সন্ধান২৪.কম: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য গাইবান্ধায় মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে গঠিত ‘মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ‘র প্রয়াত চার সংগঠককে স্মরণ করলো নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিরা। রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে প্রতিটি এলাকায় সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। তার সেই নিদের্শেই গাইবান্ধা মহকুমায় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।


গাইবান্ধা সোসাইটি অব আমেরিকা আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠান থেকে বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম স্পিকার শাহ্ আব্দুল হামিদের নামে জাতীয় সংসদে একটি কক্ষের নাম এবং মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য গাইবান্ধার ৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও আর্ন্তজাতিকভাবে গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।


স্থানীয় সময় শনিবার (২৩ মার্চ) সন্ধায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে একটি পার্টি হলে সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক লুৎফর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়ালিউর রহমান রেজা, সদস্য শাহ্ আব্দুল হামিদ ও সদস্য ডা. মফিজার রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন নিউইয়র্কের সর্বস্তরের মানুষ।
মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে ‘যারা এঁকেছে এই মানচিত্র’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সঙ্গীতশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়।


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ নাজমূল হুদা। অতিথির মঞ্চে ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদউল্লাহ, সাপ্তাহিক ঠিকানার প্রধান সম্পাদক মুহম্মদ ফজলুর রহমান, বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়্যার ভেটেরান্স ১৯৭১ ইউএসএ‘র সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা খান মিরাজ, উদীচী যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত বিশ্বাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা খুরশীদ আনোয়ার বাবলু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আকবর রিচি।
এছাড়াও বক্তব্য দেন ওপেন আইজ নিউইয়র্কএর অন্যতম সংগঠক মুজাহিদ আনসারী, যুক্তরাষ্ট্র একুশে চেতনা পরিষদের সভাপতি ড. উবায়দুল্লাহ মামুন , প্রয়াত ডা. মফিজার রহমানের পুত্র এম মাসুদুর রহমান, প্রয়াত ওয়ালিউর রহমান রেজার ভাগিনা ইসাম হায়াত সংংকেত,প্রোগ্রেসিভ ফোরামের নেতা জাকির হোসেন বাচ্চু প্রমূখ।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে করতে গিয়ে রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, যদি সেই সময় সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বাঙালিদের সংগঠিত না করতেন, দিকনিদের্শনা না দিতেন তা হলে হয়ত মুক্তিযুদ্ধ আরও দেরি হতো।

প্রধান অতিথির ভাষণে কনস্যাল জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হুদা মুক্তিযুদ্ধে চার সংগঠকের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন,মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবময় ইতিহাসের কথা আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তিনি উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, আপনারা মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা,আদর্শ-উদ্দেশ্য বিভিন্ন পর্যায়ে তুলে ধরুণ,যাতে করে সঠিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘যারা এঁকেছে এই মানচিত্র, অনুষ্ঠানকে ‘পিপলস্ হিস্ট্রি’র অনন্য উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরী হয়, সেই বিভ্রান্তির বিপক্ষে আজকের মত অনুষ্ঠান ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।

সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, উগ্র সাম্প্রদায়িকতার মূলোৎপাটন করাই এখনকার চ্যালেঞ্জ। সব গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে এক হয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তির মূলোৎপাটন করতে হবে।

ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার মানুষকে সেই সময় সংগ্রাম পরিষদের নেতার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করান। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
গোলাম মোস্তফা খান মিরাজ বলেন, জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামে এই সংগঠকরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এনাদের মত সংগঠকদের নেতৃত্বে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন । বক্তৃতার এক পর্যায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গাইবান্ধায় কাদেরিয়া বাহিনীর কথা স্মরণ করে বলেন,সেই সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে আমার মত গাইবান্ধার অনেক তরুণ-যুবক কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেন। সেই সময় গাইবান্ধায় পুলিশ ও বিডিআর এক যুদ্ধে কাদেরিয়ার বাহিনীর ১৩ জনকে হত্যা করে।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, এই সংগঠনটি যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এই আয়োজন এখানকার বাংলাদেশিদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তারা বলেন, নিউইয়র্কের প্রতিটি আঞ্চলিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উচিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরা।

আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সনজীবন কুমার। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক রেজা রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাহফুজুল ইসলাম তুহিন ও মুক্তি সরকার। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন দীলিপ মোদক।

অনুষ্ঠানে চার সংগঠকের জীবনী পাঠ করেন নাজমা বেগম, প্রতীমা সরকার, ফাহমিদা চৌধুরী লুনা ও প্রশান্ত সরকার।
অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় কথা বলেন ওয়ালিউর রহমান রেজার কন্য ওয়াফি রহমান অনন্যা। অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের কাছে চার সংগঠকের প্রতিকৃতি হস্তান্তর করা হয়। সবশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন শিল্পী শাহ মাহবুব,সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুক্তি সরকার,চামেলী গোমেজ, সোন্দর্য রায় ।


