বোরো মৌসুমেই অস্থির চালের বাজার

দেশে ধানের সব মৌসুমেই বাজারে চালের দাম কমে। কিন্তু এবার উলটো চিত্র। ভরা বোরো মৌসুমেও বাড়ল দাম। ১০ দিনের ব্যবধানে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চালে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা বেড়েছে।

বাজারে অন্যান্য পণ্যের বেসামাল দরের তালিকায় শেষ পর্যন্ত চালও যোগ হয়েছে। এতে ভোক্তার নাভিশ্বাস আরও তীব্র হয়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিকেজি চালে সর্বোচ্চ সাত টাকা বেড়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বাজারের পণ্য মূল্য নিয়ে শেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বৃহস্পতিবার। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে-গত বছর একই সময়ের তুলনায় প্রতি কেজি মোটা চাল এক দশমিক ১০ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর সরু চাল কেজিপ্রতি ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবির তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এবার কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৬ টাকা।

এ বিষয়ে খাদ্যসচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, এ মুহূর্তে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। সরকারি গুদামে যথেষ্ট পরিমাণ চাল মজুত আছে। বেসরকারি খাতেও চালের সংকট নেই। বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দিলেন কি না, তা অনুসন্ধান করে দেখা হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানিসহ সুপার শপ চাল ব্যবসায় নেমেছে। এতদিন তারা নওগাঁ থেকে চাল সংগ্রহ করে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করেছে। এবার তারা সরাসরি ধান কিনে সংগ্রহ করছে। অনেকে ধান মজুত করছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।

এ কারণে দাম বাড়ছে। এ ছাড়া এবার বোরো মৌসুমের শুরুতে হাওড়ে বন্যায় ধান নষ্ট হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় অশনির কারণে বৃষ্টিতে পাকা ধানের ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া, ইউক্রেন ও ভারত থেকে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গমের দাম বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে চালের বাজারেও।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বোরো ধানের ৬২ শতাংশ এরই মধ্যে কাটা হয়ে গেছে। চালও বাজারে আসতে শুরু করেছে। তবে হাওড়ে আগাম পানি এসে যাওয়া ও অতিবৃষ্টির কারণে ৮০ হাজার টন চাল নষ্ট হয়েছে। কিন্তু এর পরও এবার বোরোতে দুই কোটি সাত লাখ টনের উপরে চাল উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বৈশ্বিক দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে আগের বছরের তুলনায় এ বছর দেড় লাখ টন চাল বেশি উৎপাদিত হবে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে তিন কোটি ৬০ লাখ টন চাল হওয়ার কথা। এর পরও বাজারে চালের দাম বাড়ছে।

রাজধানীর কাওরান বাজার ও বাদামতলী পাইকারি চালের আড়ৎ ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৩২০০ টাকা যা দশ দিন আগে ছিল ২৯০০ টাকা। বিআর ২৮ চাল বস্তা বিক্রি হয়েছে ২৪০০ টাকা যা আগে ছিল ২২০০ টাকা। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চালের বস্তা বিক্রি হয়েছে ২২৫০ টাকা যা আগে ২০৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বোরো মৌসুমে দেশের চাহিদার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ চাল সংগ্রহ করা হয়। আমার ব্যবসায়ী জীবনের ইতিহাসে এবারই প্রথম দেখলাম বোরো মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে। মিল থেকে দাম বাড়চ্ছে। প্রতিদিন নতুন রেট দিচ্ছে। বেশি টাকা দিয়ে চাহিদাপত্র দেবার পরও চাল পাচ্ছি না। তদারকি দরকার।

ওই ব্যবসায়ী জানান, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বাড়তি মুনাফা করতে ধান ও চাল কিনে মজুত করছে। এতে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে চালের দাম বেড়েছে।

নওগাঁ চাল মিল পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে শুক্রবার প্রতি বস্তা মিনিকেট ৩১০০ টাকা বিক্রি হয়েছে যা সাত দিন আগে ২৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি বস্তা বিআর ২৮ চাল বিক্রি হয়েছে ২৩৫০ টাকায় যা সাত দিন আগে ২১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। স্বর্ণা চাল প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ২১৫০ টাকা যা আগে ১৯৫০ টাকা ছিল।

নওগাঁর মহাদেবপুরের মিল মালিক মো. সালাউদ্দিন জব্বার বলেন, বড় বড় বেশ কয়েকটি কোম্পানি ও সুপার শপ চালের ব্যবসায় নেমেছে। তারা নিজ উদ্যোগে কৃষক পর্যায় থেকে ধান সংগ্রহ করছে। যার ফলে বাজারে সরবরাহে বিঘ্ন হচ্ছে।

রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরু চালের মধ্যে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা, যা এক মাস আগে ৬০-৬৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা চাল প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৪৬-৫০ টাকা যা এক মাস আগে ৪২-৪৪ টাকায় বিক্রি হয়।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ধান উৎপাদন মৌসুমে চালের বাজার অস্থির। কিন্তু এটা হওয়ার কথা ছিল না। কেন এমন পরিস্থিতি হয়েছে তা বের করতে হবে। পাশাপাশি কেউ যদি মজুত করে তাদের শনাক্ত করে মজুত করা চাল বাজারে ছাড়তে হবে। বিশ্ববাজারের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে চালের বাজার অস্থির করতে না পারেন সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অনিয়ম পেলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

Exit mobile version