বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) কেমিক্যাল তথা রাসায়নিক পণ্য মজুত সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। এ সংক্রান্ত সব বিষয় তদারকির জন্য নেই আলাদা কোনো কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আইসিডি পরিচালনার জন্য ২০২১ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংশোধিত নীতিমালা জারি করে। কিন্তু সেই নীতিমালায় রাসায়নিক পণ্যের বিষয়ে কিছু বলা নেই। কেবল উচ্চ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষ পণ্য রাখার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরকারি নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। তবে বেসরকারি আইসিডিগুলোকে আইএসপিএস কোড অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলেছে।
কিন্তু ডিপোগুলোতে আইএসপিএস কোড যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা মনিটর হচ্ছে না। এনবিআরের নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা-সে বিষয়েও তদারকি নেই বলে অভিযোগ আছে। ডিপোগুলোতে রাসায়নিক বা বিস্ফোরকদ্রব্য হ্যান্ডলিং হলেও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ডিপোতে কী হ্যান্ডলিং হচ্ছে না হচ্ছে বা কীভাবে হচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ নেই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের।
এদিকে নীতিমালা এবং পৃথক তদারকি সংস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছে বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো। বিশেষ করে শনিবার সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর এ খাতের অন্য ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত।
এ ঘটনায় শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাসহ প্রায় অর্ধশত মানুষের প্রাণহানি ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ায় আইসিডিগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএম ডিপো পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি, অদক্ষতা ও সীমাবদ্ধতা ছিল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে ডিপো কর্তৃপক্ষ বলছে, এনবিআরের নীতিমালা ও আইএসপিএস কোড অনুসরণ করেই তাদের ডিপো পরিচালিত হচ্ছিল। এই ঘটনাটিকে তারা প্রাথমিকভাবে নাশকতা হিসাবেই দেখছেন।
চট্টগ্রামে আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বন্দরের সহযোগী তথা বেসরকারি পোর্ট হিসাবে গড়ে উঠেছে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো। চট্টগ্রামে এ ধরনের কনটেইনার ডিপো রয়েছে ১৯টি। ১৯৯৮ সালে কনটেইনার ডিপোর স্থাপন ও পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। ২০১৬ সালে এই নীতিমালা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়। ২০২১ সালে এনবিআর নতুন নীতিমালা এবং প্রজ্ঞাপন জারি করে। সর্বশেষ ওই নীতিমালার কোথাও রাসায়নিক পণ্য মজুত, সংরক্ষণ ও সরবরাহের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলা নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম কাস্টমস, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ ৬টি সরকারি সংস্থার অনুমতি বা ছাড়পত্র নিয়েই বেসরকারি কনটেইনার ডিপো স্থাপন করার বিধান আছে। বেসরকারি ডিপোগুলো শতভাগ রপ্তানি পণ্য ও ৩৭ ধরনের আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং করে থাকে। সব ডিপোতেই কাস্টমসের অফিস রয়েছে।
সূত্র জানায়, আইসিডি নীতিমালায় ডিপো পরিচালনার ক্ষেত্রে আইএসপিএস কোড অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা কর্তৃক প্রণীত এই কোডে বন্দর ও বন্দর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে গ্রহণ করা হবে সেসব বলা আছে। চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বিএম ডিপো পরিদর্শন শেষে ওই ডিপোতে আইএসপিএস কোড অনুসরণ করা হচ্ছিল বলে মন্তব্য করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বেসরকারি আইসিডি/সিএফএস বা অফডক স্থাপন ও পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা ঘেঁটে দেখা গেছে, কোথাও ডিপোতে কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ সংরক্ষণ, মজুত ও সরবরাহ কীভাবে করা হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই।
২০২১ সালে জারি করা এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে আইসিডির সেফটি ও সিকিউরিটি ব্যবস্থা সংক্রান্ত ৫ নম্বর শর্তের ‘গ’ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কারেন্সি সিকিউরিটি পেপার, স্ট্যাম্প পেপার ইত্যাদি উচ্চ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষ পণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে এলাকা নির্ধারণ করে অতিরিক্ত সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
‘ঘ’ অনুচ্ছেদে বলা আছে অগ্নিনির্বাপণ ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত শর্ত নমুনা অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব বলেন, ‘চট্টগ্রামে স্থাপিত বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো সরকারের ৬টি সংস্থার অনুমোদন নিয়ে নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। তবে নীতিমালার কোথাও রাসায়নিক পণ্য সংরক্ষণ মজুত ও সরবরাহের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বা নির্দেশনা নেই। আন্তর্জাতিক আইএসপিএস কোডের কথা বলা আছে। আইএসবিএস কোড মেনেই ডিপোগুলো চলে। তবে তিনি বলেন, কেমিক্যাল রপ্তানি হয় খুব কমই।
এ কারণে কেবল কেমিক্যালের জন্য আলাদা ডিপো করা বা ডিপোর বাইরে আলাদা শেড করার মতো সক্ষমতা এখনো বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠেনি। রাসায়নিক পদার্থ ডিপোতেই অন্যান্য পণ্যের কনটেইনার থেকে ৬০ ফুট দূরত্বে আলাদা শেডে রাখা, কনটেইনারের গায়ে দাহ্য পদার্থ বা রাসায়নিক পদার্থের কথাটি লেখা ও নিরাপদে হ্যান্ডলিং করার নির্দেশনা রয়েছে এবং সেভাবেই তা করা হয়।
স্মার্ট গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড দেশের ৬টি কোম্পানি উৎপাদন করে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে এই পণ্য রপ্তানি হয়। অন্যান্য পণ্যের মতো এই পণ্যটিও ডিপোতে আসার পর শুল্কায়ন শেষে বন্দরের মাধ্যমে জাহাজে করে বিদেশে রপ্তানি হয়। ডিপোতে কাস্টমসের অফিস রয়েছে।
কাস্টমসের অনুমতি ছাড়া এখানে শুধু রাসায়নিক পণ্যই নয়; কোনো ধরনের পণ্য রাখা, কনটেইনার খোলা বাধার সুযোগ নেই। এনবিআরের যে নীতিমালা আছে সে নীতিমালা মেনেই তাদের ডিপো পরিচালিত হচ্ছে। তবে যে দুর্ঘটনাটি ঘটে গেছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অত্যন্ত দুঃখজনক। হতাহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই এখন তাদের কাছে মুখ্য।


