অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকট অবশেষে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে ভিনদেশে পালাতে বাধ্য করেছে। কেন ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন রাজনৈতিক পরিবারের এই ক্ষমতাচ্যুতি, কেনইবা বর্তমান এ রাজনৈতিক অস্থিরতা। বৃহস্পতিবার আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
কী ঘটেছিল : প্রেসিডেন্টের বাসভবেন ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছির মতো গুঞ্জন করতে করতে হামলে পড়েছেন বিক্ষোভকারীরা। বাধ্য হয়েই বুধবার দেশ থেকে পালিয়ে যান গোতাবায়া। প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং অবিলম্বে কারফিউ ঘোষণা করেছেন। সংবিধানের একটি ধারায় বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট যদি কোনো কারণে দেশ চালাতে অক্ষম হন- সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ দিতে পারবেন স্পিকার।
সংকট কতটা গুরুতর : শ্রীলংকার ঋণ-বোঝাই অর্থনীতি এখন ‘পতিত জমি’। এ কারণে খাদ্য, জ্বালানি আর ওষুধের অভাব সেখানে তীব্রতর। দ্বীপটি প্রতিবেশী ভারত, চীন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাহায্যের ওপর নির্ভর করছে। মে মাসে বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছিলেন, ‘অর্থনীতি পাথরের নিচে চাপা পড়ছে।’ শ্রীলংকানরা না খেয়ে থাকছেন, কারণ- দুষ্প্রাপ্য জ্বালানি আর রান্নার গ্যাস কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাদের। ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ ও তার সুদ পরিশোধ করতে অক্ষম সরকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মেশিন পর্যটন শিল্প বিকল হয়েছে কোভিড মহামারির ধাক্কায়। দেশের মুদ্রার ৮০ শতাংশ পতন হয়েছে-যা আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল এবং মুদ্রাস্ফীতিকে আরও নাজুক করে তোলে। ফলে একটি দেশ দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে-যেখানে জ্বালানি, দুধ, ওষুধ এমনকি টয়লেট পেপার আমদানি করার মতো অর্থ নেই তাদের।
কীভাবে এমন হলো : বিশ্লেষকরা বলছেন, পরের সরকারগুলোর অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা শ্রীলংকার পাবলিক ফাইন্যান্সকে দুর্বল করেছে। ২০১৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই রাজাপাকসে সরকারের করহ্রাস নীতিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মাস পর কোভিড-১৯ মহামারি আঘাত হানে, প্রায় নিশ্চিহ্ন হয় পর্যটন শিল্প। মূল্যস্ফীতি গত মাসে ৫৪.৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং তা বেড়ে ৭০ শতাংশে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সরকার কী করেছে : দ্রুত অবনতিশীল অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও, রাজাপাকসে সরকার প্রাথমিকভাবে আইএমএফের সাথে আলোচনা বন্ধ করে দেয়। কয়েক মাস ধরে বিরোধী নেতারা এবং বিশেষজ্ঞরা সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু পর্যটন আবার ফিরে আসবে এই আশায় হাতগুটিয়ে বসেছিল গোতাবায়ার সরকার। যার ফলে জনগণের ক্ষোভের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া ও তার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। এপ্রিল ২০২১-এ রাসায়নিক সার আমদানি নিষিদ্ধ করেছিলেন গোতাবায়া। এর ফলে ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল উৎপাদন ধ্বংসের মুখে পড়ে। দাম বাড়তে থাকে খাদ্যদ্রব্যের।
এরপর কী হবে : রাজপথের বিক্ষোভের মাধ্যমে একজন বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করা হয়েছে-শ্রীলংকার স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন। প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আইএমএফের সঙ্গে বেলআউট আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, বিক্রমাসিংহে বলেছেন, তিনি জুলাইয়ের শেষের দিকে একটি প্রাথমিক চুক্তি আশা করছেন।
