সন্ধান২৪.কম : শুক্রবার (২০ নভেম্বর) রাতে র্যাব সদস্যরা অভিযান চালিয়ে রাজধানীর বাড্ডা থেকে ভূমি জালিয়াত চক্রের হোতা ও স্বর্ণ চোরাচালানি খ্যাত মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মনিরের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ৪ রাউন্ড গুলি, ৪ লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, ২ হাজার ৫শ সৌদি রিয়াল। ৫০১টি ইউএস ডলার। ৫শ চায়না ইয়েন, ৯২০ ইন্ডয়ান রুপি, ২.৮০.০০০ জাপানি ইয়েন। এছাড়া ৬শ ভরি স্বর্ণলঙ্কার ও নগদ এক কোটি ৯ লাখ টাকা। এছাড়াও তার আরও জানা-অজানা অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে- যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
র্যাব সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, সে সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। সে একটি ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক দলকে নিয়মিত অর্থ যোগান দিত। যার ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে বা প্রতিবাদ করতে সাহস পেত না।
পরে তার গাড়ি বিক্রি প্রতিষ্ঠানে অটোকার সিলেকশানে অভিযান চালানো হয়। তার বাসায় ২টি বিলাসবহুল প্রাডো গাড়ি পাওয়া গেছে। কিন্তু গাড়ি দুইটির মালিকানা সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেনি। এছাড়াও কার সিলেকশানে পাওয়া ৩টি গাড়ির কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেনি। তার বাসায় এবং কার সিলেকশানে রাজউক এবং ভূমি সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের ভুয়া সিলমোহর পাওয়া যায়। এগুলো ব্যবহার করে তিনি ভূমি আত্মসাতের জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করতেন বলে র্যাবকে জানিয়েছেন।
গোল্ডেন মনির ভূমি দস্যুতার মাধ্যমে অসংখ্য প্লটের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে শূন্য থেকে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গোল্ডেন মনির বলেছেন, সে নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর গাউসিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করতেন। এক পর্যায়ে রাজধানীর মৌচাক মার্কেটে ক্রোকারিজের দোকানে চাকরি নেন। এরপর এক লাগেজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর তিনি লাগেজ ব্যবসা শুরু করেন। তাদের ব্যবসার মূল রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত। প্রথমে সে কাপড়, কসমেটিকস, কম্পিউটার সামগ্রী, মোবাইল ও ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে লাগেজে আনা-নেয়া করত। লাগেজ ব্যবসার এক পর্যায়ে তিনি স্বর্ণচোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এরপর বায়তুল মোকাররমে উমা জুয়েলার্স নামে একটি জুয়েলারি দোকান দেন। যা তার চোরাচালানের কার্যক্রমকে সহায়তা করত। এক পর্যায়ে মনির হোসেন বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাকারবারি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। চোরাচালানের দায়ে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়।
ভূমি জালিয়াতি সম্পর্কে মনির র্যাবকে জানান, ২০০১ সালে তিনি তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েন। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতিও শুরু করেন। রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় রাজউকের ডিআইটি প্রজেক্টে অনেক প্লট প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নেন। রাজউক থেকে প্লট সংক্রান্ত সরকারি নথি চুরি করে এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের দাফতরিক সিলও ব্যবহার করে রাজউক পূর্বাচল, বাড্ডায়, নিকুঞ্জ, উত্তরায় এবং কেরানীগঞ্জে বিপুল সংখ্যক প্লট দখল করেন।
অভিযোগ আছে তিনি নামে-বেনামে দুই শতাধিক প্লটের অধিকারী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজের ৩০টির বেশি প্লট আছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। রাজউকের ৭০টি প্লটের নথি নিজ হেফাজতে রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এ ছাড়াও অনৈতিকভাবে দুনীতির আশ্রয় নিয়ে গোল্ডেন মনির বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করায় দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করবে বলে র্যাব জানিয়েছে।
জানা গেছে, সে অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য যুবলীগ থেকে বহিষ্কার হওয়া কয়েকজন ক্যাডারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানসহ একাধিক গ্রুপের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। এমনকি যুবলীগ নেতা মিল্কী হত্যা মামলার আসামিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। গ্রেফতার হওয়ার পর শনিবার (২১ নভেম্বর) অনেকেই ফোনে এ সব তথ্য জানিয়েছেন।
এ সম্পর্কে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, মনিরের চোরাচালানি চক্রে কারা জড়িত আছে তাদের র্যাব খুঁজছে।