কিছু স্মৃতি ও চিকিৎসা অবহেলার কথা ঃ ভুল ! মাত্র কয়েকটি ভুলের জন্য তাপস কর্মকার হারিয়ে গেল। চলে গেল বহূদূর। আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। গাইবান্ধার সংস্কৃতির অঙ্গনকে যারা এক সময় শাসন করতো, তাপস ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। তার ব্যান্ডের রিদম, ড্রাম, কী-প্যাড আর গীটারের সুরের ঝংকারে গাইবান্ধার মাটি ঋদ্ধ হয়েছে, কালের দেয়ালে গড়ে উঠেছে শুদ্ধতম ফুল-পাখী আর বৃক্ষের কাহন ।
ভারতের বেঙ্গালুরুর বিখ্যাত দেবী শেঠীর হাসপাতাল নারায়ানা হৃদায়ালয়ের চিকিৎসা অবহেলায় কীভাবে প্রাণ বিপন্ন হয়ে পড়ে তা তাপসদার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে হাড়ে হাড়ে অনুভব করলাম । আরও অনুভব করলাম, একটি মৃত্যু কি ভাবে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি সাংস্কৃতিক অঙ্গন ধূ-ধূ শুণ্য হয়ে যায়।
১৯৮৬ সালের কথা। আমি তখন ক্লাশ টেনে। নিউ টেন বলতো সবাই। তাপস দার স্টীল (হাওয়াইয়ান) গীটার বাজানো দেখে শখ হলো গীটার শেখার। তখনো জানতাম না স্প্যানিশ গীটার আর স্টীল গীটারের পার্থক্য। তাপস দা বুঝিয়েছিলেন। সেই সাথে আমাকে স্প্যানিশ গীটার শিখতে উৎসাহ দিলেন। স্পানিশ গীটার অনেক স্মার্ট,বাজিয়ে গান করা যায়,গানের সাথে বাজানো যায় ইত্যাদি বললেন। ঢাকা থেকে তাপস দা যতীন এ্যান্ড কোম্পানির একটা গীটার প্রথম নিয়ে গেলেন আমার জন্য। তাপস দারও ছিলো স্প্যানিশ গীটার শেখার অদম্য ইচ্ছা। গীটারটা বেশ ক’দিন তিনি রাখলেন বাজানোর জন্য। একদিন আমাকে ডি-এ-জি এই ৩টা কর্ড ধরা শেখালেন। আমার শেখা। ঐ ৩ টা কর্ডই তিনি জানতেন। দেখে নিয়েছিলেন শুকুল্ল্যা ভাইয়ের কাছে। যাঁর কাছে আমার পরে গীটার শেখা।
তাপস দা ‘৮০র দশকের শুরু থেকে উত্তরাঞ্চল দাপিয়ে বেড়াতেন ড্রামস বাজিয়ে। সে সময় এ অঞ্চলে একমাত্র গাইবান্ধার আবাহনীর শিল্পীরা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতো গানে। তাপস দা ছিলেন আবাহনীর ড্রামার। স্টীল গীটারও বাজাতেন। এক সময় খালিদ হাসান মিলুর সাথেও বাজিয়েছেন অনেক।
নিরহংকারী এই মানুষ সবার সাথেই হেসেহেসে কথা বলতেন।আমার জানা মতে কারও ক্ষতির কথা চিন্তাই করতেন না। আজকাল ব্যবসায়িক ব্যস্ততা বাড়লেও সঙ্গীত থেকে বেশি দূরে সরে যাননি। যেখানেই সুযোগ হতো প্যাড ড্রামস বাজাতেন। আমি হলফ করে বলতে পারি আমার জীবনে একমাত্র সার্বক্ষণিক শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন তিনি। বরং আমার কোন অসংগতি মানতেই পারতেন না। প্রতিটা মুহূর্ত আমার ভালো চাইতেন। আমার বাড়ি থেকে তাঁর বাড়ি ২০০ মিটারের মধ্যে। আমাদের ছিলো পারিবারিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আমার সঙ্গীতে উৎসাহিত আর অনুপ্রাণিত করা তিনিই প্রথম ব্যক্তি।
অস্বাভাবিক প্রাণ শক্তির এই মানুষটার ইচ্ছা হলো মেডিকেল চেকআপ করানোর। সামান্য ব্যথা করতো বুকে।তাই গত বছরের পুজার সময় (অক্টোবর২০১৯) চলে গেলেন বেঙ্গালুরুতে। বেশ ক’দিন অপেক্ষা করে ডা.দেবী শেঠির সাথে দেখাও করলেন। টেস্ট রিপোর্ট (ভালবে নাকি সমস্যা ছিলো) দেখে ডাক্তার বললেন তোমার অপারেশন করাই ভালো। শেঠিকে বললেন,স্যার আপনি যদি অপারেশনে থাকেন,তবেই আমি করবো। শেঠি থাকবেন বলে কথা দিলেন। অপারেশনের দিন (তারিখ মনে নেই) ডা.শেঠি ছিলেন না। রবি শর্মা প্যাটেল নামের একজন সার্জন তাঁর অপারেশন করেন। প্রায় ১৩ ঘন্টার অপারেশনে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হয়েছে বলে পরে জেনেছিলাম। অপারেশনের সময় আরও কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিলো বলেই ২/৩ ঘন্টার অপারেশন ১৩ ঘন্টা লাগিয়েছিলো। এনেস্থিসিয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত (১৭ জুন ২০২০) তাঁর আর জ্ঞান ফেরেনি।
আমরা যা জেনেছি, অপারেশনের সময় তাঁর মস্তিষ্কে ৫-৬ সেকেন্ড অক্সিজেন পৌঁছায়নি। ফলে তিনি ধীরেধীরে গভীর কোমায় চলে গেছেন। অথচ ডা.রবি শর্মা প্যাটেল রোগীর স্ত্রী-কন্যাকে সরাসরি নির্মমভাবে বলেন,আমাদের কাজ আমরা করে দিয়েছি। এখন অন্য কোথাও নিয়ে রোগীকে সুস্থ্য করেন। পরে, তাপস দার মেয়ে দেবী শেঠিকে অবগত করেন বিষয়টি। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। এক রকম তাদের অবহেলা স্বীকার করে রোগীর সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে নেয়। তবে হাসপাতাল তাঁকে ফেরানোর অনেক চেষ্টা করেছে। সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়েছে। কিন্তু লাইফ সাপোর্টে থাকা সময়ে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও অনভিজ্ঞ নার্সের একটি ভুলের জন্য আবার তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। প্রায় সাড়ে সাত মাসের এই অবস্থার মধ্যে আমি আর তাপস দার ছোট ভাই আমার বন্ধু টিটু কর্মকার দু’বার দেখতে যাই। কখনো সামান্য ভালো কখনো স্থিতিশীল দেখেছি। তাপস দার ছোট মেয়ে শ্রেয়সী বাবার সুস্থ্যতার জন্য সব ছেড়ে রীতিমত হাসপাতালে ডিউটি করেছে। লাইফ সাপোর্টে থাকা একজন রোগীকে কীভাবে সেবাযত্ন করতে হয় শ্রেয়সী তা রপ্ত করে ফেলেছে,এই কয়েক মাসে।
যা হোক,আমি বলতে চাই ডা. দেবী শেঠির হাসপাতাল নারায়ানা হৃদায়ালয় এত নাম করা যে মানুষ এখানে ভরসা নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের অবহেলায় যে কত ক্ষতি হয়,তা তাদের বোধগম্য হয়না। তাপস কর্মকারের এই অবস্থার কথা পুরো হাসপাতাল জানে। বারবার স্যরি বলেছেন হাসপাতেলের কর্ণধাররা। লাভ কী ?
আমাদের তাপস কর্মকার নেই। আর কোনদিন তার পায়ের চিহ্ন গাইবান্ধার মাটিতে পড়বে না। তাপস আর কোনদিন তার প্রিয় বাগান বাড়িতে যাবে না। প্রিয় ফুলের গন্ধ নেবে না কোন দিন। অথবা মায়ের গলা ধরে সিগ্ধ হাসির হুল্লোড় তুলবে না কোন দিন।
