পর্ব – এক
১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। দু’দিন আগে আমাদের জাহাজ ভিড়েছে জাপানের ইয়াকোহামা বন্দরে। আমি এই জাহাজে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী হিসেবে জয়েন করেছি মাস চারেক আগে। তখনও জাহাজী জীবনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি।
শ্রীলংকার ট্রিনকোমালি বন্দর থেকে অ্যানিম্যাল ফুড নিয়ে আমরা এসেছি জাপানের এই বন্দরে। চারদিকে শুধু সাদা বরফের চাদর। জীবনে প্রথম এই বরফের চাদর দেখা। জাহাজের পাটাতন সেই সাদাচাদরে মুড়ি দিয়ে রাতে ঘুমায়। ভোরবেলা নিশীথ সূর্যের দেশে সূর্য ওঠার সাথে সাথে সেই বরফ যখন ধীরে ধীরে গলতে থাকে তখন সেদিকে তাকিয়ে আর চোখ ফেরানো যায় না। সে এক অপরূপ দৃশ্যে! ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
আমাদের জাহাজটাকে বহির্নোঙর থেকে বন্দরের জেটিতে ভেড়ানোর জন্য এলেন এক বৃদ্ধ পাইলট। সাথে করে আনলেন ঝুড়ি ভর্তি আপেল,স্ট্রবেরি আর চকলেট।
জাহাজের পক্ষ থেকে তাকে আপ্যায়ন করার যথেষ্ট চেষ্টা হল। কিন্তু তিন মাথা নিচু করে অপারগতা প্রকাশ করলেন। ব্যাগ থেকে ছোট একটি পানির গ্লাস বের করে পানি ঢেলে তৃপ্তি সহকারে খেলেন। তারপর সবাইকে মাথা নিচু করে ধন্যবাদ জানিয়ে তার কাজে মনোনিবেশ করলেন।
ধারণা ছিল জাপানের মানুষ রাত দিন শুধু পরিশ্রম করে। এই পাইলটকে দেখে সেরকম কিছু মনে হলো না। আসলে তারা সব কিছুই করে যন্ত্রের মতো। ঘড়ির কাটা ধরে সকাল সাতটায় জাহাজে আসে। মাঝখানে ঘড়ির কাটায় এক ঘন্টা লাঞ্চ ব্রেক। পাঁচটায় ছুটি। তারপর বন্দরে আর কাউকে দেখা যায় না, থাকে না কোন সাড়া শব্দ।

জাহাজে আমার কাজ সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা। জাহাজের দ্বিতীয় নৌ প্রকৌশলী, যিনি মূলত জাহাজের যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগে প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নাম ফিরোজ কবির। মানুষ হিসেবে অমায়িক। তার উপরে একজন আছেন। তিনি প্রধান নৌ প্রকৌশলী, চিফ ইঞ্জিনযার। তার সাথে আমাদের সবার আলাদা একটি দূরত্ব।
সেদিনেই একবার তার কেবিনে গিয়ে কাচুমাচু করে বললাম, স্যার, বিকেলে একটু বাইরে যেতে চাই। জাহাজের শিক্ষানবিশ প্রকৌশলীদের এটাই নিয়ম। পারমিশন ছাড়া বাইরে বেরোনো যাবে না।
তিনি হেসে বললেন, বাইরে সন্ধ্যার পর বেশ ঠান্ডা পড়বে, তুমি বরং তিনটায় চলে যাও, সাতটার মধ্যে চলে আসো। যাওয়ার সময় গরম কাপড় নিয়ে যেও ঠিকমতো।
জাহাজের কঠিন এবং প্রতিকূল পরিবেশে জুনিয়ার এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের মাঝে একটা শ্রদ্ধা এবং স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক অনেক সময় আত্মীয়ের সীমানা পেরিয়ে যায়। বিশাল সাগরে ভাসতে ভাসতে হয়তো মনের পরিধি একসময় সাগরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়।
বিকেল তিনটার দিকে গরম কাপড় পরে সামান্য কিছু শুকনো খাবার ব্যাগে নিয়ে বের হলাম জেটি থেকে। হাঁটছি আর হাঁটছি। পরিষ্কার বিকেল। ঝকঝকে রোদ আর হালকা ঠান্ডা। হাঁটতে বেশ ভালো লাগছে। অনেকদিন জাহাজে থাকার পর বন্দরে বের হলে মাটির সংস্পর্শ আশীর্বাদের মতো মনে হয়।
রাস্তার দুপাশে নানা রঙ বেরঙের ফুল। সুন্দর সাজানো গোছানো। মনে হলো কেউ একজন এইমাত্র গাছগুলো ট্রিম করে গেছে I
জাপানে মূল রাস্তায় এভাবে কেউ হাঁটে না। আমি হঠাৎ দেখি একটা গাড়ি আমার পাশ ঘেষে যাচ্ছে। আমি রাস্তা থেকে একটু সরে ফুটপাতে চলে এলাম। কিন্তু গাড়িটা একেবারে আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। জানলার কাঁচ নামিয়ে একজন বয়স্ক মানুষ মাথা নিচু করে ভাঙা ইংরেজিতে কিছু বলার চেষ্টা করলো বিনীতভাবে। আমি তার কথা বুঝলাম। তিনি বলছেন, তুমি কোথায় যাচ্ছো? তুমি কি হারিয়ে গেছো? আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?
বিদেশে কারো সাথে দেখা হলে, কথা বলার সময়, বিশুদ্ধ ইংরেজিতে যে কয়েকটি বাক্য একসঙ্গে বলে ফেলি ঠিক সেটি আবার পুনরাবৃত্তি করলাম।
বললাম, জনাব, আমি একজন নাবিক। আমার জাহাজ এই বন্দরে এসেছে। আমি হেঁটে হেঁটে আপনাদের এই চমৎকার বন্দর শহরটিকে দেখার চেষ্টা করছি। আমাকে সাহায্য করতে চাওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ভদ্রলোক গাড়ি থেকে বের হয়ে আমার কাছাকাছি চলে এলেন।
বললেন, এখান থেকে খানিকটা দূরে চমৎকার একটি পার্ক আছে। আপনি চাইলে আমি আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিতে পারি। পার্কটি আমার যাওয়ার পথেই পড়ে।
রাজি হয়ে গেলাম। বললাম , আপনার অশেষ দয়া।
গাড়িতে উঠে যথারীতি সিটবেল্ট বাঁধতে ভুলে গেলাম I একেবারেই অভ্যস্ত নই।
একবার আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বিনয়ের সাথে হাসলেন। পরে নিজেই বেল্টটা লাগিয়ে দিলেন।
জাপানি জাতির কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। সে এক চরম বর্বরতা। মানব জাতিকে ধ্বংস করার কি উন্মাদনা! সেই অপকর্মের সাথে যুক্ত ছিলো এই জাপানি জাতি। এই মানুষটাকে দেখে, তার সৌজন্য দেখে আজ সেই বিভৎস ঘটনার কথা বিশ্বাস হতে চায় না। আমার পাশের যে মানুষটি বসে আছে তার হয়তো সে সময় জন্মই হয়নি। তার বাবা এই অপকর্মে ছিলেন কিনা জানিনা। এরা যে সারাক্ষণ মাথা নিচু করে চোখের দিকে না তাকিয়ে কথা বলে সেটা কি সেই অপরাধের অনুশোচনা থেকে? নাকি মানুষের চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই এদের? নিশ্চয়ই সে তাদের এই অপকর্মের ইতিহাস জানে? এই দুঃখ এবং অনুশোচনার ইতিহাস ভুলতে নিশ্চয়ই কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে ওদের।
জাতি হিসেবে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয় আমার। আমাদের এরকম কোন লজ্জা নেই, গ্লানি নেই। নেই কোনো অনুশোচনার ইতিহাস। সহায় সম্বলহীন একটি জাতির দেয়ালে পিঠ ঠেকার পর যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার গৌরব গাঁথা আছে আমাদের। যেটা হয়তো কয়েক শতাব্দী পরেও আমাদের পরবর্তীবংশধর মাথা উঁচু করে বলবে।
পার্কের কাছে এসে পড়েছি। ভদ্রলোক পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে দরজা খুলে নেমে এলেন।
আমি মাথা নিচু করে জাপানি কায়দায় বললাম, ডোমো অরিগাতো গুদাইমাসট, আনাটা নো চিনসেটসু নো টামে নি কোকো নি ক রারেমাশিতা। জনাব, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আপনার অশেষ দয়ায় আমি এখানে পৌঁছতে পারলাম I
নতুন কোন বন্দরে যাওয়ার পূর্বে সেদেশের দু’ একটি প্রয়োজনীয় কথা শেখার চেষ্টা করি। যেকোনো বিদেশির মুখে ভুল উচ্চারণে নিজেদের ভাষা শুনলে কার না ভালো লাগে। ( অসমাপ্ত, ২য় পর্ব আগামী কাল )