নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম পাগলা ঘোড়ার গতিতে বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প ও মধ্যআয়ের মানুষ। ব্যয়ের সঙ্গে আয় না বাড়ায় জীবিকা নির্বাহ করতে একদিকে জীবনযাত্রার মানে লাগাম টানতে হয়েছে, অন্যদিকে হাত পড়েছে সঞ্চয়ে। অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে সংসার খরচ মেটাচ্ছেন। এতে বর্তমান সঞ্চয়ের স্থিতি যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি নতুন সঞ্চয়ের গতিও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চয়ের স্থিতি কমেছে।
বাজার দরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত এক বছরের ব্যবধানে চালের দাম ১৮ দশমিক ২০ শতাংশ, সয়াবিন তেলের দাম সাড়ে ২১ শতাংশ, ডালের দাম ২৩ শতাংশ, আটার দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া অন্যান্য প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। সেবার মধ্যে গণপরিবহণের ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রায় সব পণ্যের দামে এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণেও সেবা ও পণ্যের দাম বেড়েছে।
করোনার কারণে গত এক বছরে পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে। এতে বেড়ে গেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। কিন্তু করোনার কারণে গত দুই বছরে মানুষের আয় বাড়েনি। বরং কমেছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে মানুষকে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে। বাড়তি ব্যয় মেটাতে অনেকেই নতুন সঞ্চয় করা কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকে আগের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে আসছে। সম্প্রতি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের (সিপিএ) এক জরিপে দেখা গেছে. ২৬ শতাংশ মানুষ এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। ঋণ করে খাদ্যের পেছনে ব্যয় করছেন ৩৪ শতাংশ পরিবার। আগে এ হার আরও বেশি ছিল।
সঞ্চয় কমার এই প্রবণতাকে ভালো চোখে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, সঞ্চয় কমার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে। জিডিপির আকার বাড়াতে হলে সঞ্চয়ও বাড়াতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, দেশের মোট জিডিপির মধ্যে সঞ্চয়ের হার ২৪ শতাংশ। এ হার কমপক্ষে ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। যেখানে সঞ্চয় বাড়ানোর কথা। সেখানে কমছে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সঞ্চয় কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। গ্রাহকরা দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সঞ্চয় ভাঙলে সেটা আরও খারাপ। ভোক্তাদের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের মিল নেই। ফলে তারা সঞ্চয় ভাঙছে। রাতারাতি আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। দ্রব্যমূল্য বাড়ার কারণে এমনটি হয়েছে। এখন দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে। তাহলে ভোক্তার ব্যয় কমবে। তখন আবার সঞ্চয় বাড়তে শুরু করবে।
সূত্র জানায়, গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে ব্যাংকে সঞ্চয় বেড়েছিল সাড়ে ৪৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধি তো বাড়েইনি, উল্টো আরও কমেছে সাড়ে ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধি অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে সঞ্চয় হয়েছিল ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছে ৫০ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।
গ্রাহকরা ব্যাংকে দুই ধরনের সঞ্চয় করেন। মেয়াদি আমানত ও চলতি আমানত। মেয়াদি আমানত রাখা হয় বিভিন্ন সঞ্চয়ী প্রকল্পের আওতায়। এতে মুনাফার হার একটু বেশি থাকে। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষ মুনাফার আশায় এতে সঞ্চয় করেন। গত অর্থবছরের ওই সময়ে এ সঞ্চয় বেড়েছিল ২৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এতে প্রবৃদ্ধি তো বাড়েনিই, উলটো কমেছে সাড়ে ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরে ওই সময়ে এ খাতে সঞ্চয় বেড়েছিল ৯৮ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে মাত্র ৫৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম।
ব্যাংকে যেসব সঞ্চয় থাকে চলতি আমানত হিসাবে। যে কোনো সময় এ অর্থ গ্রাহক তুলে নিতে পারে। এতে কোনো শর্ত নেই। এর মধ্যে চলতি হিসাবে যে আমানত থাকে তার বিপরীতে কোনো সুদ দেওয়া হয় না। সাধারণ আমানতে যৎসামান্য সুদ দেওয়া হয়। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে চলতি আমানত বেড়েছিল ২২৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধিও হার কমেছে ১৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরের ওই সময়ে এ খাতে আমানত বেড়েছিল ৬ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে কোনো আমানত বাড়েনি। উলটো আগের আমানত থেকে কমেছে ৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। মোট আমানতের ৮০ শতাংশই মেয়াদি আমানত। ফলে মেয়াদি আমানত কমলে সার্বিক সঞ্চয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু চলতি আমানতের হার মোট আমানতের ২০ শতাংশ। যে কারণে এ আমানত কমলেও খুব বেশি প্রভাব পড়ে না মোট সঞ্চয়ে। তবে চলতি আমানত যে কোনো সময়ে তুলে নেওয়া যায়, এতে কোনো মুনাফাও মেলে না। এ কারণে সঞ্চয় ভাঙতে হলে আগে চলতি আমানত থেকেই টাকা তুলে। যে কারণে এ আমানত বেশি কমেছে।
মুদ্রা সরবরাহের মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ নগদ আকারে বাজারে ছাড়িয়ে ছাড়া হয়। দেশে মোট মুদ্রা সরবরাহ ১৬ লাখ ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদ আকারে বাজারে ছাড়া হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। মোট মুদ্রার ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে গত জানুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই মানুষের হাতে আছে। গত জুনে ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে মানুষের হাতে থাকা মুদ্রা কমেছিল ২৩৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ১৩৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের মানুষ সঞ্চয়মুখী। এটি ভালো প্রবণতা। সুষমে সঞ্চয় করে দুঃসময়ের জন্য। এখন সঞ্চয় কমার অর্থ হলো মানুষ এখন সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে আয়ে যে ধাক্কা লেগেছে তা এখন ঠিক হয়নি। তবে আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। আরও ভালো হতে হবে। তবে দ্রব্যমূল্য যেভাবে তাতে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। তা না হলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
সূত্র জানায়, ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা টাকা তুলে নেওয়ার কারণে ব্যাংকবহির্ভূত মুদ্রার হার বেড়েছে। একই কারণে আমানত কমছে।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কো-অপারেটিভ সংস্থা ও বিশেষায়িত ব্যাংকের আমানত প্রবাহ কমেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে আমানত ছিল ৪৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত তা কমে ৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হয়েছে। ওই সময়ে আমানত কমেছে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত ৪৩ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা থেকে কমে ৪২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হয়েছে। কো-অপারেটিভ সংস্থাগুলোতে ২৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা থেকে কমে ২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা হয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকে ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা থেকে কমে ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা হয়েছে।
এদিকে সরকারি সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমে গেছে। তবে গত মাসে বাড়তে শুরু করেছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের কড়াকড়ির কারণে এ খাতে বিনিয়োগ কম। গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি নিট বেড়ে ছিল ২৭৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ হার না বেড়ে বরং কমেছে ৫৩ শতাংশ। একই সঙ্গে মূল অর্থ পরিশোধ গত অর্থবছরে বেড়েছিল ২০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বেড়েছে ২২ শতাংশ।
এদিকে আমানতের সুদের হার বেশ কমে গেছে। মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মুনাফার হার কম। গত ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। ব্যাংকের সঞ্চয়ে গড় মুনাফার হার ৫ শতাংশের নিচে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ৬ শতাংশের নিচে।


