মেলবোর্ন, ১৯ মে- আফগানিস্তানে ভয়াবহ দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও বেকারত্ব এমন এক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, যেখানে বহু পরিবার এখন বেঁচে থাকার জন্য নিজের সন্তানকে বিক্রি করার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে দেশটির ঘোর প্রদেশে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, অনেক বাবা পরিবারের অন্য সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করতে মেয়েদের বিয়ে বা গৃহকর্মে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এক হৃদয়বিদারক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আফগানিস্তানের বাস্তব চিত্র। প্রতিদিন ভোরে ঘোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারানের একটি ধুলোময় চত্বরে শত শত শ্রমজীবী মানুষ কাজের আশায় জড়ো হন। কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কিন্তু অধিকাংশ দিনই তাদের খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।
৪৫ বছর বয়সী জুমা খান জানান, , “আমার সন্তানরা টানা তিন রাত না খেয়ে ঘুমিয়েছে। স্ত্রী আর বাচ্চারা কান্না করছিল। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছে হাত পেতে আটা কিনেছি। এখন ভয় হয়, না খেয়ে আমার সন্তানরা মারা যাবে।”
আরেক দিনমজুর রাবানি বলেন, “বাড়ি থেকে ফোন করে জানানো হয়, দুই দিন ধরে বাচ্চারা কিছু খায়নি। তখন মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করি। কিন্তু পরে ভাবলাম, আমি মারা গেলে পরিবার আরও অসহায় হয়ে পড়বে।”
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ ন্যূনতম জীবনযাপনের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। দেশটিতে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের এক ধাপ দূরে অবস্থান করছেন।
এই সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ আবদুল রশিদ আজিমির পরিবার। সাত বছর বয়সী যমজ কন্যা রোকিয়া ও রোহিলাকে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কান্নাভেজা কণ্ঠে আবদুল বলেন, “আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করতে রাজি আছি। এক মেয়েকে বিক্রি করতে পারলে বাকি সন্তানদের অন্তত কয়েক বছর খাওয়াতে পারব। প্রতিদিন খালি হাতে বাড়ি ফিরি। সন্তানরা বলে, বাবা রুটি দাও। কিন্তু আমি কী দেব?”
তিনি জানান, মেয়েদের হয় বিয়ের জন্য, নয়তো গৃহকর্মে পাঠিয়ে দিতে চান। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, “এতে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু আর কোনো পথ নেই।”
আবদুলের স্ত্রী কাইহান জানান, তাদের ঘরে অনেক সময় শুধু শুকনো রুটি আর গরম পানি ছাড়া কিছুই থাকে না। পরিবারের দুই ছেলে শহরে জুতা পালিশ করে, আরেকজন ময়লা কুড়িয়ে রান্নার জ্বালানি জোগাড় করে।
আরেক বাসিন্দা সাঈদ আহমদ চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের পাঁচ বছরের মেয়ে শাইকা’কে আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। মেয়েটির অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও লিভারে সিস্ট ধরা পড়ার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
সাঈদ বলেন, “যদি টাকা থাকত, কখনো মেয়েকে বিক্রি করতাম না। কিন্তু অপারেশন না করালে সে মারা যেত। অন্তত এখন সে বেঁচে আছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছর আগেও লাখ লাখ আফগান পরিবার আন্তর্জাতিক খাদ্য সহায়তা পেত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দাতা দেশ সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় সেই সহায়তা এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি বছরে আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা তহবিল গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে।
তালেবান সরকার বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য আগের সরকার ও বিদেশি দখলদারিত্বকে দায়ী করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির কারণেও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধি না পেলে আফগানিস্তানে শিশু বিক্রি, বাল্যবিয়ে ও মানবপাচারের ঘটনা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা