সন্ধান২৪.কম :হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল হকের বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে দুই মাদ্রাসাছাত্র পরিকল্পিতভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করে।

ভিডিও ফুটেজ দেখে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এ ঘটনায় জড়িত দুই ছাত্র ও তাদের দুই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা প্রাথমিকভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। যে কোন ধরনের ভাস্কর্য বা মূর্তি স্থাপন ইসলামে নিষিদ্ধ এমন বক্তব্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হচ্ছিল।
শুক্রবার (৪ ডিসেম্বর) বিকেলে তারা পরিকল্পনা করে। এরপর শীতের জামা কিনতে যাওয়ার কথা বলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন (রেকি) করে। রাতে ভাঙচুর করা হয় জাতির জনকের ভাস্কর্যটি। ভাঙচুরে সময় নেয়া হয়েছে ৮ মিনিট। এ জন্য তারা দুইটি হাতুরি চুরি করে। রাত দেড়টার পর ওই দুই মাদ্রাসাছাত্র বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে।

পুলিশ জানায়, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল হকের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে দেয়া বক্তব্য শুনে কুষ্টিয়ার পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরে উদ্বুদ্ধ হয় দুই মাদ্রাসাছাত্র।
রাতের আঁধারে জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুরের দৃষ্টতাপূর্ণ কর্মকান্ডে ফুসে ওঠেছে সরকারদলীয় নেতকর্মী ও সুশিল সমাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
রোববার (৬ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, কুষ্টিয়া পৌর শহরে বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় আটক হওয়া ৪ জন স্থানীয় একটি মাদ্রাসার দুই ছাত্র ও দুই শিক্ষক। তারা ইবনে মাসউদ মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসে এই কান্ড ঘটিয়েছে। মন্ত্রী বলেন, যে মৌলবাদীরা জাতির পিতার ভাস্কর্যে ভাঙচুর চালিয়েছে, তাদের উদ্দেশে বলছি ‘যদি কেউ মনে করেন, তারা অনেক শক্তিশালী হয়ে গেছেন, এটা তাদের ধারণার ভুল। এই যে উস্কানি দিচ্ছে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বের করে নিয়ে আসছে, এটা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়। আমরা অবশ্যই এটা দেখব।

রোববার কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন ঘটনার আন্দ্যোপান্ত তুলে ধরেন। ঘটনায় ৪ জনকে আটক করার বিষয়টি জানিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ডিআইজি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় দুজনকে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে শনাক্ত করেছে পুলিশ। সিসি ক্যামেরায় ওই দুই যুবককে টুপি মাথায় ও কালো কোট পড়ে ভাস্কর্যের নির্মাণের জন্য স্থাপিত মই বেয়ে উঠতে দেখা গেছে। ওই দুই মাদ্রাসাছাত্র এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে এ ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোন মহলের ইন্দন আছে কিনা তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ মোট চারজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে দু’জন মাদ্রাসার শিক্ষকও আছে।
আটক চারজন হলেন কুষ্টিয়া শহরের জগতি পশ্চিমপাড়া এলাকার ইবনি মাসউদ (রা.) মাদ্রাসার শিক্ষক মো. আল আমিন (২৭), মো. ইউসুফ আলী (২৬)। আর দুই ছাত্র হলেন মো. আবু বকর ওরফে মিঠন (১৯) এবং মো. সবুজ ইসলাম ওরফে নাহিদ (২০)। এর মধ্যে মাদ্রসা শিক্ষক আল আমিন জেলার মিরপুর উপজেলার ধুবইল গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে, মো. ইউসুফ আলী পাবনার আমিনপুর থানার দিয়াড় বামুন্দি এলাকার আজিজুল মন্ডলের ছেলে। দুই ছাত্রের মধ্যে আবু বক্কর কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার শিংপুর গ্রামের সমসের মৃধার ছেলে। এছাড়া সবুজ দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপ নগরের মো. সামছুল ইসলামের ছেলে। তারা দুজনই ঐ মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র।
ডিআইজি ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বয়ানে উদ্বুদ্ধ হয়ে দুই মাদ্রাসাছাত্র বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শনিবার রাতে কুষ্টিয়া পৌরসভার সচিব কামাল উদ্দীন বাদী হয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা করেন। ঘটনার রাতে তারা দুজন একসঙ্গে মাদ্রাসা থেকে হেঁটে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে পাঁচ রাস্তার মোড়ে যান। ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যবহৃত বাঁশের মই বেয়ে দুজন উপরে ওঠেন। এরপর সবুজ পিঠে থাকা ব্যাগ থেকে হাতুড়ি বের করেন। দুজন মিলে ভাস্কর্য ভাঙচুর করেন। ৮ মিনিট ধরে ভাঙচুরের পর তারা আবার হেঁটে মাদ্রাসায় ফিরে যান। শনিবার সকালে তারা বিষয়টি মাদ্রাসার শিক্ষক আল আমিন ও ইউসুফকে জানান। তারা দুই ছাত্রকে পালিয়ে যেতে বলেন। দুই ছাত্র পরে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
শনিবার সকালে পুলিশ ঘটনাস্থালের পাশে থাকা সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে। পরে সেই ভিডিও ফুটেজ পর্যালোনা করে পুলিশ নিশ্চিত হয় ঘটনায় জড়িতরা মাদ্রসাছাত্র। এরপর পুলিশ দুই মাদ্রসাছাত্রের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে গ্রেফতার অভিযানে নামে।
সিসি ক্যামেরায় যা পেয়েছে পুলিশ
শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর অবস্থায় দেখে হৈচৈ পড়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনান্থলে ছুটে আসে। তারা ঘটনাস্থলে এসেই আশপাশের মার্কেট ও দোকানে থাকা কয়েকটি সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে। সিসি ক্যামেরায় পুলিশ দেখতে পায় শুক্রবার রাত সোয়া ২টার পর টুপি মাথায় পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত দুইজন পায়ে হেঁটে এসে বাঁশের মই বেয়ে উঠে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুর করে। দুই যুবক মইয়ে সর্বমোট ৮ মিনিট অবস্থান করে। ৮ মিনিটে তারা মুখমন্ডল ও হাতের অংশ ভাঙচুরের চেষ্টা করে। হাতের অর্ধেক ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম হলেও মুখমন্ডল পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। একাধিক আঘাত করার পর মুখমন্ডল অংশটি আধা ভাঙতে পারে। তাদের চেষ্টা ছিল পুরো ভাস্কর্যটি গুঁড়িয়ে দেয়ার। চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে তারা মিশন শেষ না করেই নেমে পড়ে। এরপর হাতুরিসহ সরঞ্জাম নিয়ে মাদ্রসায় গিয়ে ওঠেন। তারা বুঝতে পারেনি রাতের বেলায় তাদের ছবি সিসি ক্যামেরায় ধারণ হতে পারে।
পরিকল্পনা বিকেলে
পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেলিফোনে সংবাদকে জানান, জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুরের পরিকল্পনাটি বিকেলে নেয় ওই দুই মাদ্রসাছাত্র। মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে তারা রাস্তায় পুলিশের গাড়ি দেখতে পেয়ে পথ পরিবর্তন করে ভিন্নপথে ৫ রাস্তার মোড়ে আসেন। ডিআইজি জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দুই মাদ্রসাছাত্র পুলিশকে জানিয়েছে, কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব চ্যানেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ভাস্কর্যবিরোধী কথাবার্তা প্রচার হচ্ছিল। উস্কানি দেয়ার মতো এসব বক্তব্যে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতারা বক্তব্য রাখছিলেন। সেই বক্তব্য থেকেই ওই দুই ছাত্র উদ্বুদ্ধ হয়ে এ কাজ করার পরিকল্পনা নেয়।
ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাস্কর্যের বিরোধিতা উস্কানো হচ্ছে
পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সমমর্যদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ভাস্কর্যবিরোধী উস্কানি ছড়িয়ে পড়েছে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুক্রবার মসজিদে খুৎবার বয়ানেও এসব ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে মসজিদের ইমামরা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। ওয়াজ মাহফিলেও এসব নিয়ে কথা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতে জনমনে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। কুষ্টিয়ায় জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুরে জড়িত দুই মাদ্রাসাছাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাস্কর্যবিরোধী বক্তব্য থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমাদের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতের আঁধারে কুষ্টিয়ায় নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর দ্বিতীয় দফায় শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সামনে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়েছে এক ব্যক্তি। শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে এসে গুলি করে পালায় সে। সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ ছাই রংয়ের একটি মাইক্রোবাস শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সামনে আসে। দুইবার ঘুরে গাড়ির ভিতর থেকে এক ব্যক্তি অস্ত্র বের করে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এরপর দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে যায়। তখন পাশেই পুলিশসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা পুলিশের উপপরিদর্শক মকছেদুর রহমান ‘সংবাদকে’ বলেন, গাড়ির কোন নাম্বার প্লেট ছিল না। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। দৈনিক সংবাদ


