স ।। ম্পা ।। দ ।। কী ।। য়
আমেরিকার ৫৯তম রাষ্ট্রপতি কে হতে চলেছেন, তার উত্তর জানতে অপেক্ষা মাঝে আর মাত্র একদিন । ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে তুমুল জল্পনা শুধু আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বেই। করোনা আবহের মধ্য়েও বিশ্ববাসীর নজর এখন আমেরিকার দিকে । ফের ডোনাল্ড ট্রাম্প, নাকি পরিবর্তন হয়ে জো বাইডেন ? ক্ষমতার মসনদে আবারও রিপাবলিকান, নাকি এবার ডেমোক্র্যাট ?
নির্বাচনের দৌড়ে কে এগিয়ে কে পিছিয়ে, সেই পরিসংখ্যান নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ । বেশী ভাগ সমীক্ষা বলছে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ৫২ শতাংশের মতো পপুলার ভোট বা সরাসরি জনগণের ভোটে এগিয়ে রিপাবলিকান ট্রাম্পের চেয়ে। নির্বাচনে ট্রাম্প বা বাইডেন যেই জিতুন না কেন, তাতে আমেরিকার ও বিশ্বের কি লাভ আর কি ক্ষতি হবে ? সেটাই বড় প্রশ্ন। আমেরিকার ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্য কতটা দূর হবে? বিশ্ব রাজনীতিরই বা কি হবে ?
ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত রিপাবলিক বা ডেমক্রেট যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাতে গোটা বিশ্বেই তার বিরুপ প্রভাব পড়বে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবহকাল থেকে চলে আসা ধর্ম-বর্ণের বৈষম্যে আরও জাগিয়ে উঠবে । পশ্চিমের উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে দিয়ে সারাবিশ্বে একটি যুদ্ধংদেহি আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।
দক্ষিণ পন্থী দুই রাজনৈতিক দল রিপাবলিক ও ডেমোক্র্যাট-এর সংস্কৃতিই হলো সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণা, ধর্মীয় বিভেদ, ও বড়সড় পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় জিগির তোলা । সাম্রাজ্যবাদী কায়দায় বিশ্বকে চালানো এদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রিপাবলিক বা ডেমোক্র্যাট যে দলই ক্ষমতায় আসুক, যুক্তরাষ্ট্রে যদি ফ্যাসিবাদ বা বর্ণবাদের দিকে ধাবিত হয়, এবং উগ্র ডানপন্থীর দিকে চলে যায়, তাহলে সেটা গোটা বিশ্বের জন্যই বিপদজনক অবস্থা সৃষ্টি করবে।
রিপাবলিক ও ডেমোক্র্যাট দুই-ই পূৃঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মোড়লীপনা করে । তাই কে জিতলো তাতে কিছু যায় আসে ? বিদেশ নীতি বা বহুজাতিক পূঁজিবাদের সুরস্কায় উভয়ের মথ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। আগ্রাসী মনোভাবের ক্ষেত্রে দুই দলের ফারাক এতই কম যে, সচেতন ভোটারদের ভোট দিতে গেলে কাকে ভোট দিবেন, তা নিয়ে দুইবার ভাবতে হবে। সোজা কথায় ট্রাম্পের পরিবর্তে বাইডেন ক্ষমতায় আসলে আমেরিকার আম জনতাসহ বিশ্বের মানুষ “গরম তেলের কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলোয় পড়বে” । তাই ট্রাম্প-বাইডেনের মধ্যে যেই প্রেসিডেন্ট হোক তা হবে ”যাহা বায়ান্ন তাহাই তেপান্ন” । কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বে মোড়লীপনা ধরে রাখতে হলে দুজনকেই ফ্যাশিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী কায়দায় দেশ চালাতে হবে।
জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার অলিতে-গলিতে বর্ণবৈষম্য। সমাজ ব্যবস্থার গভীরভাবে লেপ্টে আছে বর্ণবাদ। সাদা-কালো বিদ্বেষ। গত ২৫ মে আমেরিকার মিনিয়াপোলিস শহরে এক পুলিশ কর্মকর্তা জর্জ ফ্লোয়েড নামের ৪৬ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গকে যেরকম পাশবিক কায়দায় হত্যা করেছে, তা মার্কিন সমাজের বর্ণবাদ যে জেকে বসেছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ বহন করে।
নাইন/ইলেভেনের ঘটনার পর পশ্চিমা বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের বিরুদ্ধে যে ভাবে বিদ্বেষ ও ঘৃণার জন্ম নিয়েছিল. তার কিছুটা ভাটা পড়লেও রেশ কিন্ত এখনও আছে।
তাই এই নির্বাচনে ধর্ম-বর্ণ বৈষম্য প্রভাব কিছুটা তো পড়বেই । সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস মহামারি কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও অবিচারের যে নগ্নরূপটি তুলে ধরেছে বিশ্বের কাছে, তাতে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস’ ভোটকে প্রভাবিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার ইস্যুকে কি ভাবে দেখছে এবং ইমিগ্রেশন ও পররাষ্ট্র নীতি ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে ফারাক না থাকলেও,সে বিষয়গুলোও এবার ভোটাররা তাদের বিবেচনায় রেখেছে।
ইমিগ্র্যান্টদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত আমেরিকার কপালে আজ ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী রাষ্ট্রের কালো পালক লেগে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক তরফা ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী অবস্থান শংকিত করছে প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে। ট্রাম্প জমানায় তারা এক ধরনের আতংকের মধ্যেই বাস করছেন। হোয়াইট সুপ্রিমেসি ও বর্ণ বৈষম্য আমেরিকার মূল চেতনা ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে আঘাত করছে।
সব মিলে এবারের নির্বাচনের ডামাডোলে সব খানে বহু বর্ণ, বহু ধর্মের ধোঁয়াকে উসকে দেওয়া হচ্ছে । এর পরিনতি আমেরিকা ও বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলবে। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের কাজই হলো বিশ্বব্যপী অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষন-লুণ্ঠনের এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা । তাই রিপাবলিক বা ডেমোক্র্যাট হোয়াইট হাউজে যেই আস্তানা গাড়ুক না কেন, তারা সেই কাজটি অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করবে।
বাইডেন জিতলে আমেরিকা প্যারিস পরিবেশ চুক্তিতে ফিরে আসবে। পরমানু ক্ষেপনাস্ত্র চুক্তি কিছুটা সমঝোতা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের দামামা হয়ত কিছুটা কমে যাবে। কিন্ত তার মানে এই নয় যে,শ্রেণী বৈষম্যের অবসান হয়ে, সারা বিশ্বের শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। তবুও বাইডেনকে ভোট দিবেন ”মন্দের ভালো“ হিসেবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প জিতলে বিশ্বে দক্ষিণ পন্থিদের শক্তি আরও প্রবল হবে। নয়া ফ্যাসিবাদ আর্ন্তজাতিক প্রতীক হিসেবে তিনি নতুুন করে আত্ম প্রকাশ করবে । করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ব্যর্থতার জন্য দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে এবং চরম নৈরাজ্য নেমে এসেছে । এই কারণে ট্র্রাম্পের পরাজয় দুনিয়া জুড়ে প্রগতীশীল আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য খুব গুরত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে ।
ট্রাম্প হেরে গেরে ভোটের ফলাফল যে মেনে নেমেন সেটি অনেকেই বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না। সে ক্ষেত্রে আমেরিকার মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে রাস্তায়। আর সেই প্রতিবাদ- প্রতিরোধে হয়তো গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ারও সম্ভবনা আছে।


