরিশ চন্দ্রের ছিল তিন পুত্র সন্তান। (১) শ্রীশ চন্দ্র সরকার (২) অমরেশ চন্দ্র সরকার ও (৩) প্রভাত চন্দ্র সরকার। তিন ভাইয়ের মধ্যে শ্রীশ চন্দ্র ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী। শ্রী গিরিশ চন্দ্র সরকারের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সতীশ চন্দ্র এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা যোগেশ চন্দ্র সহ তাদের ছিল একান্নবর্তী পরিবার। পার্শ্বের গ্রাম ইসলামপুরে সবেমাত্র গড়ে উঠেছে জমিদার প্রমথ নাথ চক্রবর্তীর একমাত্র পাঠশালা যা এখন ১নং বল্লমঝাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে অভিহিত। এখানেই শুরু হয় বালক শ্রীশ চন্দ্রের বাল্য শিক্ষার কার্যক্রম।

প্রাথমিকের পাঠ সমাপ্তির পরে গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাইস্কুলে পাঠকালে নিজেকে একজন সুঠাম দেহী যুবক হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন বালক শ্রীশ চন্দ্র। সে অনুযায়ী শহরের মধ্যপাড়াস্থ স্বীয় পৈত্রিক নিবাসের পার্শ্বেই অবস্থিত মণি পাঠাগারে ব্যায়ামের অনুশীলনের সময়ে বহুবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন কিন্ত হাল ছাড়েননি কখনো। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খেলা দেখিয়ে এবং কুস্তিতে জিতে এলাকায় মাকড়া ডাকাত হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন এই কুস্তিবিদ। পার্টির ফান্ড সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যখন দল নিয়ে একত্রে কাজ করতেন এই বঙ্গবীর তখন বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর নেতৃত্ব থাকতো অপ্রতিরোধ্য। ১৯২২ সালে ম্যাট্রিক পাশের পর মাত্র ১৬ বৎসর বয়সে নবীন শ্রীশ চন্দ্র সরকার উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলিকাতায় পাড়ি জমান।
বাঙালী নাকি দূর্বল, ভীরু, কাপুরুষ, আত্মরক্ষায় অক্ষম- এই অপবাদ ঘোচাতে তাঁর মনের মধ্যে অহর্নিশি চলতো ভীষণ রকমের তোলপাড় আর বাহুতে তখন অসীম তেজ-বুকে অমিত বল। ছোট বেলা থেকেই পড়াশুনার চেয়ে শরীর চর্চার উপর তাঁর ঝোঁক ছিল বেশী। কুস্তিতেও ছিলেন বেশ পারদর্শী। হেলায় হারাতেন তখনকার পালোয়ানদের। স্বপ্ন দেখতেন সৈনিক হবেন। ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে বাঙালীর প্রবেশ তখন নিষিদ্ধ। ঠিক করেন কোন দেশীয় রাজ্যের সেনাবাহিনীতে ঢুকে যুদ্ধবিদ্যা শিখবেন। কিন্তু সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের জীবনকথা পড়তে তাঁর ছিল ভীষণ কৌতুহলী মন আর সেই থেকেই স্বদেশ প্রেমের স্ফুরণ ঘটে গিয়েছিল তাঁর হৃদয় পটে- কলিকাতায় এসে তা যেন কানায় কানায় পূর্ণতা পাওয়ার দ্বার প্রান্তে উপনীত হলো। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। আবাল বৃদ্ধ বনিতা সেই চুম্বক নেতৃত্বের টানে অস্থির হয়ে উঠেছেন। স্কুল কলেজে চলছে লাগাতার ধর্মঘট, আইনজীবীরা কোর্ট বয়কট করে পথে নেমেছেন, সরকারী কর্মচারীরা দলে দলে পদত্যাগ করে চলেছেন। সমস্ত ভারতবর্ষে সে কি তুমুল উন্মাদনা। কিশোর শ্রীশ চন্দ্র স্ব-ইচ্ছায় সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। বয়স কম হলে কি হবে তাঁর বুদ্ধি মত্ত্বার পরিচয় পেয়ে প্রবীণ বিপ্লবীরাও অবাক হতেন-কেউ কেউ বলতেন এই ছেলে একদিন অনেক বড় হবে।

লেখাপড়ার পাশাপাশি চলতে থাকে রাজনীতি আর সমাজ সেবার কাজ। ১৯২১ সালের বন্যার সময় শ্রীশ চন্দ্র সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ত্রাণ কমিটি গঠন করে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের মধ্যে ব্যপক ভূমিকা রাখেন। বন্যার পর দেখা দেয় মহামারী। অকুতোভয় শ্রীশ চন্দ্র সরকার এই মহামারীর বিরুদ্ধে একক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন নানানভাবে। পরিবারের আপত্তির কথাও বিন্দুমাত্র আমলে নেন নি।
১৯২৩ সালে শ্রীশ চন্দ্র সরকার বিপ্লবী দলের সক্রিয় পদ গ্রহণ করেন। এই সময়ে বিশিষ্ট বিপ্লবী শচীন্দ্র নাথ সান্যাল কলিকাতায় এসেছিলেন। শচীন বাবুর অনুরোধে ভবানীপুরে একটি গোপন বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপিত হয়। শ্রীশ চন্দ্র ছিলেন এই বিপ্লবী দলের অন্যতম সংগঠক। তাঁর উপর একটি কঠিন কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। তাঁকে বিভিন্ন পরিবারের ছেলেদের সঙ্গে মিশতে হবে। তিনি দেখতেন কার মধ্যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ রয়েছে। সেই ছেলেকে দলের সদস্য করতে হবে। এর জন্য শ্রীশ চন্দ্রকে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হতো। এই কাজে শ্রীশ চন্দ্র অসাধারণ সফলতা অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁর গোপন যোগাযোগ নিবিড় হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে এল.এম.এফ সমাপ্ত করে স্বভূমে প্রত্যবর্তন ঘটেছে এই স্বরাজ প্রেমিকের। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার মাধ্যমে চালিয়ে যান আহত বিপ্লবীদের চিকিৎসার কাজটিও দাতব্য চিকিৎসার সাথে সাথে। গর্ভবতী মাতৃ সেবায় তিনি এ অঞ্চলের ঘরে ঘরে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার কাজটি পুরোপুরি সেরেই ফেলেছেন ততোদিনে।
একজন এল.এম.এফ ডাক্তারের পক্ষে স্থানীয় চিকিৎসকদের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাটা খুব সহজ সাধ্য ব্যাপার ছিল না তখন। কিন্তু যোগ্যতা ও স্বীয় ঐকান্তিকতার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠে ছিলেন এ অঞ্চলের গণ মানুষের ডাক্তার। পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে যেমন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে তাঁর তেমনি রয়েছে দাতব্য কর্মকান্ডেরও বিশাল ভান্ডার। চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের দোড় গোড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন এই মহৎ প্রাণ মানুষটি। স্ত্রী শ্রীমতি চারু প্রভা সরকার এবং তাঁর নিজস্ব সঞ্চয়ের ভান্ডার থেকে অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছেন সাধারণ মানুষের জন্য এই ক্ষণজন্মা বিপ্লবী। বর্তমানে গাইবান্ধা গভ:বয়েজ হইস্কুল, গাইবান্ধা গভ:গার্লস হাইস্কুল, গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাইস্কুল, গাইবান্ধা মধ্যপাড়া প্রাইমারী স্কুল, তুলশীঘাট হাইস্কুল ও তুলশীঘাট রেবেকা হাবীব বালিকা বিদ্যালয়ের গরীব ও মেধাবি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন তাঁর উত্তরসূরীগণ এবং এই কাজে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন মধ্যপাড়াস্থ প্রবীণ নাগরিক শ্রী দীপক চন্দ্র রায়।
কলিকাতায় মুক্তি সংঘের একটি শাখায় শ্রীশ চন্দ্র সরকার কাজ শুরু করেন। তিনি এবং তাঁর বিপ্লবী সংগঠন মুক্তি সংঘের সহযোগিতায় কিছু বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিচালনার পর ১৯২৬ সালে মুক্তি সংঘের সদস্যরা বেনু নামে একটি মাসিক পত্রিকা বেড় করা শুরু করেন। ১৯২৮ সালে তিনি ও তাঁর দল কলিকাতায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সে সময় দলটির কার্যাবলী মুক্তি সংঘের সদস্যদের মাধ্যমে বাংলার বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩৮ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের সমর্থনে তিনি সরব হন।
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে ১৯৪৭ এ স্বাধীনতার সূর্যোদয় হলো বটে। মাতৃভূমির পবিত্র ধুলি কণা অঙ্গে মেখে হরিৎপত্রের রূপ ধারণ না করলে তপ্ত হৃদয়ে শীতল বারি বর্ষিবে কি উদার আকাশ ? স্বদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি আনন্দলোকের আশীর্বাদ জেনে বিপুল উদ্দীপনায় এই জনপদের সেবায় ব্রতী হলেন ডাঃ শ্রীশ চন্দ্র সরকার।
কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পুনরায় মুসলিম লীগের রোষানলে পড়েন এবং পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। ১৯৭১ সালে গাইবান্ধা শহরস্থ পূর্ব পাড়া নিবাসী বানা শেখ নামীয় জনৈক রিক্সাওয়ালা তাঁর রিক্সায় চাপিয়ে শ্রীশ চন্দ্রকে অতিসন্তর্পনে হিলি সীমান্তে পৌঁছে দিয়ে ভারতে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। প্রয়াতঃ বানা শেখ এর ৯০ বৎসর বয়স্কা স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন “বাবুকে বর্ডারে দিয়ে আসার পর স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক আর্মিরা তাঁদের বাড়িতে হামলা করে এবং তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন বাড়ি ফিরতে পারেন নাই রাজাকারদের অত্যাচারের ভয়ে। আমেনা বেগমের ১ম সন্তান প্রসব কালে শ্রীশ চন্দ্র সরকার সারা রাত জেগে তার শুশ্রুষা করে তাকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন। নচেৎ সে রাতে তার মৃত্যু ঘটতে পারতো- তাই আমি আমার স্বামীকে দিয়ে আমাদের রিক্সায় বাবুকে সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছিলাম।” মানুষের সাথে এমনটাই ছিল এই বিপ্লবীর প্রাণের যোগ। উল্লেখ্য ডাঃ শ্রীশ চন্দ্র সরকার এর কানাডা প্রবাসী পুত্র শ্রী মণিষ চন্দ্র সরকার কর্তৃক এই পরিবারটি ২০০০/- টাকা মাসিক ভাতা হিসাবে নিয়মিতভাবে আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন।

এই মহান বঙ্গসন্তান ১৯৭৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী তারিখে আপামর আর্ত-পীড়িত-দুঃখী মানবতাকে শোক-সাগরে ভাসিয়ে চিরতরে পরপারে চলে যান। তাঁর নশ্বর দেহ বিলীন হলেও তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন বহুকাল। তাঁর জীবন ও কর্ম চিরকাল মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পুনশ্চঃ সদাহাস্যজ্জ্বল ও বিনয়ী এই মহান বিপ্লবীর বিষয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজটি বর্তমানে খুবই দুরুহ হয়ে ওঠায় বেশ বিক্ষিপ্ত ও সংক্ষিপ্ত আকারেই তাঁকে তুলে ধরার প্রায়াস পেয়েছি। বিশেষ করে ডাঃ শ্রীশ চন্দ্র সরকার এর কানাডা প্রবাসী পুত্র শ্রী মণিষ চন্দ্র সরকার, পশ্চিম বঙ্গের কলিকাতা নিবাসী কন্যা শ্রীমতি রিতা দে (বর্তমানে চিকিৎসাজনিত কারণে নিউইয়ার্ক-এ অবস্থানরত), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এর বিশিষ্ট কণ্ঠযোদ্ধা শ্রী রথিন্দ্র নাথ রায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক সংবাদ বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি সঞ্জীবন কুমার দিনের পর দিন সময় দিয়ে, সাক্ষাৎকার দিয়ে, তথ্য দিয়ে, উপাত্ত দিয়ে আমাকে অনেক ঋনী করেছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই এই লেখা থেকেই আমার কৃতজ্ঞতাটুকু গ্রহন করে কৃতার্থ করবেন।


