বই ॥ জীবন জাগে ধমনিতে ।। সুমনা সরকার

বই ॥ জীবন জাগে ধমনিতে

।। সু ম না   স র কা র ।।

মোহাম্মদ নাসেরের পরিবার, ছাত্র এবং কমিউনিস্ট পার্টির কিছু নেতার সহযোগিতায় তাঁর মৃত্যুর পর ২০২০ সালের বই মেলাতে স্বদেশ সমাজ শিক্ষা : জীবন জাগে ধমনিতে বইটি প্রকাশ করে জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী। এক. স্বদেশ ভাবনা; দুই. রাজনীতি ও সংস্কৃতি; তিন. ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা; চার. শিক্ষা সঙ্কট ও উত্তরণ; পাঁচ. মাতৃভাষা ও বিজ্ঞানÑ এমন ৫টি ধারায় তাঁর মোট ২৬টি প্রবন্ধ এবং একটি স্মৃতিকথা নিয়ে ২৮৮ পৃষ্ঠার এই বইটি। প্রবন্ধগুলোর বিন্যাসে যদিও লেখকের কোন হাত ছিল না। কিন্তু পাঁচটি ধারার অন্তর্গত ছাব্বিশটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু মোহাম্মদ নাসেরের চিন্তামনন ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই উপস্থাপন করে। অধ্যাপক নাসেরের প্রবন্ধগুলো হয়ত অত সুখপাঠ্য নয় কিন্ত তাঁর প্রবন্ধগুলো ভাবতে- ভাবতে পড়তে হয়, আবার পড়তে-পড়তে থমকে ভাবতে হয়। এক টানে পড়ে ফেলা যায় না। তিনি তাঁর লেখাকে আকর্ষণীয় বা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সময় ব্যয় করতে চাননি, নাসেরের সকল মনোযোগই ছিল বক্তব্য প্রকাশে। যারা তাঁকে চেনেন তাঁরা জানেন যে, তিনি আপাদমস্তক একজন গণিতের মানুষ। গণিতে যেমন কোন ভান- ভনিতা ছাড়াই এক লাইনের সূত্রে অনেক প্রয়োগ, সম্ভাবনা, নির্দেশের কথা থাকে তেমনি, নাসেরের লেখাতেও আমরা দেখি কোন প্রকার ভূমিকা বা আবেগের অতিশয়োক্তি নেই, সরাসরি দৃঢ় প্রত্যয়ে দৃপ্ত ঢংয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য জানিয়ে দেন। এর কারণ, নাসের প্রচ- মাত্রায় জ্ঞানযোগী এবং একইসঙ্গে কর্মযোগী। পেশাগত জীবন বা একাডেমিক পরিসরে পরিসংখ্যানে গণিতের প্রয়োগ সাবলীল বা স্বচ্ছন্দভাবে দেখানো ব্যক্তি চরম সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই সমাজ-রাজনীতির জন্য কলম তুলে নেন। যদিও তিনি বাংলাদেশের সমাজকে এদেশের প্রথিতযশা সমাজবিজ্ঞানীর মতো করেই পড়তে পারতেন। তবু তিনি এই প্রবন্ধগুলো লিখতে খুব একটা আরামবোধ করতেন না। জীবনের শেষদিকে তিনি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা রাখতে পারছিলেন না। বিশেষ করে, এদেশের বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্বে অবহেলা, কর্মপন্থা ঠিক করতে না পারার ব্যর্থতা এবং প্রকৃত শত্রু-মিত্র চেনার অক্ষমতাই নাসেরকে সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে লিখতে বাধ্য করেছে। মোহাম্মদ নাসেরের প্রবন্ধের ব্যাপক ও বিশিষ্ট এলাকা হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চিত্র তুলে ধরা এবং বামপন্থীদের করণীয় ঠিক করে দেয়া। তিনি মনে করতেন, বাম দলগুলো এবং উদার নৈতিকতাবাদী দল যেমন আওয়ামীসহ অন্যান্য দলের ব্যর্থতার জন্য এদেশের রাজনীতি-সংস্কৃতি ক্রমশ উৎপাদনবিযুক্ত, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির কমিশন ভোগসর্বস্ব বাদীদের দখলে চলে গেছে। যার কারণে দেশ আজ মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাক্সক্ষা থেকে শত সহস্র হাত দূরে। মুক্তিযুদ্ধের ভূলুণ্ঠিত চেতনা পুনরুদ্ধারে তিনি রণেশ দাশগুপ্ত, তাজউদ্দীনের এবং সত্যেন সেনকে বিস্মৃতির গহ্বর থেকে উদ্ধারের আহহ্বান জানিয়েছেন বারং বার।

মোহাম্মদ নাসেরের আর একটি চিন্তার জায়গা হলো শিক্ষা। তিনি নিজে মারাত্মক সিরিয়াস শিক্ষক এবং অধ্যাবসায়ী গবেষক ছিলেন। যার কারণে তিনি আমাদের শিক্ষার গোড়ায় গলদটি শনাক্ত করে বয়ান করেন। তত্ত  ও ব্যবহারিকের বিচ্ছিন্নতা কেমন করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে পঙ্গু করে ফেলছে; এই বিচ্ছিন্নতার জন্যই একজন মেডিক্যাল, বুয়েটের ছাত্র উন্নাসিক এবং অন্য বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা করতে উৎসাহিত হচ্ছে। নাসের প্রচন্ড আশাবাদী মানুষ ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন এ দেশে ‘পূর্ণাঙ্গ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়’ হওয়ানো সম্ভব যদি এ রাষ্ট্র থেকে গণতন্ত্রহীনতা- দারিদ্র্যতা-কালোটাকা-মুৎসুদ্দি পুঁজি-ধর্মান্ধতার মূল উৎপাটন করা যায়।

অসম্ভব স্বাপ্নিক এবং তাঁর গতিশীলতার বিশেষ রূপটি ফুটে উঠেছে এই গ্রন্থের সর্বশেষ ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা’ শীর্ষক ধারায় গ্রন্থিত দুটি প্রবন্ধে-‘জগদীশচন্দ্র বসু: এক অনাদৃত আলোকিত ঐতিহ্য’ ও ‘ উন্নয়ন, মাতৃভাষা ও সত্যেন বসু’।

বস্তুত, মোহাম্মদ নাসেরের মেধা-মনন, শিক্ষকতা, গবেষণা এবং সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীর অভিজ্ঞতার বহুমুখিতাই আমরা এই গ্রন্থে পাই। সবচেয়ে বেশি পাই, ‘একজন জ্ঞানবীর ও কর্মবীরের যুগল সত্তা’কে। অন্যের ভাবনাকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করেননি তিনি কখনই। তিনি সব সময়ই নিজের ভাবনাÑচিন্তাকে নিজের ভাষাতেই রূপ দিয়েছেন। এখানেই নাসেরের স্বকীয়তা এবং সার্থকতা।

বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই লেখকের স্বদেশ সমাজ শিক্ষা : জীবন জাগে ধমনিতে বইটি বাংলাদেশের সমাজের গতি-প্রকৃতি বুঝতে ও বাম রাজনীতির কর্মপন্থ’ ঠিক করতে প্রবলভাবে সাহায্য করবে।

 

 

Exit mobile version