সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল ঢাকার ‘রিকশা ও রিকশাচিত্র’

সন্ধান২৪.কম: বাংলাদেশের ৫ম বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল ঢাকা শহরের ‘রিকশা ও রিকশাচিত্র’। গত ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর কমিটির অধিবেশনে ‘ঐতিহ্যগত কারুশিল্প’ ক্যাটাগরিতে রিক্সা এবং রিক্সা চিত্রকে এই ঘোষণা করা হয়।
ইউনেস্কো সর্বশেষ ২০১৭ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুনন কৌশল-এর স্বীকৃতির পর দীর্ঘ ৫ বছর পর এ অর্জন।
আফ্রিকার বতসোয়ানার কাসান শহরে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ সংরক্ষণ বিষয়ক ২০০৩ কনভেনশনে এই স্বীকৃতি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
গত আট দশক ধরে চলা রিকশা চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে ঢাকার রিকশা ও রিকশা পেইন্টিং জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “এর ফলে গত আট দশক ধরে চলমান রিকশা চিত্রকর্ম একটি বৈশ্বিক ঐতিহ্য হিসাবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করল।”

ইউনেস্কো বলেছে, রিকশা যেহেতু ধীরগতির বাহন, সেহেতু এর সাজসজ্জা আর অলঙ্করণ সহজেই চলতি পথের যাত্রীদের নজরে আসে। এইভাবে রিকশা পরিণত হয়েছে এক চলমান প্রদর্শনীতে। চিত্রিত এই রিকশা যেন ঢাকার নগর জীবনেরই প্রতীক। প্রদর্শনী, উৎসব, এমনকি চলচ্চিত্রেও স্থান করে নিয়েছে এই শিল্পধারা।
রিকশা আর রিকশাচিত্রকে এখন বিবেচনা করা হয় এ শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ এবং আরবান ফোক আর্টের একটি ধারা হিসেবে।
১৯৩০ এর দশকের শেষভাগে ঢাকার সূত্রাপুর ও ওয়ারী এলাকায় বাহন হিসেবে রিকশার ব্যবহার শুরু হয়। তবে তখন ছিল মানুষে টানা রিকশার যুগ। ১৯৪৭এর দেশভাগের পর ঢাকাসহ দেশের শহরগুলোতে সাইকেল রিকশ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তখন থেকেই রিকশা পেইন্টিংয়ের শুরু।


অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের হাতে আঁকা এসব ‘আর্ট’ এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল তিন চাকার এই বাহনকে নানা রঙে সাজিয়ে যাত্রীদের আকৃষ্ট করা। তা পূরণ করতে রিকশার গায়ে সবচেয়ে বেশি আঁকা হয়েছে চলচ্চিত্র আর নায়ক নায়িকাদের ছবি। মুক্তিযুদ্ধ,আরব্য রজনীর গল্প, কাল্পনিক নগর, ফুল-পাখির নকশাও বাড়িয়েছে রিকশার শোভা।
ধীরে ধীরে এই রিকশাচিত্র হয়ে ওঠে শিল্পকর্মের আলাদা এক ধরন। ১৯৮৮ সালে লন্ডনে মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ডে ঢাকার রিকশা পেইন্টিং নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘ট্রাফিক আর্ট: রিকশা পেইন্টিং ফ্রম বাংলাদেশ’। জাপানের ফুকুয়োকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামেও বাংলাদেশের রিকশা পেইন্টিং নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে।
১৯৯৯ সালে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে প্রায় ছয়শ রিকশা ও বেবিট্যাক্সি পেইন্টারের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছিল। এখন ডিজিটাইল সাইন আর করপোরেট বিজ্ঞাপনের যুগে রিকশা পেইন্টারদের হাতে কাজ নেই। তবে চারুকলার প্রতিষ্ঠানিক শিল্পীদের কেউ কেউ রিকশাচিত্রকে অন্য ক্যানভাসে তুলে এনে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় এগিয়ে এসেছেন।


দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফল: বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রক দীর্ঘদিন ধরেই এই চিত্রের স্বীকৃতি আদায় করার জন্য চেষ্টা করছিল। গত ৬ বছর ধরে চিত্রকর্মের এই ধরার স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা চলে। প্রথম চেষ্টায় তা ব্যর্থ হয়। তবে ২০২২ সালে ফের নথি জমা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার পরে আবার নতুন করে নথি তৈরি করে তা জমা দেওয়া হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে এবং প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ নথিটি নতুনভাবে প্রস্তুত করা হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রক জানিয়েছে, গত আট দশক ধরে চলা রিকশা চিত্রকর্ম একটি বৈশ্বিক ঐতিহ্য হিসাবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে।
আগের স্বীকৃতি: এর আগে জামদানি, শীতলপাটি , বাউল গান ও মঙ্গল শোভাযাত্রা স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৮ সালে বাউল, ২০১৩ সালে জামদানি শাড়ি এবং ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর ‘স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের শীতলপাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।

Exit mobile version