মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)
সন্ধান২৪.কম ডেস্ক : ঘটনাটি ২০০৮ সালের। প্রথমে মাত্র দুই জোড়া (চারটি) সাদা বক এসে বাসা বাধে আ. মান্নান হাওলাদারের বাড়ির একটি মেহগনি গাছে। এক যুগের ব্যবধানে হলুদ ঠোঁট আর কালো পায়ের ধব ধবে সাদা সেই দুই জোড়া বকের বংশ বিস্তারে এখন হয়েছে সহস্রাধিক। ওই বাড়িটি এখন বক বাড়ি হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। বক বাড়িটি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন সাউথখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ তাফালবাড়ি গ্রামে।
বিষয়টি কিছুটা হলেও রহস্যঘেরা! তার কারণ, যে গ্রামে বকের নিবাস, সেটি সুন্দরবন থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে। এলাবাসীর প্রশ্ন, এতো কাছাকাছি বিশাল সুন্দরবন থাকতে কেন বকগুলো একটি গ্রামে এসে বাসা বাঁধল?

এই প্রশ্নে উত্তর জানতে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর এমএ আজিজের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাদা বক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। এরা একেকটি এলাকায় কলোনি তৈরি করে বসবাস করতে পছন্দ করে। এরা সারা বছর একই এলাকাতে থাকে না। বছরের কিছু সময় অন্য এলাকায় চলে যায়। বর্ষা শুরুর আগে প্রজননের সময় হলে এরা আবার পূর্বের এলাকায় ফিরে আসে। নতুন বাসা বাঁধে আবার পুরনো বাসাতেও ডিমি পাড়ে। বাচ্চা বড় হলে চলে যায়।
রবিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সরেজমিনে বক বাড়ির মালিক আ. মান্নান হাওলাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর ২০০৮ সালের মে মাসে প্রথমে দুই জোড়া সাদা বক তার বাড়ির একটি হেমগনি গাছে এসে বাসা বাঁধে। এরপর প্রতি বছরই ধীরে ধীরে বক বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে এখন এক হাজারেরও বেশি বক হয়েছে। তার বাড়ির ৪০-৫০টি মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছে কয়েক শ বাসা বানিয়ে তারা বসবাস করছে।
আ. মান্নান জানান, প্রতিবছর বৈশাখ মাস পড়লেই বকগুলো আসা শুরু করে। থাকে আশ্বিন-কার্তিক মাস পর্যন্ত। বাচ্চা বড় না হওয়া পর্যন্ত এরা এখানেই থাকে। বাকি পাঁচ-ছয় কোথায় যে চলে যায় তা জানেন না। এ বছরও প্রায় দুই শ থেকে আড়াই শ বাচ্চা হয়েছে। অনেক বাচ্ছা বড় হয়ে গেছে। এক ডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে যেতে পারে এখনো এমন বাচ্চা রয়েছে এক-দেড় শ। প্রতিদিন ভোরবেলা বকগুলো খাবারের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। এমনকি সুন্দরবনের যেসমস্ত চরে জেলেরা চরগড়া জাল পাতে, সেসব চরে পড়ে থাকা ছোট মাছ খেতেও চলে যায় বকগুলো। বিকেল চারটা-পাঁচটার দিকে আবার তারা বাসায় ফিরতে শুরু করে।
আ. মান্নান আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, বকগুলো আমার বাড়ি আশ্রয় নেওয়াতে আমি খুবই খুশি। আমার বাড়িটি এখন বক বাড়ি হিসেবে অনেকেই চেনে। খবর শুনে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন দেখতে আসে। এতে আমার ভালোই লাগে। তেমন কোনো ক্ষতি করে না। তবে, বকের মল থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ আসে। তারপরও চাই ওরা আমার বাড়িতেই থাকুক। পাশাপাশি সরকারিভাবে বকগুলো সংরক্ষণেরও দাবি জানাই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর এমএ আজিজ বলেন, প্রকৃতির এই বিষয়গুলো পর্যটনের একটা অন্যতম অংশ। যেসব এলাকায় ব্যাপক পাখির বসবাস, সেসব স্থানকে কেন্দ্র করে পর্যটন স্পট গড়ে উঠতে পারে। এগুলো সংরক্ষণে সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে এতে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র লাভবান হবে।
এ ব্যাপারে বন অধিদপ্তরের সুফল প্রকল্পের ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর মদিনুল আহসান বলেন, যেসমস্ত এলাকা নিরাপদ এবং খাবারের সহজ উৎস রয়েছে সেখানেই বক বা অন্যান্য পাখিরা কলোনি গড়ে তোলে। তাই সুন্দরবন কাছে হলেও বকরা নিরাপদ স্থান হিসেবে লোকালয়ের ওই স্থানকে বেছে নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে বকের কলোনি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, বক কলোনি যাতে টিকে থাকে সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কালের কন্ঠ


