৬ ডিসেম্বর মরমী সাধক “হাসন রাজা”র জন্মদিন

হাসন রাজা

(১৮৫৪ – ১৯২২) আপনাকে খোঁজা , আপনাকে বোঝা , আপনাকে জানা , আপনাকে চেনা যে পরমকে চেনার মূল সূত্র এ কথা আমরা সচরাচর জানি না বা বুঝি না আবার জানলেও মানিনা বা মানতে পারিনা । আমরা যে পরমকে খুঁজি সে যে আমার মধ্যেই বিদ্যমান / বিরাজমান , সহজে এই সত্য আমাদের উপলব্দিতে আসে না । জমিদার হয়েও একজন ব্যাক্তি এই পরম সত্য কে উপলব্দি করে ছিলেন সহজ সুন্দর ভাবে ।

আপন সাধন আমার হইল না

আমার পাগলা মনে কি বুঝিল , আপন সাধন কইল না ।

আমার মাঝে কুন জন , তাঁরে খুঁজলো না ।

ঠাকুর চান্দ যে ঘরের মাঝে (তাঁরে) চাইয়া দেখলায় না ।।

ঘরে থাকতে ধর তাঁরে , গেলে পাইবায় না ।

গেলে পরে সে যে আর , ফিরিয়ে আসবে না ।।

কি বুঝিয়া বসিয়া রইলে কেন ধর না ।

ঘর থাকিয়া বাহির হইলে খুজিয়া পাইবায় না ।।

বুড়া হইলায় হাছন রাজা , তেও কি বুঝলায় না ।

ঘরে থাকতে ঠাকুর ধর (তাঁরে) ছারিয়া দিও না ।।

বাঙলার লোকসংস্কৃতির কিংবদন্তীর রাজা ‘হাসন রাজা’ । তার প্রকৃত নাম দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী । তাঁর রচিত গানে হাসন রাজা নামে ভণিতা করায় তিনি এই নামে খ্যাত হন । হাসন রাজা ১৮৫৪ খ্রি. ২৪ জানুয়ারি (৭ পৌষ ১২৬১) সিলেটের সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরে লক্ষ্মণশ্রীর তেঘরিয়া মৌজায় (লক্ষ্মণছিরি গ্রামে) জন্ম গ্রহণ করেন । হাসন রাজার পিতার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী । হাসন রাজার পূর্ব পুরুষেরা অযোধ্যার অধিবাসী । তাঁরা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী । পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং সুনামগঞ্জে আগমন ও স্থায়ীভাবে বসবাস শুরুকরেন । পারিবারিক সূত্রে হাসন রাজা ছিলেন জমিদার পুত্র । কৈশোরেই তাঁর পিতার মৃত্যু ঘটে , ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা – দীক্ষায় হাসন রাজা মোটেই অগ্রসর হতে পারেন নি । বংশের রেয়াজ অনুসারে প্রথমে সৈয়দপুর নিবাসী এক মৌলভি সাহেবের নিকট আরবি ভাষায় লিখিত কোরআন – উল – করিম এবং কায়দায় বোগদাদি পাঠ করার শিক্ষা পেয়েছিলেন । এ ছারাও হাসন রাজা একজন হিন্দু পণ্ডিতের নিকট বাঙলা ভাষা শিক্ষা করেছিলেন । একাডেমীক শিক্ষা তেমন না পেলেও স্বাভাবিক প্রতিভার বদৌলতে তিনি হিন্দি ও উর্দু ভাষা কিছু আয়ত্ত করেছিলেন।

পৈত্রিক জমিদারি সূত্রে হাসন রাজার অর্থকড়ির কোন অভাব ছিল না । কিন্তু তিনি ছিলেন একই সঙ্গে বিলাসি এবং বিবাগী । গভীর কল্পনাশক্তির এবং তীক্ষ্ণ চিন্তাশীলতা হাসন রাজার মধ্যে ছিল অত্যন্ত প্রখর । হাসন রাজা ছিলেন স্বভাব দার্শনিক । সেই দার্শনিকতা প্রকাশের মাধ্যম ছিল তাঁর গান । হাসন রাজা অনেক উৎকৃষ্ট ভাবগান রচনা করেন । পনের বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর পৈত্রিক সম্পত্তি মহাজন – কতৃক নিলামে তুলতে আরম্ভ করলে মাতাকে সম্মত করিয়া নিজস্ব সম্পত্তি বিক্রয় করে বনেদি পৈত্রিক সম্পত্তি ‘রামপাশা’ অঞ্চল রক্ষা করে । জীবনের শুরুতে প্রতিদ্বন্দ্বী জমিদারদের কারসাজিতে বিভিন্ন মামলা মকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন । শীতের মৌসুমে গাজীর গিতের মেলা বসাতেন এবং সমুদয় খরচ বহন করতেন । হাসন রাজা তাঁর সম্পত্তি সুচারুরূপে পরিচালনার জন্যে মিঃ নিটল নামক এক ইংরেজ ম্যানেজার নিযুক্ত করেন । হাসন রাজা সুনামগঞ্জে হাসন এম. ই. স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা । এ স্কুলের মেধাবি ছাত্রদের খাওয়া জ্ঞানেরদাওয়া ও বৃত্তির ব্যবস্থা করেন তাঁর নিজ খরচে । পরে এই স্কুল জুবলি হাই ইংলিশ স্কুলে পরিণত হয় । কৈশোর ও যৌবনে শ্রীকৃষ্ণের নানাবিধ লীলায় অভিনয় করেন । যৌবনে ছিলেন আর দশজন জমিদারের মতো ভোগী ; পরিণত বয়সে ভোগের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা আসে । ষাট বছর বয়সে সমস্ত বিষয় সম্পত্তি বিলি বণ্টন করে দরবেশি জীবনযাপন শুরু করেন । সেই সময় অনেক দেবালয় ও আখড়া হাসন রাজার নিজ উদ্যেগে স্থাপন করেন । হাসন রাজা এক জন উচ্চ শ্রেণীর হেকিম ও চিকিৎসক ছিলেন । কেয়াফফা শাস্রে ও বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তিনি । প্রায় ছয়শতটি গান হাসন রাজা রচনা করে ছিলেন । ২০৬ টি গান নিয়ে তাঁর প্রধান গানের বই “হাসন উদাস” প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর অপর দুটি ম্রদ্রিত গ্রন্থ “শৌখিন বাহার” ও “হাছন বাহার”। তাঁর বিভিন্ন গানে তিনি নিজেকে পাগল হাসন রাজা, উদাস, দেওয়ান বা বাউল বলে অভিহিত করেছেন। বংশানুক্রমিক ভাবে তাঁরা মোগল সরকার কর্তৃক চৌধুরী (রাজস্ব আদায়কারী) উপাদি প্রাপ্ত হন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) কার্যকরী হওয়ার পর তাঁরা ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক দেওয়ান উপাধি গ্রহন করেন। সেই থেকে বংশের সবার নামের প্রথমে দেওয়ান এবং পরে চৌধুরী যুক্ত হিন্দু মুসলমান দুটি ঐতিহ্যের ধারা হাসন মনসে মিলিতো হয়েছে। রাধা কৃষ্ণের প্রেমতত্ব বা উপনিষদের ব্রক্ষ্মতত্বের ভাবগুলি তাঁর জীবন দর্শনে ছায়াপাত করেছে। চতুর্দিকের হিন্দু সমাজ আর নিজ মুসলমানি গণ্ডি এ দুয়ের মধ্যে তিনি কোন বিরোধ দেখেন নি। হিন্দু ঐতিয্যের ধ্যান ধারণা তার মনস ভুবনে ক্রীয়াশীল ছিল। ইসলামের মানবতা ও উদারতা তাকে যোগিয়েছিল আত্মপ্রকাশের শক্তি।

হাসন রাজা মুসলিম ছিলেন কিন্তু তার গানে পূর্ব পুরুষের ধর্ম হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রেমও লক্ষণীয় যেমন। ‘আমি যাইমু ও যাইমু আল্লাহর সঙ্গে/ হাসন রাজা আল্লাহ বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।’ কালের বহমানতায় মাত্র ৬৭ বছর বয়সে ১৯২২ইং সালের ৬ ডিসেম্বর মোতাবেক ২২ অগ্রহায়ন ১৩২৯ বাংলা সাধক মরমী কবি দেওয়ান অহিদুর রাজা উরফে হাসন রাজা মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে ইহধ্যাম ত্যাগ করেন।।

হাসন রাজার গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে প্রভাত কুমার শর্মার মাধ্যমে ১৯২৫ সালে শান্তি নিকেতনের আশ্রমে তাঁর ৮টি গানের নকল নিয়ে প্রভাত কুমার শার্মা রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করেন । রবীন্দ্রনাথ ১৯ ডিসেম্বর (৪ঠা পৌষ, ১৩৩২) ইন্ডিয়ান ফিলোসফিকাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি অভিবাসনে তিনি প্রসঙ্গক্রমে হাসন রাজার দুটি অংশ বিশেষ উদৃত করে হাসন রাজার দর্শন চিন্তার পরিচয় দেন। গান দুটির অংশ বিশেষ নিচে দেয়া হল-

মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন

শরীর করিল পয়দা শক্ত আর নরম

আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম

নাকে পয়দা করিয়াছে খুশবয় বদবয়।

রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে।

আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।।

তথ্য নির্দেশ –

আবদুল ওয়াহাব , লালন – হাসন জীবন – কর্ম – সমাজ, বাংলা একাডেমী ।

বাউলবাড়ি.কম

 

Exit mobile version