
সনজীবন কুমার
“চোর”বিষয়ে পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ রচনা আছে। সেটি বলবো,তার আগে কলম চুরির এই গল্পটা পড়ুন।
এই পোষ্টে দুটি কলমের ছবি দেখছেন তো। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন,কলমের সাথে টাইট করে সুতো বাঁধা আছে। কেন ? যাতে কেউ খুলে নিতে না পারে, মোদ্দা কথায় চুরি করতে না পারে । হ্যা, নিউইয়র্কে বাঙালি এলাকার টিডি ব্যাংকগুলো এখন খুব চালাক হয়ে গেছে।
টিডি ব্যাংক আগে বোকা ছিল, তখন বাঙালিরা অকারণে-অপ্রয়োজনে এই ব্যাংকে ঢুকে দুই/একটি কলম পকেটে পাচার করতো। এই চৌর্য্যবৃত্তি ( সিঁধেল চুরি করা যেমন চৌর্য্যবৃত্তি ব্যাংকের কলম চুরি করাও তেমনি চৌর্য্যবৃত্তি ) করার সময় বাঙালরিা খুব কৌশলে এদিক-ওদিক আড় চোখে দেখ। দেখে এই জন্য যে ,ব্যাংকের ষ্টাফরা কেউ দেখে ফেললো কি না, অথবা কোন বাঙালি। ব্যাংকের কেউ দেখে ফেললে তেমন কিছু যায় আসে না। কিন্ত বাঙালি দেখে ফেললে সর্বনাশ। কারণ বাড়িতে গিয়েই বলবে,জানো, ব্যাংকে ‘এক বাঙালি ব্যাটা’ তিন/চারটা কলম চুরি করে পকেটে ঢুকালো।
দরকারের জন্য কলম নিয়ে শুধু পকেটেই রাখে না। দেখবেন, এই কলম বাংলাদেশেও তাদের আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে কলম দানীতে শোভা পাচ্ছে।
ছবি : নিউইয়র্ক জ্যাকসন হাইটসের টিডি ব্যাংক
টিডি ব্যাংকে কলম চুরি হয় বলেই সুতোর ব্যবহার বেড়েছে। আর এই সুতো উৎপাদনের সাথে কত শিল্প-কারখানা জড়িয়ে আছে, কত মানুষ এই সুতা উৎপাদনে কাজ করে সংসার চালায়। তা যদি ভাবি তবে কলম চুরি বিদ্যাটা কিন্ত খারাপ না ( যদি না পড়ে ধরা)।
এখন কৌতুকটি বলি-একজন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে “চোর” বিষয়ের উপর একটি রচনা লিখতে বলা হয়েছিল।
লেখাটা পড়ে আপনি অবাক হতেই পারেন—কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিটা একবার দেখুন। ছাত্রটি লিখেছিল— চোররাও একটি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
চোর আছে বলেই সিন্দুক, তালা, লকার, আলমারি ইত্যাদি তৈরি হয়। এসব তৈরি করতে গিয়ে বহু কারখানা ও কর্মশালায় মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
বাড়িতে দরজা-জানালায় ছিটকিনি, তালা, গ্রিল বসানোর জন্য রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকদের কাজ জোটে। বাড়ি, দোকান, স্কুল, কলেজ, অফিস ও কারখানা রক্ষার জন্য নিরাপত্তারক্ষী ও নাইট গার্ডের প্রয়োজন হয়।
সি সি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর ও বিভিন্ন সিকিউরিটি সিস্টেম তৈরির কোম্পানিগুলোও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। চোর থাকার কারণেই পুলিশ, আদালতের কর্মচারী, বিচারক, আইনজীবী—সবারই কাজ আছে।
পুলিশের জন্য ব্যারিকেড, অস্ত্র, গুলি, লাঠি, ইউনিফর্ম, গাড়ি ও বাইক কেনা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। চোর না থাকলে জেল, জেলর ও কারা-কর্মচারীদেরও কাজ থাকত না। মোবাইল, ল্যাপটপ, গাড়ি, বাইক, ইলেকট্রনিক্স, পার্স বা লিপস্টিক চুরি হলে মানুষ আবার নতুন করে কিনতে বাধ্য হয়—ফলে ব্যবসা বাড়ে।
অনেক বিখ্যাত ও কুখ্যাত চোর শেষমেশ রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে, যেখানে আরও বড় বড় চুরি হয়। আরও অনেক কিছু বলা যায়, তবে মোটের উপর দেশের অর্থনীতিতে চোরদের অবদান যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।
এই “গবেষণাধর্মী” রচনার জন্য শিক্ষক ছাত্রটিকে পূর্ণ নম্বর (১০০%) দেন এবং তাকে মেরিট লিস্টে স্থান দেন। আসলে দৃষ্টিভঙ্গিই সবকিছু! (সংগৃহীত)।
’স্বভাব যায় না মলে,ইজ্জত যায় না ধুলে” এই প্রবাদ বাক্যটি নিউইয়র্কের বাঙালিদের জন্যই বোধহয় লেখা হয়েছিল। এদের স্বভাবের কোন পরিবর্তন হবে না। তা সে বাঙালিরা চাঁদে যাক বা পাতালে গিয়ে নাক ডেকে ঘুমাক। বাঙালি যেন পণ করেছে, তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পার অথবা অপবাদ দিয়ে ছোট করতে পার কিন্ত বদ অভ্যাস থেকে আমাদের দূরে রাখতে পারবা না। জান দেব কিন্ত চুরি বন্ধ করবো না। আর এই খাসলতের জন্য বিশ্বের সব জায়গায় বাঙালির নাক কাটা যাচ্ছে।
বাঙালির এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মানষিকতার পরিবর্তন হবে কবে ? কেউ কি বলতে পারেন ? না কি কবি গোলাম মোস্তফার ‘শিশুর পণ’ পদ্যটি সারা জীবন এইভাবেই পড়তে হবে-
‘এই করিনু পণ
মোরা এই করিনু পণ
চুরি দিয়ে গড়ব মোরা
মোদের এই জীবন।’
অসীর চেয়ে যদি মসি বেশী শক্তিশালী হয়,তবে সেই মসির (কলম) এ অবস্থা কেন ? কোথায় গেল তার শক্তি ? কেন সকল বন্ধন ছিন্ন করতে পারছে না ? তবে কি বাঙালির চুরি বিদ্যার কাছে কি হার মানলো টিডি ব্যাংকের কলম?
এখন প্রশ্ন, কোমড়ে সুঁতো লাগিয়ে কলমকে যে দাসত্বের শিঙ্খলে বেধেঁ রাখা হলো,এটা কি ঠিক হয়েছে ? না কি মেটিক্যুলাস ডিজাইন ?
যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তা হলে আসুন জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় বজ্রকন্ঠে প্রতিবাদ করি। শ্লোগান তুলি,‘কলমের কোমড়ে দড়ি বেঁধে, মব সন্ত্রাস বন্ধ কর’, ‘চুরি আমার অধিকার,রুখবে চুরি সাধ্য কার’।
আর যদি ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ঠিক হয়, তবে বলতে হবে – ”এই করেছ ভালো, নিঠুর হে, নিঠুর হে, এই করেছ ভালো। এমনি ক’রে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো॥”
কলম হচ্ছে শক্তি,সাহস ও সভ্যতার প্রতীক, সেই কলমের কোমড়ে দড়ি ! হায় ! হতভাগা কলম আমার ।