সন্ধান২৪.কম : গত ৩ জুলাই শুক্রবার ভারতের সেনাধ্যক্ষ প্রতিরক্ষামন্ত্রী লাদাখ সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে সাতসকালে নিজেই লাদাখে গিয়ে হাজির হবেন, হিমালয়ের ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় সিন্ধুর তীরবর্তী ফ্রন্টিয়ার পোস্ট নিমুতে গিয়ে সেনাদের উদ্দেশে বলিষ্ঠ ভাষণ দেবেন; তা কেউ ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি।
সেনাধ্যক্ষ এমএম নারাভানেকে নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লাদাখ সফরে যাবেন, এমনটাই ঠিক ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে সে সফর স্থগিত করা হয়।
লাদাখে প্রধানমন্ত্রীর এই অঘোষিত সফর যে ছিল ভারতীয় সেনাদের মনোবলকে আরও চাঙ্গা করে তুলতেই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গত ১৫ জুন লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ভারতীয় বাহিনীর জন্য খুব দরকার ছিল, সামরিক ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষকরা সে কথাও বলছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।
প্রধানমন্ত্রী মোদি লাদাখে এদিন তার আগ্রাসী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষায়, সেনা সদস্যদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় এবং আক্রমণাত্মক ভাষণে পরিষ্কার এই বার্তাই দিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে সংঘাতকে ভারত চুপচাপ হজম করে নেবে না। চীনের নাম না-করেও কড়া নিন্দা করেছেন তাদের ‘বিস্তারবাদে’র, যার মাধ্যমে এই প্রথমবারের মতো তিনি কার্যত মেনেও নিয়েছেন চীন ভারতের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে।
তাহলে কি ভারত চীনের সঙ্গে, সীমিত আকারে হলেও, একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী মোদির এদিনের অপ্রত্যাশিত লাদাখ সফরের পর এই প্রশ্নটা কিন্তু এখন আবার জোরেশোরে উঠতে শুরু করেছে। যার উত্তর খুঁজতে বাংলা ট্রিবিউন কথা বলেছে ভারতে ও ভারতের বাইরে একাধিক বিশেষজ্ঞর সঙ্গে।
মারুফ রাজা (সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ) : লাদাখের অপারেশনাল পরিস্থিতিটা ঠিক কী, আজই প্রথম প্রধানমন্ত্রী সরাসরি মিলিটারি কমান্ডারদের কাছ থেকে সেই ব্রিফিংটা পেলেন। প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলারা নন, তাকে এই ব্রিফিংটা দিলেন সেই সেনা অফিসাররা, যারা পূর্ব লাদাখে রোজ চীনা বাহিনীর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। এবং আমি নিশ্চিত, আলোচনার মাধ্যমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যে চীনকে সরানো যাবে না, প্রধানমন্ত্রী মোদি সেটা আজ বিলক্ষণ বুঝে গেছেন। সেই নেহরুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণ মেননের সময় থেকেই ভারত এই ভুল করে এসেছে– চীনকে এক ইঞ্চিও সরানো যায়নি। ফলে ভারতকে যে এবার নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সীমিত আকারে হলেও চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।.
ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি (সিনিয়র ফেলো, স্টিমসন সেন্টার, ওয়াশিংটন ডিসি) : এই মুহূর্তে ভারতের ‘নন-মিলিটারি অপশন’ বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ যুদ্ধ না-করে কূটনৈতিক পথে বা আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের উপায় প্রায় নেই বললেই চলে। আর একটা রাস্তা হতে পারে, চীন এই মুহূর্তে গালওয়ান, হট স্প্রিং বা প্যাংগং লেকের ধারে যেসব এলাকা দখল করে বসে আছে, ভারত বলতে পারে ‘সেগুলো কখনোই আমাদের ছিল না– কাজেই বিতর্কেরও কোনও অবকাশ নেই।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি হয়তো ভাবছেন সেটা তার জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা’র শামিল হবে। তার এদিনের মুভগুলো দেখেও আমার মনে হচ্ছে ভারত একটা পুরোদস্তুর মিলিটারি কনফ্লিক্টের জন্য সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে। অচিরেই হয়তো চীন সীমান্তের পুরো ২০০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই ভারত বাড়তি সেনা মোতায়েন করবে, যেটা সে দেশে অনেক বিশেষজ্ঞই পরামর্শ দিচ্ছেন। লাদাখ সীমান্তে চীন এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তারপরেও হয়তো ভারতকে একটা এসপার-ওসপার করার চেষ্টা করতেই হবে। কৌশিক মুখোপাধ্যায় (স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট, দিল্লি): আমি প্রধানমন্ত্রী মোদির আজকের বক্তব্যকে পুরোপুরি ‘ওয়ার বিউগল’ বা রণভেরী বাজানোর সংকেত হিসেবেই দেখছি। তার কথাগুলোর যদি ‘বিটুইন দ্য লাইনস’ পড়া যায় তাহলেই দেখবেন তিনি শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রধারী রূপের কথাও বলেছেন, অর্থাৎ তার সংহার মূর্তির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। দেশের জন্য আত্মত্যাগের গরিমাকে তুলে ধরেছেন। আহত সেনাদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ‘বীর মাতা’দের জানিয়েছেন শত শত প্রণাম– যারা তাদের সন্তানদের দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে পাঠিয়েছেন অবলীলায়। অর্থাৎ আসন্ন যুদ্ধে আরও বহু সন্তানকে জীবন দিতে হতে পারে, তার কথায় সেই ইঙ্গিতও ছিল স্পষ্ট। যুদ্ধ হলে কী হবে, কোন আকারে হবে সেগুলো পরের কথা– তবে ভারত যে চীনের আগ্রাসন ও বিস্তারবাদের জবাব দিতে তৈরি হচ্ছে, সেটা তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন।
লাদাখ সফরে নরেন্দ্র মোদী
সন্ধান২৪.কম : গত ৩ জুলাই শুক্রবার ভারতের সেনাধ্যক্ষ প্রতিরক্ষামন্ত্রী লাদাখ সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে সাতসকালে নিজেই লাদাখে গিয়ে হাজির হবেন, হিমালয়ের ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় সিন্ধুর তীরবর্তী ফ্রন্টিয়ার পোস্ট নিমুতে গিয়ে সেনাদের উদ্দেশে বলিষ্ঠ ভাষণ দেবেন; তা কেউ ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি।
সেনাধ্যক্ষ এমএম নারাভানেকে নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লাদাখ সফরে যাবেন, এমনটাই ঠিক ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে সে সফর স্থগিত করা হয়।
লাদাখে প্রধানমন্ত্রীর এই অঘোষিত সফর যে ছিল ভারতীয় সেনাদের মনোবলকে আরও চাঙ্গা করে তুলতেই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গত ১৫ জুন লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ভারতীয় বাহিনীর জন্য খুব দরকার ছিল, সামরিক ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষকরা সে কথাও বলছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।
প্রধানমন্ত্রী মোদি লাদাখে এদিন তার আগ্রাসী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষায়, সেনা সদস্যদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় এবং আক্রমণাত্মক ভাষণে পরিষ্কার এই বার্তাই দিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে সংঘাতকে ভারত চুপচাপ হজম করে নেবে না। চীনের নাম না-করেও কড়া নিন্দা করেছেন তাদের ‘বিস্তারবাদে’র, যার মাধ্যমে এই প্রথমবারের মতো তিনি কার্যত মেনেও নিয়েছেন চীন ভারতের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে।
তাহলে কি ভারত চীনের সঙ্গে, সীমিত আকারে হলেও, একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী মোদির এদিনের অপ্রত্যাশিত লাদাখ সফরের পর এই প্রশ্নটা কিন্তু এখন আবার জোরেশোরে উঠতে শুরু করেছে। যার উত্তর খুঁজতে বাংলা ট্রিবিউন কথা বলেছে ভারতে ও ভারতের বাইরে একাধিক বিশেষজ্ঞর সঙ্গে।
মারুফ রাজা (সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ) : লাদাখের অপারেশনাল পরিস্থিতিটা ঠিক কী, আজই প্রথম প্রধানমন্ত্রী সরাসরি মিলিটারি কমান্ডারদের কাছ থেকে সেই ব্রিফিংটা পেলেন। প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলারা নন, তাকে এই ব্রিফিংটা দিলেন সেই সেনা অফিসাররা, যারা পূর্ব লাদাখে রোজ চীনা বাহিনীর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। এবং আমি নিশ্চিত, আলোচনার মাধ্যমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যে চীনকে সরানো যাবে না, প্রধানমন্ত্রী মোদি সেটা আজ বিলক্ষণ বুঝে গেছেন। সেই নেহরুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণ মেননের সময় থেকেই ভারত এই ভুল করে এসেছে– চীনকে এক ইঞ্চিও সরানো যায়নি। ফলে ভারতকে যে এবার নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সীমিত আকারে হলেও চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।.
ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি (সিনিয়র ফেলো, স্টিমসন সেন্টার, ওয়াশিংটন ডিসি) : এই মুহূর্তে ভারতের ‘নন-মিলিটারি অপশন’ বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ যুদ্ধ না-করে কূটনৈতিক পথে বা আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের উপায় প্রায় নেই বললেই চলে। আর একটা রাস্তা হতে পারে, চীন এই মুহূর্তে গালওয়ান, হট স্প্রিং বা প্যাংগং লেকের ধারে যেসব এলাকা দখল করে বসে আছে, ভারত বলতে পারে ‘সেগুলো কখনোই আমাদের ছিল না– কাজেই বিতর্কেরও কোনও অবকাশ নেই।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি হয়তো ভাবছেন সেটা তার জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা’র শামিল হবে। তার এদিনের মুভগুলো দেখেও আমার মনে হচ্ছে ভারত একটা পুরোদস্তুর মিলিটারি কনফ্লিক্টের জন্য সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে। অচিরেই হয়তো চীন সীমান্তের পুরো ২০০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই ভারত বাড়তি সেনা মোতায়েন করবে, যেটা সে দেশে অনেক বিশেষজ্ঞই পরামর্শ দিচ্ছেন। লাদাখ সীমান্তে চীন এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তারপরেও হয়তো ভারতকে একটা এসপার-ওসপার করার চেষ্টা করতেই হবে। কৌশিক মুখোপাধ্যায় (স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট, দিল্লি): আমি প্রধানমন্ত্রী মোদির আজকের বক্তব্যকে পুরোপুরি ‘ওয়ার বিউগল’ বা রণভেরী বাজানোর সংকেত হিসেবেই দেখছি। তার কথাগুলোর যদি ‘বিটুইন দ্য লাইনস’ পড়া যায় তাহলেই দেখবেন তিনি শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রধারী রূপের কথাও বলেছেন, অর্থাৎ তার সংহার মূর্তির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। দেশের জন্য আত্মত্যাগের গরিমাকে তুলে ধরেছেন। আহত সেনাদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ‘বীর মাতা’দের জানিয়েছেন শত শত প্রণাম– যারা তাদের সন্তানদের দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে পাঠিয়েছেন অবলীলায়। অর্থাৎ আসন্ন যুদ্ধে আরও বহু সন্তানকে জীবন দিতে হতে পারে, তার কথায় সেই ইঙ্গিতও ছিল স্পষ্ট। যুদ্ধ হলে কী হবে, কোন আকারে হবে সেগুলো পরের কথা– তবে ভারত যে চীনের আগ্রাসন ও বিস্তারবাদের জবাব দিতে তৈরি হচ্ছে, সেটা তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন।