বিশ্বজিৎ দেব, জামালপুর
জামালপুরের মেলান্দহে সোহেল নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক গত ১৩ বৎসর যাবৎ শিকলবন্দি জীবন যাপন করছেন। জানা গেছে, অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে তাকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। শিকলবন্দি সোহেল কখনও হাসে, কখনও কাঁদে আবার কখনও উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে। তার চিকিৎসার সহায়তার জন্য আকুতি জানিয়েছেন বৃদ্ধা মা বিধবা জাহানারা বেগম।
এলাকাবাসী জানায়, মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের বেলতৈল খাঁয়েরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিকের এক মেয়ে আর দুই ছেলে। বড় মেয়ে শিল্পীকে বিয়ে দেন প্রায় ১৫ বছর আগে। তার মেজো ছেলে রুবেল, ছোট ছেলে সোহেল। ছোটবেলায় সোহেল স্বাভাবিক কথা বলতো। খাওয়া, চলাফেরাও স্বাভাবিক ছিল। রুবেলকে আট আর সোহেলকে সাত বছর বয়সে আবু বক্কর স্কুলে পাঠান। কিছুদিন যেতে না যেতেই রুবেল বাবা-মার কাছে অভিযোগ করে, সোহেল স্কুলে ঠিকমতো থাকে না, অন্য শিক্ষার্থীদের মারধর করে। একপর্যায়ে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন সোহেলের বাবা-মা বুঝতে পারেন তাদের ছেলের কিছুটা মানসিক সমস্যা হয়েছে। তারা সোহেলকে গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। এতে সে সুস্থ না হয়ে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যায়। তার অস্বাভাবিক আচরণ দিন দিন বেড়ে যায়। তখন তাকে বাবা-মা উন্নত চিকিৎসার জন্য জামালপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে অনেক দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসার পরেও সোহেল সুস্থ হচ্ছে না। এখানেও চিকিৎসায় বাবা-মার অনেক টাকা খরচ হয়। এরপর তেরো বছর সে শেকলবন্দি আছে।
সোহেলের মা জাহানারা বেগম জানান, সাত বছর বয়সে সোহেল টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে চিকিৎসায় পর সু্স্থ হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সে হঠাৎ স্কুলে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে সে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। জামালপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে মানসিক চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসার পর সুস্থ না হলে তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু ময়মনসিংহ সেখানে তিন মাস চিকিৎসা দেওয়ার পর অর্থ সঙ্কটের কারণে ছেলের চিকিৎসা দিতে পারেননি। শিকল পরা পাগল ছেলের চিন্তায় আর ঋণের চাপে সোহেলের বাবা ইতোমধ্যে মারা যান।
সোহেলের ভাবি মর্জিনা বেগম বলেন, ‘সোহেলকে নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকি। কখন কী করে! ১৩ বছর ধরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় তার পায়খানা, প্রস্রাব করার সমস্যা হয়। কাপড় নষ্ট করে। আমরা খুব সমস্যায় আছি।’
জাহানারা বেগম বলেন, ‘ছেলেটাকে নিয়ে খুবই দুচিন্তায় আছি। আমার তো চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। ওর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করাই খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মরার আগে যদি ছেলেটাকে সুস্থ দেখে যেতে পারতাম, তাহলে শান্তি পেতাম।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলের চিকিৎসার সহায়তার জোর আকুতি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শাহজাহান আলী বলেন, ‘ছেলেটার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা তাকে নিয়ে খুবই বিপাকে পড়েছেন। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই মায়ের।’ সোহেলকে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে বলে জানান তিনি। বাংলা ট্রিবিউন
