সন্ধান২৪.কম ডেস্ক : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে। এই নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে চলেছে। জানা গিয়েছে, ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে এ চুক্তি সাক্ষরিত হবে। তবে, চুক্তির শর্তাবলী ঘিরে গোপনীয়তার কারণে বিষয়টি প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে।
গত সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি চবূড়ান্ত হওয়ার কতা ঘোষমা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন আমদানি শুল্ক ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এই চুক্তির ফলে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার বাজারে সমস্যার সম্মুখীন হত বাংলাদেশ। ভারতের কাছে বাজার অংশীদারিত্ব হারাবার আশঙ্কায় ভুগছে ঢাকা। বড় শঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্র শিল্পে। কারণ, সে দেশের অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক (আরএমজি) রপ্তানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসেবর মধ্যেই তড়িঘড়ি বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করার জন্য গোপনে তোড়জোড় শুরু করেছে।
বাংলাদেশের শুল্ক
২০২৫ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন ঢাকার উপর ৩৭ শতাংশ উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল। জুলাই মাসে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। অবশেষে আগস্টে তা ২০ শতাংশে স্থির হয়। আসন্ন বাণিজ্য চুক্তিটি শুল্ক আরও কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
‘গোপন’ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি
এছাড়াও, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক অ-প্রকাশিত চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষর করে। এতে সমস্ত শুল্ক ও বাণিজ্য আলোচনা গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চুক্তির কোনও খসড়া সমসদ সদস্য, প্রধান শিল্প সংশ্লিষ্ট ও জনসাধারণের কাছে খোলসা করা হয়নি।
গত বছরের আগস্টে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ‘প্রথম আলো’কে বলেছিলেন, “চুক্তিতে এমন কিছু থাকবে না যা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি সাপেক্ষে এটা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।”
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তাবলী
জানা গিয়েছে, চুক্তিতে বেশ কয়েকটি ‘শর্ত’ রয়েছে। প্রথমত, চীন থেকে আমদানি কমানো এবং চীনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক আমদানি বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, মার্কিন পণ্য বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ করতে পারবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিকে কোনও প্রশ্ন না তুলেই মার্কিন মান ও সার্টিফিকেশন গ্রহণ করতে হবে। আমিরিকার যানবাহন ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে কোনও পরিদর্শন করা যাবে না, কারণ ওয়াশিংটন বাংলাদেশের বাজারে তাদের যানবাহনের জন্য সহজ প্রবেশাধিকার চায়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)’ বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ‘প্রথম আলো’কে জানিয়েছেন যে, বাণিজ্য চুক্তিটি স্বচ্ছ নয়, কারণ এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলো যাচাই করার কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “নির্বাচনের পর যদি শুল্ক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হত, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো সেটি নিয়ে আলোচনা করতে পারত। এটাও ভেবে দেখার বিষয় যে, নতুন নির্বাচিত সরকারের হাত বেঁধে দেওয়া হচ্ছে কি না।”
যেহেতু একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চুক্তিটি স্বাক্ষর করছে, এর অর্থ হল চুক্তিটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন নির্বাচিত সরকার গঠনকারী দলটির ওপরই বর্তাবে।
অন্ধকারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প
বাংলাদেশ, প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্র বিক্রি করে (প্রায় ৭ থেকে ৮.৪ বিলিয়ন ডলার)। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯৬ শতাংশ। এর বিপরীতে, বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য কেনে। বাণিজ্য নিয়মের যেকোনও পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল ব্যাপার, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটি ক্রেতা।
যেহেতু ভারত ও বাংলাদেশ, পোশাকের মতো একই ধরনের পণ্য বিক্রি করে, তাই ভারতের জন্য কম করের অর্থ হল আমেরিকানদের জন্য ভারতীয় পোশাক কেনা সস্তা হয়ে যাওয়া। যদি বাংলাদেশের ‘গোপন’ চুক্তিটি ভারতের ১৮ শতাংশ হারের সমান বা তার চেয়ে ভাল না হয়, তবে আমেরিকান ক্রেতারা তাদের অর্ডার ভারতে সরিয়ে নিতে পারে, যা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ চাকরিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কারণ এই শিল্পের সঙ্গে ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষ জড়িত, যাদের বেশিরভাগই মহিলা। এটা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি এনে দেয়। য়া দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় ২০ শতাংশ।
ব্যবসায়ী নেতারা চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ কোন কোন ক্ষেত্র নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে সে সম্পর্কে তারা অন্ধকারে রয়েছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান ‘প্রথম আলো’কে বলেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে, আশা করা যায় যে পারস্পরিক শুল্কের হার ১৫ শতাংশে নেমে আসবে (বর্তমানে ২০ শতাংশ)। আমি শুনেছিলাম যে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিষয়টি মসৃণ করেছেন। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি এখনও বিশ্বাস করি যে, এই সাক্ষর নির্বাচনের পরে করা উচিত ছিল, কারণ এর বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে।”
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ আনু মহম্মদ জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ স্বচ্ছতা ছাড়াই এই চুক্তিতে প্রবেশ করছে এবং চুক্তিটিকে “অযৌক্তিক” বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, “জনাব ইউনূস আসলে উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীর ছদ্মবেশে এই সরকারে কিছু বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশি রাষ্ট্রীয় লবিস্ট নিয়োগ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত এই বিদেশি লবিস্টরা সরকারের ভেতর থেকে এই চুক্তিগুলো করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।”
অর্থনীতিবিদ আনু মহম্মদ প্রশ্ন তোলেন, “তাঁদের কি কারো কাছে কোনও প্রতিশ্রুতি বা বাধ্যবাধকতা আছে যে তাদের এই চুক্তিটি করতেই হবে? তা না হলে, তাঁরা কেন দেশকে এমন একটি ভয়াবহ, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে?” এটা লক্ষণীয় যে, মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে তাদের উন্মুক্ত মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দলটিকেও একাধিকবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞাটি শেখ হাসিনার শাসনকালে আরোপ করা হয়েছিল। রাজিত দাস : আজকাল ওয়েবডেস্ক
