সন্ধান২৪.কমঃ হরতাল ডেকে গতকাল হেফাজতের নেতাকর্মীরা সরকারি অফিস, উপজেলা পরিষদ, থানা ভবন, পুলিশ ফাঁড়ি, রেল স্টেশন, রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িঘর, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় ও অগ্নিসংযোগ করে।পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর আক্রমন চালায় হরতালকারীরা। কোথাও কোথাও পুলিশ বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ২ জন নিহত হয়।
কঠোর হুঁশিয়ারি : গতকাল সচিবালয়ে স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেছেন, হরতালে জানমাল রক্ষার্থে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাশকতার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। হেফাজতের পেছন থেকে অন্য কেউ উসকানি দিচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. শরীফ মাহমুদ অপু স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সব ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। অন্যথায় জনগণের জানমাল ও সম্পদ রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।
দেশের বেশিরভাগ এলাকায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল, হরতাল পালিত হয়নি। কিন্তু বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে হেফাজতের নাশকতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কে অবস্থান নিয়ে পুলিশ ও সাংবাদিকেদের ওপর হামলা চালায় হরতালকারীরা। হবিগঞ্জ আজমিরীগঞ্জে মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করে হেফাজতের কর্মীরা। এ সময় থানার ওসি পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। হামলায় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর এবং দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় হরতালকারীরা।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবস্থান নেয় হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এ সময় হেফাজতের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ-বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ঢাকায় পল্টন, লালবাগ, উত্তরা, মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে হেফাজত ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় উভয় পক্ষকেই ইট-পাটকেল ছুড়তে দেখা গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : গতকাল হেফাজতের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনকালে বিক্ষুব্ধ হরতালকারীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্নস্থানে সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ অফিস, আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয় ও বাড়িঘরে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। এ সময় আলামিন (২০), আশিক (৩৫) নামে ২ জন নিহত হয়েছে। এ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত তিন দিনে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০-এ। শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

গতকাল হেফাজতের সশস্ত্র কর্মীরা শহরের হালদারপাড়াস্থ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, জেলা পরিষদ কার্যালয়, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহীর গাড়িসহ ৩টি মোটরসাইকেল, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, পৌরসভা ভবন, পৌরসভা গ্যারেজের ৩টি গাড়ি, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বর, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয়, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা গণগ্রন্থাগার, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন, সদর উপজেলা ভূমি অফিস, আশুগঞ্জ টোলপ্লাজার বুথে আগুন দিয়। এছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের বাসভবন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদত হোসেন শোভনের বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। শহরের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরে জেলা প্রশাসনের উন্নয়ন মেলার ৩২টি স্টলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব, ব্যাংক অব এশিয়া, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপ্লেক্স, শহরের আনন্দময়ী কালীবাড়ির মন্দির, বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ভূইয়ার নিজস্ব অফিস, বিজয়নগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাসিমা মুকাই আলীর শহরের হালদারপাড়াস্থ বাসভবন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, দলিল লেখক সমিতি, ঠিকাদার খাইরুল আলমের বাসভবনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। হামলা চলাকালীন শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যকে দেখা যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ : গতকাল সকাল-সন্ধ্যা ডাকা হরতালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে হেফাজতের কর্মী-সমর্থকরা। বাস, ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহন এবং সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে তারা। এ সময় সামনে যা পাওয়া গেছে তাতে নির্বিচারে ভাঙচুর চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে লাঠিসোটা, ঢিল হাতে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ায় হেফাজতের পিকেটাররা। এতে জেলা পুলিশ সুপার, সাংবাদিকসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। দিনভর সংবাদকর্মীদের প্রতি মারমুখী আচরণ ছিল হেফাজত কর্মীদের।
নারায়ণগঞ্জে ফজরের নামাজের পর পরই নগরীর ডিআইটির রেলওয়ে জামে মসজিদে জড়ো হয় হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। তবে পুলিশের বাধার কারণে মিছিল করতে পারেনি তারা। মসজিদের বাইরে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলেই বিজিবি ও পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। সকাল সাতটা দিকে হেফাজতের অপর একটি দল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল মোড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত অবস্থান নেয়। এ সময় ডাচ বাংলা ব্যাংকের মোড়, মৌচাক মোড়সহ কয়েকটি পয়েন্টে টায়ার, কাঠের পুরোনো চকি, বাঁশসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তায় অবরোধ তৈরি করে। বেলা সাড়ে দশটা পর্যন্ত ছোট ছোট দলে বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসাছাত্রকে সাইনবোর্ড, মৌচাক পয়েন্টে এসে জড়ো হতে দেখা গেছে সড়কে অগ্নিসংযোগ করে। এর ফলে মহাসড়কের একপাশ দিয়ে কিছু যানবাহন চলাচল শুরু করলে তাতে ভাঙচুর চালায় হেফাজতের কর্মীরা। এ সময় বেশ কয়েকটি কাভার্ডভ্যান, ট্রাক ও বাস ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করার সময় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা চালায় হেফাজত কর্মীরা। এতে দৈনিক সংবাদের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সৌরভ হোসেন সিয়ামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অন্তত সাতজন সংবাদকর্মীকে মারধর, গাড়ি ভাঙচুর ও মুঠোফোন কেড়ে নেয় পিকেটাররা।

সিলেট : সকালে হেফাজতের নেতাকর্মীরা সড়কে অবস্থান নেয়। আর দুপুরের দিকে নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করার চেষ্টা করে ছাত্রশিবির। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে আহত হয়েছেন ৫ জন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৫ জনকে আটক করেছে।
নোয়াখালী : হেফাজতের ডাকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ৮টি সিএনজি, ২টি হোন্ডা ভাঙচুর চালায় হেফাজত কর্মীরা। এ সময় নোয়াখালী-ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রাস্তায় বাঁশ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এখানেও কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
মুন্সীগঞ্জ : সিরাজদীখানে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে হেফাজত কর্মীরা। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ৪টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। হামলায় সিরাজদিখান থানার ওসি এসএম জালাল উদ্দীন, এসআই সেকান্দর আলী, এসআই রাজু আহমেদসহ ১০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। আহত হেফাজতের নায়েবে আমির আ. হামিদকে ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতালে ও থানার ওসি এসএম জালালউদ্দিনকে ঢাকার স্কায়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল সকালে হেফাজত কর্মীরা ঢাকা-মাওয়া সড়ক অবরোধ করতে চাইলে উপজেলার নিমতলা-রাজানগর সড়কের শিকারপুর এলাকায় পুলিশ বাধা দেয়। এক পর্যায়ে হেফাজত নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল ও ২০০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। হেফাজত নেতাকর্মীরা রাজানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির বাড়িসহ ৭টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ ভাঙচুর করে।
রাজশাহী ঃ সকালে নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় ট্রাক টার্মিনালের ভেতরে রাখা দুটি বিআরটিসি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
কিশোরগঞ্জ ঃ দুপুরের দিকে শহীদী মসজিদের সমানে থেকে হেফাজতের কর্মীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণের সময় হঠাৎ লাঠিসোঁটা নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা চালান। তাঁরা কার্যালয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেন। কার্যালয়ের আসবাব ভাঙচুর করা হয়। মারধর করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বকুলসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে।
সিলেট ঃ নগরের কোর্ট পয়েন্ট দুপুরে হেফাজত ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তিন দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই ছাত্রলীগ কর্মীসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। সিলেট থেকে ছেড়ে যায়নি দূরপাল্লার কোনো বাস।
চট্টগ্রাম ঃ নগরের পাশের উপজেলা হাটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম (বড় মাদরাসা) মাদরাসা ও আশপাশের সড়ক, রেলপথ এলাকায় হরতাল সমর্থকরা সক্রিয় ছিল। তবে কর্মসূচি শুরুর আগে শনিবার রাতে হাটহাজারী বড় মাদরাসার বিপরীতে উপজেলা ডাকবাংলোয় আগুন দিয়েছেন হেফাজত নেতাকর্মীরা। পুলিশ জানায়, আগুনে দুটি মোটরসাইকেল পুড়ে যাওয়াসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নোয়াখালীঃ হেফাজতের হরতালের মিছিল থেকে চৌমুহনী চৌরাস্তায় নোয়াখালী টিভি সাংবাদিক ফোরামের কার্যালয় ও দোকানপাটে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় একাত্তর টিভি ও জাগো নিউজের নোয়াখালী প্রতিনিধি মিজানুর রহমান, বাংলা টিভির নোয়াখালী প্রতিনিধি ইয়াকুব নবী ইমনসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী আহত হন।
নরসিংদী ঃ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জেলখানা মোড়ে অবরোধ করেন হেফাজতকর্মীরা।


