এস কে সরকার
যে জাতি নিজের ভাষাকে সম্মান করতে পারে না, সে জাতি নিজের পরিচয়ও দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারে না। ভাষার প্রতি ভালোবাসা শুধু ফুল দেওয়া বা অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একুশে ফেব্রুয়ারী মানেই শহীদ মিনার নির্মাণ করে অনুষ্ঠানের আয়োজন , বক্তৃতা করা এই ধারণা আমাদের সংস্কৃতি-বোধকে সংকুচিত করে।

নিউইয়র্কের অনেক আগে থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি চরম অবহেলা চলে আসছে ।অথচ বাংলা ভাষার প্রতি এমন অনিময়মগুলো দেখার কেউ নেই। যারা নিজেদেরকে ‘মাদার সংগঠন”বা আমব্রেলা সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে সেই বাংলাদেশ সোসাইটি এ ব্যাপারে কোন কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। নিউইয়র্ক বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসেরও একই অবস্থা । অথচ তাদেরও এ বিষয়টি দেখার কথা। এমনি করে নিউইয়র্কে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শীত ঘুমে মগ্ন আছে।
অথচ ফেব্রুয়ারি এলেই নিউইয়র্কের নেতারা মাইকে এক ধরণের আবেগ মিশে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন।পারলে একুশের চেতনা রক্ষায় নিজের জীবনটা দিতে প্রস্তুত-এমন ভাব প্রকাশ করেন।
নিউইয়র্কে বাঙালি কমিনিটির সংগঠনগুলো মনে করে একুশে ফেব্রুয়ারীতে শহীদ মিনারে হুরোহুরি করে ফুল দেয়া, কালো পাঞ্জাবী পড়ে মাইকে বক্তব্য করা,হৈ-হুল্লোড় করে সেজেগুজে দলবেধে সেলফি তোলাই হচ্ছে একুশের চেতনা।
এরা হয়তো জানেই না,ভাষাকে অবহেলা করা মানে নিজের শিকড়কে দুর্বল করে দেওয়া। একুশ মানে নিউইয়র্কে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তার নিজ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা।

নিউইয়র্কে যে সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে সেখানে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে আমাদেরকে মনে-প্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি বলে প্রমাণ করতে হবে। কথনে, লিখনে, চিন্তনে ও পঠনে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করাই একুশের যে মূল দাবি তা বাংলাদেশ সোসাইটি,কনস্যুলেট অফিস,বিভিন্ন সংগঠন জানেই না ।
নিউইয়র্কের অফিস-আদালত,স্কুল,কলেজ, হাসপাতাল,ট্রেন,বাস সব জায়গায় বাংলা ভাষা ও বাংলা শব্দ বিকৃত ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বাংলাকে গুগল ট্রান্সপোর্ট করে চালিয়ে নেয়া হচেছ। যার ফলে অনেক শব্দ বা বাক্য বোঝার উপায় থাকে না।
আঞ্চলিক সংগঠন গাইবান্ধা সোসাইটি অব আমেরিকা বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষাকে নিউইয়র্কে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে প্রশংসনীয় কাজ করে আসছে। বিভিন্ন অফিস-আদালতে শুদ্ধভাবে বাংলা ব্যবহারের দাবীতে তারা গত কয় বছর ব্যাপক কাজ করেছে। নিউইয়র্কের গুরত্বপূর্ণ এলাকায় তারা গণস্বাক্ষর গ্রহন করে। এবং সেই গণস্বাক্ষরের চিঠি বাংলাদেশ সোসাইটি,কনস্যুলেট অফিস ও বিভিন্ন অফিস আদালতে পাঠায়।
এ ব্যাপারে গাইবান্ধা সোসাইটির একজন কর্মকর্তা এই প্রতিনিধিকে জানান, বাংলাদেশ সোসাইটি ও কনস্যুলেট অফিসে স্মারকলিপি দেয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। কিন্ত খোঁজ নিয়ে জানা যায়,তারা কিছুই করেন নাই-শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে একজন সাংস্কৃতিক কর্মী বলেন, এই কাজগুলো বাংলাদেশ সোসাইটির করা একেবার নৈতিক দ্বায়িত্ব। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসও এর দায় এড়াতে পারে না।
বাংলাদেশ সোসাইটি ও এখানকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা মনে করেন তাদের একমাত্র কাজ অভিষেক অনুষ্ঠান,ইফতার মাহফিল,পিকনিক ও দুই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা । এর বাহিরে তাদের আর কোন কাজ নাই।
প্রতিবছর একুশের অনুষ্ঠানে শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে বড় বড় নেতারা রফিক ,শফিক,সালাম,জব্বার, বরকতের কথা বলে নিউইয়র্কে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্ত ওই পর্যন্তই । মঞ্চ থেকে নামলেই বা একুশ পেরুলেই তারা সব বেমালুম ভুলে যান।
আমরা যে শ্রদ্ধা জানাই, তা আসলে একটি প্রতিশ্রুতি—নিজের এই প্রতিশ্রুতি যদি আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে পারি, তাহলে একুশের আত্মত্যাগ সত্যিকার অর্থেই সার্থক হবে।
একুশ আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। নিউইয়র্কে শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার, সাহিত্যচর্চা এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাই একুশের প্রকৃত সম্মান। আমাদের বুঝতে হবে একুশে কোনো অলংকার নয়। এটি ভাষার এক দীর্ঘ সঞ্চিত চেতনা। সেই একুশের চেতনাকে নিউইয়র্কে বাস্তবায়নে আমরা কবরের নিরবতা পালন করে আসছি। তার বদলে পোষাকি অনুষ্ঠান করছি।
এই নীরবতা আমরা কি মেনে নেব? নাকি এখনই বোধ জাগ্রত করব? নিউইয়র্কের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হয়ে বা সংগঠনের প্রতিনিধি হয়ে আগে ভাবা উচিৎ আমাদের কি করা উচিৎ।


