সন্ধান২৪.কমঃ হোটেল কর্মচারীরা ঘুমাতেন বরিশাল রেস্টুরেন্টের ভিতর কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি মুরগির খুপরি ঘরের মধ্যে । ঘরটির উচ্চতা চার ফুট। মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। পাশাপাশি ৬ জন কর্মচারি ঘুমিয়ে ছিলেন। এর আগে রবিবার রাত থেকে পরদিন সোমবার সকাল ৮ টা পর্যন্ত তারা রেস্টুরেন্টে ডিউটি করে মুরগির খুপরিতে ঘুমাতে যান। বেলা ১২ টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। খুপরি টাইপের ঘর থেকে তারা বের হওয়ার সময়ই পাননি। সেখানেই পুড়ে মারা যান। ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত রুবেলে বড় ভাই মো. আলী বাদী হয়ে ভবন মালিক রানা ও হোটেলের মালিক ফখর উদ্দিনকে আসামী করে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলায় ভবনের চার তলায় অবস্থিত ‘ঢাকা প্লাস্টিক’ কারখানার মালিক নজরুল ইসলামকে আসামী করা হয়নি।
এদিকে, নিহতদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে চারতলা ভবনটির মালিক রানা পলাতক রয়েছেন। প্লাস্টিক কারখানার মালিক নজরুল ইসলাম গা ঢাকা দিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত তাদেরকে আটক করা যায়নি।

নিচতলার হোটেল থেকেই আগুনের সূত্রপাত
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তদন্তে ওই ভবনের নিচতলার বরিশাল রেস্টুরেন্টে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। গতকাল ফায়ার সার্ভিসের তদন্তকারী একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বরিশাল রেস্টুরেন্টের প্রবেশ মুখেই ডান পাশে রান্নার চুল্লি। সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে প্লাস্টিক পাইপের মাধ্যমে হোটেলের আরেকটি চুলায় গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ওই চুলার বার্নারটি খুলে রাস্তায় পড়ে ছিল আর এই বার্নারের গোড়াতেই প্লাস্টিক পাইপ ঝুলতে দেখা যায়।
লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর
প্লাস্টিক কারখানা ও রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত বরিশাল রেস্টুরেন্টের ৬ কর্মীর লাশের ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা হলেন, ওহাব আলী ওসমান (২৫), বেলাল সরদার (৩৫), স্বপন সরকার (১৮), মোতালেব (১৬), শরীফ (১৬) ও রুবেল (২৮)। মর্গে স্বজনদের অপেক্ষা আর কান্নায় এক শোকের ছায়া নেমে আসে। ওহাব আলী ওসমানের লাশ গ্রহণ করেন তার ভাই সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পেছনে হোটেল মালিক ও ভবনের মালিকের অবহেলা রয়েছে। এটা একটা হত্যাকাণ্ড। হোটেলের ভিতরে কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি করা ঘরে কর্মচারীদের থাকতে দেওয়া হয়, এটা অমানবিক।

থানায় মামলা, হোটেল মালিক রিমান্ডে
প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করেছে ভুক্তভোগী এক স্বজনের পরিবার। সোমবার রাতে নিহত রুবেলের বড় ভাই মোহাম্মদ আলী বাদী হয়ে চকবাজার থানায় মামলা করেন। মঙ্গলবার সকালে অভিযান চালিয়ে বরিশাল রেস্টুরেন্টের মালিক ফখরুদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার এসআই রাজীব কুমার সরকার।
ভবন ও কারখানা মালিকের হদিস নেই
পুলিশ জানায়, ৩০, দেবিদাস ঘাট লেনের চারতলা ভবনের মালিক ৩১, রহমতগঞ্জ নিবাসী মোঃ আলম। আলমের মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে রানা ওই ভবনটি দেখাশুনা করেন। দলিলপত্রে ভবনটির মালিক মোঃ আলম। চার তলা ভবনের চতুর্থ তলা টিনশেড ঘর। দোতালা থেকে চার তলা পর্যন্ত টিন দিয়ে দেয়াল দেয়া। চতুর্থ তলার টিনশেড ঘরে ঢাকা প্লাস্টিক নামের কারখানা ও গোডাউন ভাড়া দেওয়া রয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে রানা ও নজরুল ইসলামের হদিস নেই।

জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা চলছে
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রেস্টুরেন্টের মালিক ফখর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করার তথ্য জানিয়ে পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জাফর আহমেদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কারো গাফলতি ছিল বা কী কারণে আগুন লেগেছে সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় যারা জড়িত থাকবেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা সহায়তা
আগুনের ঘটনায় নিহত ছয়জনের পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। মঙ্গলবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল আসলাম এ তথ্য জানান।
দায়ীদের শাস্তি দাবি
চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এ দাবি জানান। নেতারা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বার বার এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার বেলা ১২টার দিকে চকবাজারের দেবিদাস ঘাট লেনে চার তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৬ জন হোটেল কর্মী আগুনে নিহত হন।


