সন্ধান২৪.কম ডেস্ক : ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির প্রয়াণে বিশ্বের গুরত্বর্পূণ ব্যক্তিরা প্রণব প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মন্তব্য করেছেন। কে কি মন্তব্য করেছেন তা তুলে ধরা হলো-
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী- ‘‘২০১৪-য় আমি দিল্লিতে নতুন এসেছিলাম। প্রথম দিন থেকেই ওঁর পরামর্শ, সাহায্য ও আশীর্বাদ পেয়েছি। ওঁর সঙ্গে আলাপচারিতা চিরকাল মনে থাকবে। কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে প্রণব মুখোপাধ্যায় অর্থনৈতিক ও রণকৌশলগত মন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছেন। দুর্দান্ত সাংসদ ছিলেন। সব সময় প্রস্তুতি নিয়ে রাখতেন। সুবক্তা এবং রসবোধও ছিল। রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি ভবনকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও খুলে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ভবনকে শিক্ষা, উদ্ভাবনা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র করে তুলেছিলেন।’’
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহম্মদ আব্দুল হামিদ-,“১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত তৈরিতে তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।”
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা – ‘বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন রাজনীতিবিদ ও আমাদের পরম সুহৃদ হিসেবে প্রণব মুখার্জির অনন্য অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়। আমি সব সময় মুক্তিযুদ্ধে তঁার অসামান্য অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতে নির্বাসিত থাকাকালে প্রণব মুখার্জি আমাদের সব সময় সহযোগিতা করেছেন। এমন দুঃসময়ে তিনি আমার পরিবারের খেঁাজখবর রাখতেন এবং যে–কোনও প্রয়োজনে আমার ছোট বোন শেখ রেহানা ও আমাদের পাশে এসে দঁাড়িয়েছেন। দেশে ফেরার পরও প্রণব মুখার্জি সহযোগিতা এবং উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক ও পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। যে–কোনও সঙ্কটে তিনি সাহস জুগিয়েছেন।’
‘প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারাল একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে, আর বাংলাদেশ হারাল এক আপনজনকে। তিনি উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।’
কংগ্রেস নেতা, প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম-, ‘‘আমি ওঁর সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছি। বিশেষ করে ২০০৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করেছি। অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তি ছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি ছিল। অর্থনীতির বিষয়, সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত বিষয় গভীর ভাবে বুঝতেন। কংগ্রেসে আমাদের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। উনি এমন এক বিরল ব্যক্তি ছিলেন যে সব বিষয়েই ছাপ রেখে যেতেন।’’
প্রণব-কন্যা শর্মিষ্ঠা- ‘‘সবারে আমি প্রণাম করে যাই। বাবা, তোমার প্রিয় কবিকে উদ্ধৃত করেই সকলকে তোমার শেষ বিদায় জানাচ্ছি। দেশের, দেশের মানুষের সেবায় তুমি সার্থক জীবন কাটিয়েছ। আমি তোমার মেয়ে হিসেবে জন্ম নিয়েছি বলে আশীর্বাদধন্য।’’
পশ্চীম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপ্যাধায় – ‘হৃদয়ের উষ্ণতাই বা ভুলি কী করে! তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে শপথে আমি যাতে থাকি, তাই বিশেষ বিমান পাঠিয়েছিলেন যাতায়াতের। সংসদের সেন্ট্রাল হলে একদম পিছনে বসেছিলাম। শপথ সেরে আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা সহকারে বেরোচ্ছিলেন যখন, আবেগে ডেকে ফেললাম, ‘‘প্রণবদা…!’’ মাননীয় রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেন, ‘‘কোথায় ছিলি তুই? দেখতেই পেলাম না!’’ মন বলছে, আর তো কোনও দিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে না, প্রণবদা! অসুস্থ হওয়ার আগের সপ্তাহেও ফোন করেছিলাম। বললেন, ‘‘ভাল লাগে না রে! কোনও কাজ নেই।’’ বলেছিলাম, ‘‘লিখুন, পড়ুন। আপনি তো লেখাপড়া করতে ভালবাসেন।’’ শুনে হেসেছিলেন শুধু।সেটাই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা। ফোনে শোনা হাসিটুকু থাক স্মৃতি হয়ে।
সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ আবুল হাসনাত খান – ২০০৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে যাঁকে হারিয়ে জঙ্গিপুরে জয়ী হয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়, তার গলাতেও স্পষ্ট হাহাকার। বলছেন, ‘‘নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মোড়া জীবন, তার পরেও করোনা হল? কিছুতেই মানতে পারছি না। আমার এখনও মনে আছে, সে বার জয়ী হয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘‘দেখলে তো হাসনাত, হারিয়ে দিলাম তোমায়!’’ সাগরদিঘির অবসরপ্রাপ্ত বামমনস্ক শিক্ষক জাটু মার্ডির গলাতেও সেই আক্ষেপ, ‘‘বামপন্থী ঘাঁটিতে ফাটল ধরিয়ে জঙ্গিপুরে ঠিক নিজের একটা পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছিলেন প্রণববাবু। সাগরদিঘির বহু আকাঙ্ক্ষিত কলেজ গড়ে দিয়েছিলেন।’’ সেই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জঙ্গিপুরের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক সিদ্ধেশ্বর পাহাড়িকে। তিনি বলছেন, ‘‘অবসর নিয়েছি, কিন্তু কলেজভবনের পাশ দিয়ে গেলেই সেই দিনটার কথা মনে পড়ে। তখন তিনি অর্থমন্ত্রী। সব ব্যস্ততা ঠেলে কলেজে এসে মিনিট পঁয়তাল্লিশের একটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাস নিয়েছিলেন। ছেলেমেয়েরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল।’’
কীর্ণাহারের প্রাক্তন স্বাস্থ্যকর্মী, কংগ্রেস নেতা রবি চট্টোরাজ –দাদা নারকেল নাড়ু খুব পছন্দ করতেন। নিয়ে গেলে খুব খুশি হতেন। অবাক হতাম, যে মানুষটা চাইলে দুনিয়ার ভাল ভাল খাবার নিমেষে হাজির হয়ে যাবে, সেই তিনি নারকেল নাড়ু খেয়ে কী খুশি! প্রণববাবুর অনেক উত্থানপতনের সাক্ষী থেকেছি। উত্থানে যেমন উচ্ছ্বাস দেখিনি, তেমনই পতনে খুব একটা মুষড়ে পড়েননি। স্ত্রী-বিয়োগের পরে শূন্যতা সৃষ্টি হলেও বাইরে থেকে বোঝার কোনও উপায় ছিল না। প্রতি বারের মতো গত বার পুজোয় এসেও সবাইকে শুভকামনা জানিয়েছিলেন। গত বছর জন্মাষ্টমীর দিনেই তাঁর ১০ নম্বর রাজাজি মার্গের বাড়িতে প্রসাদ খেয়ে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে এসেছি।
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের লক্ষ্মীনারায়ণ মণ্ডল – ‘মামাবাবু’ নেই— ভাবতেই পারছেন না প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির দীর্ঘদিনের গৃহকর্মী সাদেশ্বরী কোনাই। ৫৫ বছর ধরে ওই বাড়িতে কাজ করছেন তিনি। সোমবার সন্ধ্যায় মিরিটিতে প্রণববাবুর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘প্রতি বার পুজোয় এসে ডেকে খোঁজখবর নিতেন, কেমন আছি। অসুস্থ হওয়ার খবর শোনার পর থেকেই দু’বেলা ঠাকুরকে ডেকেছি। ভাবতেই পারছি না, সেই মানুষটা আর নেই।’’সে দিন ‘গ্র্যান্ড-টি’-র আয়োজন হয়েছিল কলেজের অধ্যক্ষের ঘরে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় সেখানে এলেন। সকলেই শশব্যস্ত। আমার চেয়ারেই ওঁর বসার ব্যবস্থা হয়েছিল। সেটা দেখিয়ে জানতে চাইলেন, এটা কার চেয়ার। ওঁকে বলা হল চেয়ারটি অধ্যক্ষের। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুরোধ করলেন, চেয়ার বদলে দেওয়ার জন্য। ভাবা যায়, দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েও নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুর আসনটিকে সম্মান জানাতে ভোলেননি! এটাই শিক্ষা, পরম্পরা। যা আমি আজও ভুলিনি।
বিজেপির প্রবীন নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী – ব্যক্তিগত ভাবে তিনি আমার কাছে এক জন সতীর্থের চেয়েও বেশি ছিলেন। সেই মিত্রতার রেশ আমাদের দু’জনের পরিবারের উপরেও পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে আমরা যে একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন করেছিলাম তা আমার হৃদয়ে বিশেষ স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রণবদা হাসপাতালে ছিলেন। সকলেই আশা করেছিলাম যে উনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তাঁর মৃত্যু এ দেশের জন্য বড় ক্ষতি। আমি এক জন বন্ধু হারালাম। শর্মিষ্ঠা, অভিজিৎ ও ইন্দ্রজিৎ-সহ পরিবারের সকল সদস্যের উদ্দেশে আমার সমবেদনা রইল।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক (মার্কসবাদী), সীতারাম ইয়েচুরি – বাজপেয়ী সরকারের আমলে ওঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মেশার সুযোগ হয়। ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনে এনডিএ সরকারকে হারাতে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ দলকে এককাট্টা করার কাজের সূত্রে। সে বার লোকসভার সঙ্গেই ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনায় প্রণবদা কংগ্রেসের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। এ রকমই একটা বৈঠকের সময়ে এক দিন হঠাৎ এক পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে ওঁর লোকসভা ভোটে লড়া ঠিক হবে কি না, তা নিয়ে আমার মতামত চাইলেন। তার আগে উনি কখনও লোকসভায় সাংসদ হিসেবে জিতে আসেননি। মনে আছে, প্রথমটায় কিছু বলতে চাইনি। ওঁর মতো কাউকে এ বিষয়ে উপদেশ দেওয়াটা ঠিক হবে না বলে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। উনি কিন্তু জোর করলেন। বললাম, জেতার ব্যাপারে নিশ্চিত হলে তবেই লড়ুন। সে বারের ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিজেপি-কে হারাতে আমরা সবাই মিলে কাজ করছিলাম। প্রণবদা হারলে ভুল বার্তা যেত।
বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, ‘‘বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের প্রতি প্রয়াত প্রণববাবুর ছিল সুগভীর অনুরাগ। দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’’ শোকবার্তা পাঠিয়েছে বিএনপিও। বলা হয়েছে, ‘‘প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলাদেশের জনগণ ও বিএনপি-ও সমব্যথী। তিনি ছিলেন উপ-মহাদেশের এক জন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ।’’
