সন্ধান২৪.কম ডেস্ক : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের পদে মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রথমে মানতে চাননি সে দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এমনটাই দাবি করলেন ইউনূস সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তাঁর কথায়, দু’টি কারণ দেখিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন ওয়াকার। কিন্তু আন্দোলনকারী ছাত্রেরা অনড় থাকায় শেষপর্যন্ত তাঁকে রাজি হতে হয় বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার এবং জাতীয় সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ।
বাংলাদেশের প্রাক্তন আইন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৬ অগস্ট সকালে ঢাকায় সেনার সদর দফতরে তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সেনা প্রধান ওয়াকার। জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন, সেই নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের এক বিতর্কিত অধ্যায়। প্রশাসন চালানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রথম আলো-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আসিফও স্বীকার করেছেন, ইউনূস সরকারের কিছু কাজ ঠিক হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘মব নিয়ন্ত্রণ, মামলায় ভুয়া আসামি রাখার সংস্কৃতি, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার–এ আক্রমণ—এগুলো আমরা অ্যাড্রেস করতে পারিনি। ৩২ নম্বর (ধানমন্ডি—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন) ভাঙা রোধেও আমাদের ব্যর্থতা ছিল। হামের টিকা নিয়ে আমাদের এরর অব জাজমেন্ট প্রচণ্ড পীড়াদায়ক, যদিও এই সঙ্কট মূলত আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি হয়েছিল।’’
২০২৪ সালের ৫ অগস্ট পড়ুয়াদের আন্দোলনের চাপে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের অনেকেই ছিলেন আসিফের ছাত্র। ওই ঘটনার পরে বাংলাদেশের সেনা এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, ৬ অগস্ট বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে বৈঠক, নোবেলজয়ী ইউনূসকে সেই সরকারের প্রধান পদে বসানো থেকে উপদেষ্টাদের তালিকা তৈরি— অনেক ঘটনারই সাক্ষী ছিলেন আসিফ। সেই তিনিই সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের পদে বসানো নিয়ে আপত্তি করেছিলেন সেনাপ্রধান।
আসিফ জানান, ৫ অগস্ট আন্দোলনকারী ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব দেন ছাত্রেরা। তিনি বলেন, ‘‘সরকার গঠনের প্রসঙ্গটা তারা তুলল। নাহিদ ইসলাম (অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন) বলল, …স্যার, আমাদের যে অন্তর্বর্তিকালীন সরকার হবে, এই সরকারের প্রধান কে হবেন? আমি সালেহউদ্দিন আহমেদ স্যার আর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যারের (যথাক্রমে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ—দু’জনেই পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) কথা বললাম। তখন নাহিদ বলল, স্যার, ইউনূস স্যার হলে কেমন হয়? ’’ আসিফ জানান, তিনি সে সময় বলেছিলেন, পড়ুয়াদের প্রস্তাবে ইউনূস রাজি হবেন না। ছাত্রনেতারা তাঁকে জানান, ইউনূসের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা হয়েছে তাঁদের। তিনি রাজি হয়েছেন।
আসিফ জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে কথা বলার জন্য ৬ অগস্ট সকালে ঢাকায় বাংলাদেশ সেনার সদর দফতরে তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সেনা প্রধান ওয়াকার। তিনি ওয়াকারকে বলেন, ‘‘ছাত্রদের সিদ্ধান্ত ইউনূস স্যার হবেন, আমি মনে করি এটাই সবচেয়ে ভাল পছন্দ।’’ আসিফ জানান, সেই প্রস্তাব শুনে দু’টি আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন ওয়াকার। তাঁর কথায়, ‘‘এক, ইউনূস ইতিমধ্যে বাংলাদেশের শ্রম আইনের মামলায় দোষী। দুই, ওঁর বিরুদ্ধে টাকা তছরুপের অভিযোগ রয়েছে।’’
সে সময় এক জন আইনের শিক্ষক হিসেবে যুক্তি দিয়ে আসিফ ওয়াকারকে বলেন, ‘‘আপনার প্রতি রাগ হলে আপনাকেও শাসকদল কোনও মামলায় দোষী সাব্যস্ত করাতে পারবে। বাংলাদেশে এটা করা সম্ভব। এগুলি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচার। ইউনূস দেশ এবং বিদেশে শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তি, ওঁর কোনও বিকল্প নেই।’’ এর পরে ওয়াকার তাঁর দুই ‘বন্ধু’— বাংলাদেশের তৎকালীন বায়ুসেনাপ্রধান এবং নৌসেনাপ্রধানকে ঘরে ডেকেছিলেন। তাঁরাও ইউনূসের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন। আসিফের কথায়, ‘‘আমার মনে হয়েছিল, ওয়াকার ভাই কনভিনসড হয়েছেন।’’
যদিও সে দিনই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের বৈঠকে ‘অন্য রকম’ ঘটেছিল বলে জানান আসিফ। সেখানে একটি ঘরে আন্দোলনকারী নেতাদের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন। ওয়াকার এসে জানান, পড়ুয়াদের সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলতে চান। আসিফের কথায়, ‘‘রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধান এলে হঠাৎ ওয়াকার ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আসিফ সাহেব, আপনার সঙ্গে তো কথা হয়েছে; আমরা একটু ছাত্রদের সঙ্গে বসি। ইট কেম অ্যাজ় আ সারপ্রাইজ। বোঝা যাচ্ছে, ওঁদের আলাদা বৈঠক করার পরিকল্পনা আছে।’’
তার আগে আসিফ আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলে ইউনূসের বিষয়ে আশ্বাস আদায় করেছিলেন বলে জানিয়েছেন আসিফ। তাঁর কথায়, ‘‘ছাত্রদের আমি আগেই সকালের মিটিংয়ের কথা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তোমরা কিন্তু ইউনূস স্যার ছাড়া কারও ব্যাপারে রাজি হবে না। তারা আমার চেয়েও বেশি স্ট্রং এই পজিশনে। তারা বলেছিল, স্যার, এটা নিয়ে আপনি কোনও চিন্তা করবেন না।’’
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ওয়াকারের বৈঠক প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা চলেছিল জানিয়ে আসিফ বলেন, ‘‘মিটিং শেষ হলে নাহিদ, আসিফরা এল। আমি বললাম, নাহিদ, তোমরা কি এটা (ইউনূসকে উপদেষ্টা পদে বসানো) করতে পেরেছ? বলল, জি স্যার, কোনও চিন্তা করবেন না, ইউনূস স্যারই হবেন। আমি ওদের জড়িয়ে ধরলাম। এত খুশি লাগছিল!’’ আসিফের দাবি, ‘‘পুরো মিটিংয়ের মূল পারপাসই ছিল ইউনূস স্যার বাদে অন্য কাউকে সরকারপ্রধান হিসেবে নেওয়ার।
হাসিনা সরকারের আমলে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ইউনূসকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত। নোবেলজয়ীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শ্রম আইন ভাঙার অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, যে কোনও সংস্থায় কর্মীদের কল্যাণমূলক তহবিল তৈরি করতে হয়। কিন্তু গ্রামীণ টেলিকমে ওই তহবিলের ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ। আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
