সন্ধান২৪.কম ঃ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের সংখ্যালুঘুদের জন্য বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন । এত বছর পেড়িয়ে গেলেও, সেগুলো আজও পুরণ করা হয়নি।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ।তিনি ও বর্তমান সরকার ইচ্ছে করলেই সংখ্যালঘুদের উপর সকল অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন। গত ২৮ এপ্রিল সন্ধায় জ্যাকসন হাইটসের একটি রেষ্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শোনান সংগঠনের অন্যমত নেতা বিষ্ণু গোপ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন নবেন্দু বিকাশ দত্ত, দ্বীজেন ভট্টাচার্য, শিতাংসু গুহ,সুশিল সাহা ও রূপকুমার ভৌমিক। মঞ্চে ছিলেন ভজন সরকার,টমাস দুলু রায় ও রবীন্দ্র নাথ ।
উল্লেখ্য,বর্তমানে ব্শ্বি ব্যাংকের আমন্ত্রণে বাংলাদে্শের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন। তার আগমনকে কেন্দ্র করে এবং তাকে তার দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে দেয়ার জন্যই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এক প্রশ্নের উত্তরে শিতাংশু গুহ বলেন, প্রেম গড়েও ওঠে, আবার প্রেম ভেঙেও যায় । মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের সাথে সংখ্যালঘুদের একটা ভালো সম্পর্ক ছিল । কিন্ত কালের বিবর্তনে সেই মোহ ভঙ্গ হয়েছে । তাদের সা্থে প্রেম ভেঙ্গে গেছে। কারণ ১৯১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া তারা তাদের তিনটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নাই।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য সংগঠনের কি ভূমিকা পালন করছে ? এমন প্রশ্নের উত্তরে দ্বীজেন ভট্টাচার্য বলেন, আমরা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিউইয়র্ক,ওযাশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ষ্টেট ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের দুদর্শা অসহায়ত্বের দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি কথা জানাচ্ছি।
নবেন্দু দত্ত বলেন, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে করতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। খুব দ্রুত সরকার আমাদের দাবী মেনে না নিলে ভবিষ্যতে আমরা আরও বৃহৎ আন্দোলন করবো। দরকার হলে অনশনের মত কর্মসূচী ঘোষনা করতে বাধ্য হবো।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশের প্রগতিশীল মানুষজন, সাংসদবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, বি,জি,বি ও পুলিশ প্রধানদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে চাই যে, তাঁরা যেন দেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সামপ্রদায়িক সন্ত্রাস বন্ধ করতে সচেষ্ট হন।

১৯৮৮ সালে এরশাদ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার ভিত্তিতে রচিত ১৯৭২ সালের শাষনতন্ত্রের অন্যতম মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার অব্যবহিত পর দাউদকান্দি ঋষি পাড়ায় আক্রমণকারী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা ঘোষণা করেছিল “এই দেশ আবার পাকিস্তান হয়ে গেছে, কাফেরদের এ’দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।” তখন থেকে নিয়মিতভাবে সংখ্যালঘু বিরোধী সামপ্রদায়িক সন্ত্রাসের কার্যক্রমটি অব্যহত রয়েছে। উদাহরণ হিশেবে, ২০১২ সালে রামু, ২০১৩ সালে নন্দীরহাট, ২০১৬-তে নাসিরনগর, ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাছড়া, ২০১৯ সালে ভোলার বোরহানুদ্দীন , ২০২১ সালের পুজোয় কুমিল্লা, চট্টগাম, ও নোয়াখালী সহ দেশের বিভিন্ন জেলায, এবং সম্প্রতি ঠাকুরগাঁয়ে সংঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে আপনারা সম্যক আবগত আছেন, তাই সেগুলোর বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন মনে করিনা। বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘু নাগরিকদের বিতাড়নের উদ্দেশ্য ও কলা-কৌশল অভিন্ন, তাই সেই বিবরণও দিচ্ছি না।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, আমারা আজ যা বলতে চাই সেটা হল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে কারণ ১৯৭২ সাল থেকে এ’ পর্যন্ত কোন সরকারই সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার করেনি। ধর্মীয় মৌলবাদী এবং উগ্রপন্থী ঐসব নির্যাতনকারীরা জানে যে, সংখ্যালঘু নারী ধর্ষণ, খুন, বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের পুরো গ্রাম উৎখাত করে ফেললেও (যেমন, ১৯৯২ সালের ১০ই এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের লোগাং ম্যসাকার) বিচার হবে না। তাই তারা তাদের ঘোষিত লক্ষ্য দেশকে আফগানিস্তানের মত একটি শারিয়া-শাসিত ইসলামিক অমিরাতে রূপান্তরিত করতে নির্ভয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৭২ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাবলীর হোতাদের তদন্ত করে কোন তালিকা এখনও করা হয়নি; তবে, ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংঘটিত বর্বর আক্রমানের ৫৮,০০০ কেইস লিপিবদ্ধ আছে মানকাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবিরের বই এবং জজ সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত প্রোব কমিশন রিপোর্টে। তৎপরবর্তী কালের হাজার হাজার ঘটনা বিশদভাবে খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলোর অপরাধীদের তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে। ব্যতিক্রম হিশেবে হাতে গুনা যায় এমন কয়েকটি কেইসে অভিযুক্তদের ছাড়া, সরকার সচরাচর সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার করে না।
অবিরাম এই বর্বর নির্যাতনে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ায় সংখ্যালঘুরা ১৯৭১ সালে যে স্থলে মোট জনসংখ্যার ১৯.৭% ছিল আজ ২০২৩ সালে সেটা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৯.১%-এ; আর, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটা ১৯৪৭ সালে যে স্থলে ছিল ৯৮.৬% আজ ২০২৩ সালে সেটা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮%-এ।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার হয়না, সেখানে সংখ্যালঘু সুরক্ষার জন্য কোন বিশেষ আইন নেই, এমনকি প্রচলিত আইনেও তাদের বিচার করা হয় না, দু’একটি লোক-দেখানো ব্যতিক্রম ছাড়া। বন্ধুগন, আওয়ামী লীগ ও তার জোটভুক্ত দলসমূহ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে, ওনার জোটভুক্ত দলের সাংসদবৃন্দ, এবং সরকারী কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে দাবি করে এসেছেন যে, তারা সেকুলার ডেমোক্র্যাসি এবং দেশের সকল নাগরিকের সম-অধিকারে বিশ্বাসী। তবে কেন তাঁদের শাসনামলে নির্যাতিত হয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের দেশত্যাগ করতে হচ্ছে?
সরকার চাইলে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। ২০২২ সালের পুজোয় অঘটন ঘটেনি, কারণ সরকার কঠোর ছিলো। আইন করে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতার নীতি অবলম্বন করলেই সেটা বন্ধ করা সম্ভব। বিচার এবং শাস্তির ভয় থাকলে মৌলবাদী ও উগ্রপন্থীরা দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান ও আদিবাসীদের টার্গেট করে সন্ত্রাস চালাতে সাহস করবে না।
তাই মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদের কাছে আমাদের দাবি এবং সনির্বন্ধ অনুরোধ এই যে, তাঁরা যেন আগামী নির্বচনের আগেই সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন পূর্বক, চিহ্ণিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে দেশের বিপন্ন সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব সুরক্ষার টেকসই ব্যবস্থা গ্রহন করেন।
আমরা মনে করি যে, নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহন করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নিরন্তর চলমান, অমানবিক প্রক্রিয়া বন্ধ করা সম্ভব:
(১) বর্তমান সংসদে একটি সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করা, যার অন্তর্ভুক্ত থাকা চাই (ক)হেইট স্পীচ্ ও ক্রাইম আইন, যে আইনের অধীনে সরকার-বাদী-মোকদ্দমার মাধ্যমে সকল সংখ্যালঘু নির্যাতকের বিচার হবে; (খ)সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচারের জন্য প্রতি জেলায় একটি দ্রুত-বিচারের ক্ষমতা সম্পন্ন আদালত প্রতিষ্ঠা করা।
(২) জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা।
(৩) বাতিলকৃত শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইনে অধিগৃহীত সকল সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া।
এছাড়াও অবশ্য কয়েকটি সম্পূরক পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলো হচ্ছে: (ক) ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনরুজ্জিবীত করা,(খ) জজ্ সাহাবুদ্দীন কমিশন রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী অবিলম্বে সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা; (গ)একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন পূর্বক ২০০৬ থেকে এ’পর্যন্ত সংঘটিত সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপরাধীদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছে হস্তান্তর করা; (ঘ) নির্যাতন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের যথেষ্ট পরিমান ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁদের পুনর্বাসন এবং শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা; (ঙ)একটি বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন করা; (চ)পার্বত্য ভূমি কমিশনের দ্রুত, যথাযথ বাস্তবায়ন; (ছ)দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ আইন করা;(জ)সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসমূহের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা; এবং,(ঝ) ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আদলে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ফাউণ্ডেশেন গঠন করা।
সাংবাদিক বন্ধুগন, আমাদের দাবীনামার ১, ২, ও ৩ অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিও বটে। যদিও সেগুলো আজও পুরণ করা হয়নি,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। লক্ষ্য করুন, আমারা যে প্রস্তাবগুলো করেছি সেগুলো আমাদের নিজেদের চিন্তা প্রসূত নতুন কিছু নয়; পাশের দেশ ভারতে জাতীয় সংখ্যালঘু আইন তো আছেই, একটি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও রয়েছে; আর এখানে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে, হেইট ক্রাইম আইন রয়েছে যার বলে কেউ বর্ণবাদী বা ধর্মীয় সন্ত্রাসের শিকার হলে ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সন্ত্রাসীকে ফেডারেল অপরাধে অপরাধী হিসেবে ত্বরিৎ বিচারের ব্যবস্থা করে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো গ্রহন করলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করা এবং তাঁদের সম-অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াটা মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের জন্য এবং গোটা বাঙালী জাতির জন্য নি:সন্দেহে একটি গৌরবের কাজ, এবং এটা সরকারের দায়িত্ব এবং নৈতিক কর্তব্যও বটে।


