ফরমানুল ইসলামের শরীর আগুনে ক্ষতবিক্ষত। পোড়া শরীর নিয়ে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউ’র বিছানায় কাতরাচ্ছেন। তিনি সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে রিসিভার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের আগে ডিপো থেকে বেরিয়ে যান। আগুন লাগার খবর পেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে কয়েকবার লাইভ করেন। লাইভ কেটে তার দুবাইয়ে অবস্থানরত চাচার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণের শব্দ। ফরমানের বন্ধু জাহেদুল বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ শুনে ফরমানের মোবাইলে কল করে বন্ধ পান। দ্রুতই তিনি ছুটে আসেন ডিপোতে। একজনের কাছে জানতে পারেন শরীরে আগুন নিয়ে ডিপোর পাশে থাকা পুকুরের দিকে দৌড়ে গিয়েছেন।
এরপর সেখানে গিয়ে আগুন নেভাতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার বন্ধু পুকুরের কাছে যেতেই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠেন আমি ফরমান, আমার শরীরে আগুন লেগেছে।
ফরমানের চাচি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ডিপোতে রিসিভার হিসেবে কাজ করতেন। রাতে যখন ওদের ডিপোতে আগুন লাগে তখন ফরমান তার দুবাইয়ে থাকা চাচার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হয়। তার চাচাকে বলে আমাদের ডিপোতে আগুন লেগেছে, ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। ওর চাচা দূরে সরে যেতে বলে। তখন সে অনেকটা দূরে ছিল। এরপর আমার স্বামী কল করে ঘটনাটি জানায়। ফরমান আগুনের ঘটনা কয়েকবার ফেসবুকে লাইভও দেখায়। রাত সাড়ে ১১টার সময় ফরমানের বন্ধু জাহেদুল ইসলাম বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেয়ে তার মোবাইলে কল করে বন্ধ পায়। এরপর সে ঘটনাস্থলে চলে যায়। পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চারিদিকে বাসাবাড়ির গ্লাস ভাঙা। তার ভেতর থেকে হেঁটে চলে যায় বন্ধুর খোঁজে। সে দেখে লোকজন ছোটাছুটি করছে। অনেকের শরীরে আগুন। কেউ চোখে দেখতে পাচ্ছে না। কারও আবার হাত পা নেই। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটছে। এরপর সে পরিচিত একজনের কাছে জানতে চায় ফরমানকে দেখেছে কিনা। তখন সে বলে ডিপোর পাশে থাকা পুকুরের দিকে দৌড়াতে দেখেছি। তখন ফরমানের পুরো শরীরে আগুন ছিল। জাহেদ পুকুরের কাছে যেতেই ফরমান বলে উঠেছে আমি ফরমান। আমার শরীর আগুনে পুড়ে গেছে। এরপর ওর বন্ধু পুকুর থেকে তাকে উঠিয়ে চট্টগ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ৪ ভাইবোনের মধ্যে ফরমান সবার বড়। ৩ বোনের মধ্যে এক বোনের বিয়ে হয়েছে। বাবা নাসির উদ্দিন কৃষিকাজ করে। সে অনেক অসুস্থ। ফরমানের আয় দিয়ে সংসার চলতো। অভাবের সংসার। মাঝে মাঝে আমরা তাদের সহযোগিতা করতাম। তার শরীরে ৪০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। দুই চোখ খুলতে পারছে না। মুখ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আম্মু আমি আগুনের মধ্যে ছিলাম, হয়তো বাঁচবো না: এদিকে বার্ন ইউনিটের সামনে হতবাক হয়ে বসে আছেন মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আমার শ্যালক গাউসুল আযম (২২) ফায়ার সার্ভিসের সীতাকুণ্ড স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। খবর শুনে আগুন নেভানোর জন্য ঘটনাস্থলে যান। পাঁচ বছর ধরে চাকরি করেন। আগুন লাগার ঘটনা শুনে সেখানে যায়। গ্রামের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর থানায়। তার বাবা মো. আজগর আলী। সকাল ৮টার দিকে আমার আরেক ভাই খবর পায়। সে খবর পেয়ে আমাকে জানায়। চট্টগ্রাম সিএমএইচ থেকে গত রোববার বিকালে ঢাকা নিয়ে আসে। গাউসুল এখন আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। তার পাঁচ মাসের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। কয়েকদিন আগে গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছে। বিস্ফোরণের পর তার মায়ের সঙ্গে পাশে থাকা একজনের ফোন থেকে কথা হয়। তখন সে বলে, ‘আম্মু আমি আগুনের মধ্যে ছিলাম হয়তো বাঁচবো না’। এই কথা বলে ফোন রেখে দিয়েছে। তারপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকাতে নিয়ে আসে। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে গাউসুল বড়। পরিবারে ইনকাম করার মতো সেইই ছিল। ওর বাবার বয়স হয়েছে। গাউসুলের শরীরের ৮০ শতাংশ দগ্ধ। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
‘বন্যা তুমি মনোযোগ দিয়ে পইড়ো’: বন্যা আক্তার। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। তার স্বামী রবিন (২২) ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত ছিলেন। এখন দগ্ধ শরীর নিয়ে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি। স্বামীকে দেখতে ধামরাই থেকে ফলমুলসহ ও অন্য খাবার নিয়ে ছুটে এসেছেন তিনি। চোখেমুখে হতাশার ছাপ। মাত্র দেড় বছর হলো বিয়ে করেছেন। আইসিইউর সামনে স্বামীকে এক নজর দেখার অপেক্ষা যেন তার। ঘটনার আগে রবিনের সঙ্গে কথা হয়েছে তার। রবিন তাকে মনোযোগ দিয়ে পড়ার কথাও বলেছে। এরপর খবর পেয়ে আগুন নেভানোর জন্য ঘটনাস্থলে যায়। বন্যা বলেন, রবিন সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত ছিলেন। দেড় বছর হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমার সঙ্গে ৯টার সময় আধাঘণ্টার মতো কথা হয়েছে। তখন আমি পড়াশোনা করি। রবিন আমাকে বলে, ‘বন্যা তুমি মনোযোগ দিয়ে পইড়ো।’ পরে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে। এরপর আমার আম্মুকে বলে ‘আম্মু আগুনের ঘটনার খবর এসেছে আমাকে সেখানে যেতে হবে এখন ফোন রাখি। পরে এসে কথা হবে।’
সীতাকুণ্ডে অগ্নিকাণ্ডে আহত রোগীদের জন্য শতভাগ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে-স্বাস্থ্যমন্ত্রী: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘটনায় আহত সকল রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা সেবা শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক, এমপি। গতকাল বেলা সোয়া ২টার দিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, আহতদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সকল হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও ঢাকায় যাদের আনা হয়েছে তাদের জন্য আলাদা মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রামেও একটি আলাদা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এসবের পাশাপাশি সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


