সন্ধান২৪.কম প্রতিবেদন ঃ ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের ‘যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি রয়েছে।’ প্রকাশিত এই খবর নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটিতে তোলাপাড় সৃষ্টি হয়েছে। নিউইয়র্কের বিভিন্ন অফিস-আদালত,হোটেল-রেস্তরায় ‘১৪ বাড়ি’ টক অব দ্যা টাউনে পরিনত হয়েছে।
এই নিয়ে সবখানে গালগল্প ও মুখরোচক আলোচনার শাখা-প্রশাখা মেলতে শুরু করেছে। সেই সাথে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোসাল মিডিয়ায় নানা রকমের প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
ফেসবুকে একজন প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কিনতে নিশ্চয়ই ক্রেতাকে উপস্থিত থাকতে হয় ? গ্রীন কার্ড / সিটিজেন কি বাধ্যতামূলক? গ্রীন কার্ড হলেই হবে বাড়ি কিনতে পারবে ?
এর উত্তরে আবার আর একজন মন্তব্য করেছেন,‘ সোসাল সিকিউরিটি লাগবে। রাজনীতিক আশ্রয়ে যারা আছে তারা কিন্তু সোসাল সিকিউরিটি পায়। তারা ও কিনতে পারে।’
আর একজন মন্তব্য করেছেন,‘ক্রেতা উপস্থিত থাকা লাগে না, ক্রেতার হয়ে এটর্নি সাক্ষর করে নিলে হয়, এবং যে কেউ আমেরিকাতে বাড়ি কিন্তে পারে,সিটিজেন/গ্রীন কার্ড কোন কিছুই লাগে না।”
অন্য একজন তার উত্তরে বলেছেন, ‘সব বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেলে চেক করে দেখা যেতে পারে।। যারা এই সব খবর প্রচার করে তাদের উচিত ঠিকানা সহ প্রকাশ করা।’
তাকসিম এ খানের পক্ষে-বিপক্ষে এমন নানা মন্তব্য এখন শুধু সোসাল মিডিয়াতেই ভেসে বেড়াচ্ছে না,নিউইয়র্ক বাঙালির কমিউনিটির অলিতে-গলিতে চলছে তর্ক-বির্তক।
‘ওয়াসার তাকসিমের যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ বাড়ি!’ এই সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর নিউইয়র্কে বিএনপি ও জামাত সমর্থিত পত্রিকা ও অনলাইন পেপারগুলো সংবাদটি লুফে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও সরকারকে ‘একহাত’ দেখে নেয়ার এই সুযোগ হাত ছাড়া না করে বিপুল উৎসাহে সংবাদটি প্রকাশ করেছে।
অপর দিকে নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ সমর্থিত গণমাধ্যম সংবাদটি প্রকাশ করবে, না চেপে যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ে পড়েছে। তারা ঘটনাটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ঘরানার অনেকেই এই সংবাদে বিব্রতবোধ করছেন।
নিউইয়র্কে যখন তাকসিম এ খানের পক্ষে-বিপক্ষে স্পষ্টত দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছে কমিউনিটি । ঠিক তখনই সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পরিবারের মাত্র একটি বাড়ি রয়েছে। সেখানে ১৪টি বাড়ি থাকার যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তার কোনো সত্যতা নেই। তিনি বলেছেন, ‘শুধু একটি বাড়ি রয়েছে, সেটি আমার স্ত্রীর কেনা। এর বাইরে কোনো বাড়ি নেই।’
কিন্ত তাকসিমের এ কথা বিশ্বাস করতে চান না, নিউইর্য়কের অনেক প্রবাসী বাঙালি। তাদের কথা, শুষ্ঠু ও সঠিক ভাবে তদন্ত হলে,কেঁচো খুড়তে সাপ বেড়িয়ে আসতে পারে। তারা বলছেন, এ রকম অনেকেই অনেক কথা বলেন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত দেখা যায়,অনেকেই প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়ে আছেন।
এক সংবাদকর্মীর ভাষ্য, যে সংবাদপত্র বলেছে, তাকসিমের ১৪টি বাড়ি আছে,তা প্রমাণ করার নৈতিক দায়িত্ব তাদের। যদি প্রমাণ করতে না পারে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আর যদি সত্যি সত্যি তাকসিমের অবৈধ বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়, তবে তাকসিমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।
খবরটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে মঙ্গলবার কয়েকটি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে ওয়াসা ভবনে কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তাকসিম এ খান। তবে সব গণমাধ্যমের কর্মীদের ওয়াসা ভবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অনেক সাংবাদিক ওয়াসা ভবনের ফটক থেকে ফিরে যান।
তাকসিম এ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি কেনার বিষয়ে যে প্রতিবেদন এসেছে, তা ডাহা মিথ্যা। প্রতিবেদনে শুধু একটি বিষয় ঠিক লিখেছে, সেটা হচ্ছে আমার যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ। আমার স্ত্রীসহ আমার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। আমাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এনে ওয়াসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’
তাকসিম এ খান বলেন, তাঁর স্ত্রী-সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে ওয়েল স্ট্যাবলিশড (ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত), তাই সেখানে একটি বাড়ি কেনায় খুব অসুবিধার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর নামেই ওই একটা বাড়ি আছে। সেটাকেও বাড়ি বলা যাবে না, এটা একটা অ্যাপার্টমেন্ট।’
গত ৯ জানুযারী ওয়াসার এমডির বিষয়ে ঢাকার একটি পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি-দুটি নয়, ১৪ বাড়ি! দেশে নয়, সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খান যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শহরে কিনেছেন এসব বাড়ি। সব বাড়ির দাম টাকার অঙ্কে হাজার কোটি ছাড়াবে। দেশ থেকে অর্থ পাচার করে তিনি এসব বাড়ির মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাড়ি কেনার অর্থের উৎস ও লেনদেন প্রক্রিয়ার তত্ত্বতালাশে নেমেছে ইন্টারপোলসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। বিপুল পরিমাণ অর্থে একের পর এক বাড়ি কেনার ঘটনায় দেশটির গোয়েন্দা তালিকায় সন্দেহভাজন হিসেবে তাকসিমের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
এক যুগের বেশি সময় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন তাকসিম এ খান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তিনি প্রায় প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট সময় সেখানে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেও তাঁর ওয়াসার এমডির দায়িত্ব পালনের ইতিহাস রয়েছে। গেল বছরও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে ওয়াসার দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়ার আবেদন করলে তা অনুমোদন করেনি ঢাকা ওয়াসা বোর্ড।
‘ওয়াসার তাকসিমের যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ বাড়ি!’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে গত সোমবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। দুদকের একজন আইনজীবী প্রতিবেদনটি গতকাল হাইকোর্টের নজরে আনলে আদালত বলেছেন, এ বিষয়ে দুদক যাচাই-বাছাই করতে পারে।


