দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনালের লাইটিংয়ের জন্য নিম্নমানের বাতি আমদানির অভিযোগ উঠেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) পুরো বিমানবন্দরের আলোকসজ্জায় জার্মানি ব্র্যান্ডের ফিলিপস বাতি লাগানোর অনুমোদন দিলেও ঠিকাদার আমদানি করছে কোরিয়ান ব্র্যান্ড মালদানি বাতি। ইতোমধ্যে কার্গো কমপ্লেক্সের জন্য বেশ কিছু বাতি আমদানিও হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালদানি বাতি ব্যবহারের রেকর্ড নেই। সেখানে অতিরিক্ত মুনাফা করার জন্য ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) লাগাচ্ছে নিম্নমানের এই বাতি। এসব বাতি লাগানোর জন্য যেসব সুইচ আমদানি করা হয়েছে সেগুলোর মান নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েছে এডিসি। এ অবস্থায় সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের আদলে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পটি তৈরির প্রক্রিয়াটি হোঁচট খেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
তবে গত ৪ জুন ‘সিন্ডিকেটের কবলে থার্ড টার্মিনালের কেনাকাটা’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ। বেশ কিছু পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি থেকে সরে আসতেও শুরু করেছে। এডিসির ম্যানেজার (ইলেকট্রিক) টাইগার ছুই গত সপ্তাহে স্থানীয় কেবল উৎপাদনকারী কোম্পানিসহ বেশ কয়েকটি দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও প্রকল্পটি নিয়ে মনিটরিং জোরদার করেছে। দুদক ইতোমধ্যে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের তালিকা, ব্র্যান্ড ও সেগুলো কোন দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে তা জানতে চেয়েছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে। দেশে ভালো মানের পণ্য থাকার পরও বিদেশ থেকে উচ্চ শুল্কে আমদানি করা পণ্যের তালিকাও চেয়েছে দুদক।
অপর দিকে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যবহৃত পণ্যের মান নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। বেবিচক থেকে যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ইকুইপমেন্ট অবশ্যই ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড হতে হবে। দেশীয় কোম্পানির আন্তর্জাতিক মানের পণ্য থাকলে সেটা আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। তিনি বলেছেন, কোনো ধরনের সিন্ডিকেট এই প্রকল্পে থাকতে পারবে না। প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এলএস নামের একটি কোম্পানির যে কেবল আমদানি করা হয়েছে তার জন্য ৫৮.৬০ শতাংশ ট্যাক্স-ভ্যাট দিতে হচ্ছে বেবিচককে। সে ক্ষেত্রে কেবলের মূল্য আর ট্যাক্স-ভ্যাট যোগ করা হলে দেশীয় কেবলের চেয়ে আরও অনেক বেশি দাম পড়বে। তার পরও সিন্ডিকেট বিদেশ থেকে মালামাল ক্রয়ে বেশি আগ্রহী। তিনি বলেন, মূলত দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্য করার জন্য বিদেশ থেকে আমদানিতে বেশি ঝুঁকছে ঠিকাদার। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সব কিছু যাচাই-বাছাই ও মনিটরিং শুরু করেছেন বলে দুদকের ওই কর্মকর্তা জানান।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অপর একজন কর্মকর্তা আরও বলেন, ইতোমধ্যে শাহজালালের কার্গো টার্মিনালে কোরিয়ান মালদানি ব্র্যান্ডের লাইটিং বাতি লাগানো শুরু করেছে ঠিকাদার। জানা গেছে, দেশে মালদানির কোনো ডিলার কিংবা লোকাল এজেন্ট নেই। বাতি নষ্ট হলে সেগুলোর মেরামত ও ওয়ারেন্টির কোনো ব্যবস্থা নেই। তা ছাড়া মালদানি বাতিতে আলোও কম হয়।
জানা গেছে, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য ও ঠিকাদারের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। এ ছাড়া সংরক্ষিত মহিলা আসনের একজন এমপিও এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। জানা গেছে, প্রভাব খাটিয়ে ওই মহিলা এমপি শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে একাধিক প্রকল্প হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব প্রকল্পেও নিম্নমানের কাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু দলীয় প্রভাব থাকায় কেউ কোনো ধরনের টুঁ শব্দ করতে পারেন না বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
বেবিচকের নিয়োগ করা কনসালটেন্ট ফার্মের কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের চুক্তিতে বাধ্যবাধকতা থাকায় কোরিয়া থেকে মালদানি বাতি আমদানি করার সুযোগ পাচ্ছে ঠিকাদার। তিনি বলেন, মালদানি বাতি থেকে জার্মানির তৈরি ফিলিপস বাতির দাম ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু অনেক বেশি উন্নতমানের ও অত্যাধুনিক।
