গাইবান্ধা প্রতিনিধি: ছয় বছরেও গাইবান্ধার তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার হয়নি বলে অভিযোগ করে বিভিন্ন আদিবাসী-বাঙালী ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, ‘২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের ঘটনার পর থেকে নির্যাতনের শিকার আদিবাসী সাঁওতালরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। গৃহহীন হয়ে তারা অসহায় দিনাতিপাত করছে। আহতরা চিকিৎসার অভাবে কেউ পঙ্গু, কেউ গুলির স্পিøন্টার শরীরে নিয়ে অসহ্য যন্ত্রনায় কর্মক্ষমতা হারিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। নভেম্বরের ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাসের বাণী শোনালেও তার কোনটিই আজও বাস্তবায়ন হয়নি।’

রোববার (০৬ নভেম্বর) দুপুরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটামোড় এলাকায় সাঁওতাল দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সাঁওতাল হত্যার বিচার, আসামিদের গ্রেপ্তার, গুলিতে আহত সাঁওতাল, বাড়ীঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের ক্ষতিপূরণ ও সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড নির্মাণ বন্ধের দাবি জানিয়ে সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘যে কোন এলাকার উন্নয়নে ইপিজেড স্থাপন সেই এলাকার মানুষের জন্য অবশ্যই সুখের খবর। কিন্তু সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের বাপ-দাদার জমিতে সেখানকার ওয়ারিশগণের সাথে কোন ধরনের স্বাধীন, পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়াই ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণা আদিবাসী-বাঙালি জনগণকে হতাশ করেছে।’

রোববার সকাল থেকে নানান আয়োজনে গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল হত্যা দিবস পালিত হয়েছে। সকাল আটটায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জয়পুর গ্রামে নির্মিত অস্থায়ী শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোমবাতি প্রজ্জ্বালন করা হয়। সকাল নয়টায় সাঁওতালপল্লি মাদারপুর ও জয়পুর গ্রাম থেকে তির-ধনুক, ব্যানার, বিভিন্ন দাবিদাওয়া সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে একটি শোক মিছিল বের হয়। মিছিলটি ১০ কিলোমিটার পথ প্রদক্ষিণ করে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের কাটামোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের শুরুতে শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রতিবাদী সংগীত পরিবেশিত হয়।
তিন সাঁওতাল হত্যা, সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমিতে তোলা বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগের বিচারের দাবিতে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জনউদ্যোগ, আদিবাসী-বাঙালী সংহতি পরিষদ, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও কাপেং ফাউ-েশন যৌথভাবে এসব কর্মসূচি পালন করে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে। বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, এএলআরডির প্রধান নির্বাহী ভূমি অধিকার কর্মী শামসুল হুদা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সভাপতিম-লীর সদস্য কাজল দেবনাথ, জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মারুফ মনা, আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু,ম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রফিক আহম্মেদ সিরাজী, নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের সদস্যসচিব প্রবীর চক্রবর্তী, আদিবাসী নেতা এ্যাড. প্রভাত টুডু, সদর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবীর তনু, আদিবাসী নেতা সুফল হেমব্রম, প্রিসিলা মুর্মু, সন্ধ্যা মালো, গৌড়চন্দ্র পাহাড়ী, স্বপন শেখ প্রমুখ।
বক্তারা বাগদা ফার্মের তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড স্থাপনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে জেলার অনত্র করা, চাষাবাদরত সাঁওতাল-বাঙালিদের সেচ সুবিধার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনসহ সাত দফা বাস্তবায়নের দাবি করেন।
এরআগে গত শনিবার (৫ নভেম্বর) সাঁওতাল হত্যা দিবসের ষষ্ঠ বার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচীর প্রথম দিন গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার সামনে যৌথভাবে সমাবেশ করে আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ, সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ ও জনউদ্যোগ। সমাবেশ শেষে সাঁওতাল হত্যা দিবস উপলক্ষে শোকর্যালি বের করা হয়। দাবি-দাওয়া সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন ও কালো পতাকা হাতে পাঁচ শতাধিক সাঁওতাল-বাঙালি শোক র্যালিতে অংশ নেন। এতে সাঁওতালরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে তীর-ধনুক ও বাদ্যযন্ত্রসহ তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি তুলে ধরেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ পুলিশ সদস্য তিরবিদ্ধ ও ৪ সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে তিন সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ মারা যান। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই বসতি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এসব ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুরমু বাদি হয়ে ওই বছরের ১৬ নভেম্বর ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করেন। ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদি হয়ে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আরেকটি মামলা করেন।
পরে হাইকোর্ট মামলা দুটি এক করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) গাইবান্ধা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সাঁওতাল হত্যা মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জমা দেন। এই মামলার গুরত্বপূর্ণ ১১ আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
একই সালের ৪ সেপ্টেম্বর মামলার বাদি থোমাস হেমব্রম অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি পিটিশন দেন। আদালত শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক পার্থ ভদ্র অধিকতর তদন্ত করতে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। সিআইডি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর আদালতে একই ধরনের অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি বাদি থোমাস হেমব্রম পুনরায় নারাজি দেন। এই নারাজির ওপর বেশ কয়েক দফা শুনানি শেষে আগামী বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি আদেশ প্রদানের দিন ধার্য করেন আদালত।
বাদিপক্ষের আইনজীবী ও জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি নারাজি শুনানির ওপর আদেশ হওয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, পিবিআই ও সিআইডি উভয় কর্তৃপক্ষ মূল আসামিসহ ১১ জনকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ফলে সাঁওতালরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।


