এক নাবিকের রোজনামচা।। পর্ব – তিন

                                      মূল (ইংরেজি): মনজুরুল মান্নান ।।  অনুবাদ : মাজহারউল মান্নান

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিকেল ছ’টার  পরে জাহাজ থেকে বের হলাম l বাইরে বেশ ঠান্ডা lগুড়ি গুড়ি বৃষ্টি l  আকাশে এলোমেলো মেঘ l গেট থেকে বের হওয়ার পর মনে হল ব্যাগে ছাতাটা নেওয়া হয়নি। ছোটবেলা থেকে আমাদের একটা ধারণা হলো  ব্যাগে ছাতা রাখাটা অনেকটা বয়স্কদের বিষয় l সাধারণত আমাদের দেশে তরুণ তরুণীরা ছাতা হাতে রাখতে কিছুটা সংকোচ বোধ করে l জাপানি বৃদ্ধ, তরুণ,তরুণী  সবার সাথে একটি ছাতা থাকবেই, সে রোদ-বৃষ্টি থাক আর না থাক l

সকালে ছিল ঝকঝকে রোদ l কে জানে হঠাৎ করেই সন্ধ্যায় আবহাওয়া এরকম হবে l এক ফোঁটা দু ফোটা বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালই লাগছে  l এখন ঝমঝম করে বৃষ্টি না পড়লেই হয়  l  আশ পাশে কোন শেল্টার পয়েন্ট দেখছিনা না যে ঝম ঝম বৃষ্টিতে  কোথাও দাঁড়ানো যাবে l

কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে গেল l বন্দর থেকে পার্ক পর্যন্ত পায়ে হাঁটার রাস্তাটা একেবারে কম না l  গতকাল গাড়িতে যাওয়াতে বুঝতে পারিনি  l

গেটের কাছে এসে দূরে তাকিয়ে দেখলাম ভদ্রমহিলা  ঠিক ওই  জায়গাটিতেই বসে আছে l কাছাকাছি এসে মাথা নিচু করে বললাম, যোগেন কি দেসুকা, তুমি কেমন আছো ?

মহিলা আমাকে ভেজা অবস্থায় দেখে বললেন, আবহাওয়া আজ বেশ খারাপ, তোমার আসতে কোনো কষ্ট হয়নিতো? মাথা পুরোপুরি   ভিজে গেছে তোমার  l আমার কাছে একটা পরিষ্কার তোয়ালে আছে,  তুমি সেটা ব্যবহার করতে পারো I

আকাশের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বললেন, এখানেও এক ফোঁটা দু ফোটা করে বৃষ্টি হচ্ছে l চলো গাড়ীতে গিয়ে বসি l

একসঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম l  দূরে থেকে তার সাদা রঙের টয়োটা করোলা গাড়িটা দেখতে পাচ্ছি l একটি মাত্র গাড়ি পার্কিঙে l এই বৃষ্টি বাদলের দিনে আর কারো পার্কে আসার সম্ভাবনা নেই l  পুরাতনসাদা রঙের সাদামাটা একটা গাড়ি l গাড়ির ভেতর এবং বাইর সুন্দর করে পরিষ্কার করা I

জাপানিদের গাড়ির প্রতি তেমন কোন আগ্রহ নেই l   যদিও তারাই  সারা দুনিয়াতে গাড়ির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে l  রাস্তায় কখনো কোন ভালো ব্র্যান্ডের গাড়ি চোখে পড়েনি l অবশ্য বন্দরের  দুএকটি রোড বাদে অন্য কোথাও যাওয়া হয়নিl

গাড়িতে বসে  হিটিং চালিয়ে দিলেন l

তোমার জন্য সামান্য কিছু উপহার , যদি তোমার গ্রহণ করতে কোন আপত্তি না থাকে, বলে তিনি

পিছন থেকে একটি বড় ব্যাগ বের করে একটি জ্যাকেট, একটা উলেন টুপি, একজোড়া  হাতমোজা আর একটি  ছাতা বের করলেন l

পুনরায় বললেন, সব কয়টি জিনিসই তোমার লাগবে, যে কয়দিন আছো এখানে l ও, আর একটা কথা, এর সাথে একটা সাইকেলও কিন্তু আছে। ওটাও তোমার বেশ কাজ দেবে।

গাড়ির ছাদে একটা নতুন সাইকেল বাঁধা l মহিলা নিশ্চয়ই কোন একটি সাইকেলের দোকানে গিয়ে অনেক অনুরোধ  করে বলেছেন, সাইকেলটা শক্ত করে বেঁধে দিতে যাতে পড়ে না  যায় l

বললাম, তোমরা এতগুলো উপহার নিয়ে আমি কিভাবে জাহাজে যাব’?

সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, মাথায় টুপি পরে, জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে, হাতমোজা পরে সাইকেলটা চালিয়ে দুরন্ত ছেলের মত সোজা জাহাজে চলে যাবে, তোমাকে কোনো কিছুই বহন করতে হবে না l

তবে তার আগে এখন আমার সাথে আমার বাসায় যাবে l রাতে ডিনার করে তারপর  যাবে l

বললাম, ঠিক আছে’ l

গাড়ি মূল রাস্তা থেকে নেমে ছোট রাস্তা দিয়ে বাড়ি ঘরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে l  ছোট ছোট একতলা  কাঠের বাড়ি  l অতি সাধারণ  কিন্তু  ছবির মত সুন্দর l প্রতিটি বাসার সামনে খুবই স্বল্প জায়গায়  চমৎকার  বাগানl। মনে হচ্ছে একটা পার্কের ভেতর  দিয়ে যাচ্ছি।  যার  দুই ধারে সাজানো বাড়ি আর  নানা রঙের ফুল  দিয়ে সাজানো রাস্তা l

তেমন কোনো মানুষ চোখে পড়লো না  l দু’একজন বিনীতভাবে মাথা নিচু করে মহিলাকে সম্মান জানালো l তিনিও মাথা নেড়ে সায় দিলেন  l কোন কথাবার্তা নেই l  গাড়িগুলো সারিবদ্ধ ভাবে রাস্তার দু’ধারে পার্ক করা l গাড়ি থেকে নেমে তার পিছনে পিছনে  ছোট কাঠের গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম l

চারদিকে অতি সাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ l গাছগুলোর প্রতি একটা বিশেষ যত্নের ছাপ l

ঘরের দরোজার সামনে একটা ছোট্ট কুকুর শুয়ে আছে l  আমাকে দেখে কোনো সাড়াশব্দ করলো না  l একটু আশ্চর্য হলাম l সাধারণত নতুন কোনো মানুষ দেখলে কুকুর একবার  হলেও  ঘেউ ঘেউ করে l আমাকে দাঁড়িয়ে রেখে ইয়ামাশিতা পাশে থেকে কিছু খাবার নিয়ে বাটিতে করে কুকুরের সামনে দিল l খাবারের প্রতি কুকুরের সেরকম আগ্রহ দেখা গেল না l উদাস মনে গেটের দিকে তাকিয়ে থাকলো l দরোজা খোলা l  তালা লাগানোর সিস্টেম বা  তালা লাগানোর কোন প্রয়োজন নেই।

ছোট একটা বসার ঘর l পাথরের ভারী  টেবিলের চারপাশে নিচু চারটা  টুল l ডান পাশে পুরনো  একটি সোফা l বাম পাশে কাঠের তাকে  কিছু জাপানি এবং ইংরেজি সাহিত্যের বই। গাদাগাদি করে  রাখা l দেয়ালে দু’টো পেইন্টিং আর একটা সাদাকালো  ফ্যামিলি ফটো l একটি  মেয়ের দুপাশে বাবা আর মা l বেশ আগে তোলা l ঘরের  এক কোনে একটা টিভি l বেশ পুরাতন l গত কয়েক বছরে এটার সুইচ কেউ অন করেছে বলে মনে হলো না l টিভির পাশে একটা একুস্টিক পিয়ানো l সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা l দুটো শোয়ার ঘর l বেশ গোছানো। তবে খুবই ছোট l কোনভাবে একজন মানুষ  শুতে পারবে l বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির এই দেশের মানুষের মাটিতে আভিজাত্যহীন এক অতি সহজ সাধারণ জীবন দেখে আমি কিছুটা বিস্মিতই হ’লাম l

বসার ঘরে থেকে কিচেনের টুং টাং আওয়াজ পাচ্ছি l

বললাম, তোমাকে কি একটু হেল্প করবো?

হ্যাঁ, এই খাবারগুলো টেবিলে নিয়ে যাও l

স্টিকি রাইস, সিদ্ধ করা দুটি সী ফিস আর কিছু ভেজিটেবল l সাথে সালাদ আর ফল l অতি সাধারণ খাবার l

আমি শুনেছি তোমরা অনেক স্পাইসি খাবার খাও, এখানে সেরকম কিছু নেই l তোমাকে একটু কষ্ট করে খেতে হবে।

বললাম, আমি যে কোনো  খাবারে অভ্যস্ত l কোন সমস্যা হবে না l

টেবিলে চপস্টিক ছাড়া  আর কিছু নেই l চপিস্টকে এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি  l

বললাম, আমার একটি কাঁটাচামচ লাগবে l

মহিলা চিন্তায় পড়ে গেল l  খুব সম্ভব বাসায় কোন কাঁটা চামচ নেই  l অনেক  খুঁজে ভেতর থেকে একটা চামচ নিয়ে এলো l কাঠের চামচ l

বললাম, এতেই চলবে l

জীবনে এই প্রথম কাঠের চামচ দিয়ে ডিনার করছি l দুজন সামনাসামনি বসে স্যুপ খাচ্ছি   l কথাবার্তা নেই l

নীরবতা ভেঙে আমিই কথা বললাম, দেয়ালে পেইন্টিংগুলো কার?

আমার মেয়ের l দেয়ালের দিকে তাকিয়ে চাপা শ্বাস ফেললো সে।

একটিই  মেয়ে l বেশ কয়েক বছর আগে পড়াশোনা করতে আমেরিকা চলে গেছে l

বললাম, তারপর?

সেখানেই বিয়ে-শাদী করে  সেটেল করেছে l মাঝে মধ্যে কথা হয় ফোনে l দু’বছর আগে একবার এসেছিল l

তোমার হাসবেন্ড ?

চার বছর আগে প্রস্টেট  ক্যান্সারে মারা গেছেন l

মনে মনে ভাবলাম, হায় ! এত উন্নত দেশেও  ক্যান্সার থেকে রক্ষা নেই !

চমৎকার মানুষ ছিলেন, জানালা দিয়ে বাগানের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকালো সে l

আমি সকালে যখন গাছগুলোতে পানি দিতাম, তখন তিনি পিয়ানো বাজাতেন l সকালের মিষ্টি রোদের সঙ্গে পিয়ানো শুনতে কী যে ভালো লাগতো l আর ওই যে কুকুরটি দেখছো, পিয়ানো বাজানোর সাথে সাথে কাছে চলে আসতো l ভালো  ছবি আঁকতেন l মেয়েকে কিছুটা শিখেয়েছিলেনও l

খাওয়া শেষে প্লেট বাটিগুলো কিচেনে নিয়ে পরিষ্কার করে পাশে রেখে দিলাম l একলা মানুষ এতগুলো প্লেট আর বাটি পরিষ্কার করতে নিশ্চয় কষ্ট হবে l

পিয়ানোর চেয়ারটা টেনে বসে কভারটা সরিয়ে দিলাম l অনেকদিন কেউ বাজায় না l

‘তুমি কি বাজাতে পারো?

যৎসামান্য। জাপানি সংগীতের ব্যাপারে আমার তেমন কোন ধারণা নেই l তুমি ভারতীয় নোবেল  লরিয়েট রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেছো ? তার একটা গানের কয়েক লাইন বাজানোর চেষ্টা করতে পারি।

জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে

 বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে

 

খেয়াল করলাম চোখ বন্ধ করে শুনছে সে l

আশ্চর্য হয়ে দেখি কুকুরটা কখন নীরবে পিয়ানোর পাশে এসে বসে গেছে l

ঘড়িদেখলাম। রাত প্রায় আটটা l বললাম, আমাকে এখন উঠতে হবে।

তুমি কি কাল আসবে? জিজ্ঞেস করলো সে।

বললাম, কাল থাক l বরং তুমি কাল সন্ধ্যায় আমার জাহাজে চলে আসো l জাহাজে আমরা একসঙ্গে ডিনার করবো l

মনে হলো বেশ খুশি হয়েছে সে।

আমি আবার বললাম, তুমি ঠিক পাঁচটার মধ্যে সিকিউরিটি গেটে চলে আসো l আমি তোমাকে গেট থেকে নিয়ে যাব’ l জাহাজে উঠতে কি তোমার কষ্ট হবে?

না , একটুও না I বেশ প্রত্যয়ের সাথে কথাটা বললো সে।

উঠে পড়লাম l বাইরে পরিষ্কার চাঁদনী রাত l মাথায় ভাঙা রেকর্ডের মতো পিয়ানোর সুর বাজছে ..

 জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে

 বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে

এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে

তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে …

( চলবে)

Exit mobile version