সন্ধান২৪.কম : বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজতের বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান এবং বাবুনগরী ও মামুনুল হকের গ্রেফতার দাবিতে ঢাকায় ৬০ সংগঠন দীর্ঘ মানববন্ধন করেছে।
বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবীদের ৬০টি সংগঠন। তা না হলে বাংলার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ জবাব দেবে। পরিণাম ভালো হবে না বলে হুঁশিয়ার করে দেন বিশিষ্টজনরা। গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক মানববন্ধনে এই হুঁশিয়ারি দেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবীদের ৬০টি সংগঠন। বঙ্গবন্ধু ও সংবিধান অবমাননার অভিযোগে হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী এবং যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেফতার দাবিতে এই মানববন্ধনের আয়োজন করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। মানববন্ধনটি রাজধানীর মৎস্য ভবন থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, ঢাকা ক্লাব, শাহবাগ মোড় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। মানববন্ধনে অবিলম্বে হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনাইদ বাবুনগরী, যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেফতার এবং জামায়াত-হেফাজতের মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান বক্তরা।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী একেএম মোজাম্মেল হক, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক আবেদ খান, ইতিহাসের অধ্যাপক, গবেষক মুনতাসীর মামুন, গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তসহ বিশিষ্টজনরা।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেয়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বক্তব্য (ভাস্কর্যবিরোধী) প্রত্যাহার করতে হবে। না হলে বাংলার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ জবাব দেবে। পরিনাম ভালো হবে না। মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দেয়ার পরেও এখনও তাদের নিয়ে কিছু বলা হয়নি। এটাই আপনাদের সৌভাগ্য। দৃষ্টান্তমূলক পরিণামের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস্ পরশ বলেন, ‘এবার যখন আমরা ধরব, ফাইনাল হয়ে যাবে। এবার আর কোন কম্প্রোমাইজ (আপস) নয়। বাংলাদেশে একটা কুচক্রী মহল সৃষ্টি করে ফায়দা লোটা, এটা বারবার হবে না। কোথা থেকে টাকা আসছে, কী তাদের (মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি) অ্যাজেন্ডা-এসব ব্যাপারে প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া উচিত। প্রশাসনের তদন্তের মাধ্যমে আসল ষড়যন্ত্রকারী ও তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং এই দেশের মাটিতেই তাদের শাস্তি দিতে হবে। তাদের একেবারে নির্মূল করে দিতে হবে। তারা যেন বারবার আমাদের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘আমরা মনে করি, ভাস্কর্যের সঙ্গে ধর্মের কোন বিরোধ নেই। কাজেই যারা বাংলাদেশে ভাস্কর্যের সঙ্গে ধর্মের সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করছে, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করার সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে নদীতে ছুঁড়ে ফেলার মতো ধৃষ্টতা তারা দেখিয়েছে। তারা কোন অবস্থাতেই ভাস্কর্য করতে দেবে না বলেছে। কারা বলছে? তারা কারা? তারা হচ্ছে একাত্তরের পরাজিত সৈনিক, একাত্তরের পরাজিত শত্রু, তাদেরই উত্তরসূরি, একেবারেই তাদের প্রতীকী রূপ। মামুনুল হক থেকে শুরু করে চরমোনাই পীরের যে ছেলে এখন রিট করছে, প্রতিটা লোক বাবুনগরী, প্রতিটা লোকের সূত্র হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতা করা। সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মৌলবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এখন প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব বলেন, মৌলবাদের আস্ফালন রুখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তারা এত বছর ধরে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে, মানুষকে ভুল বুঝিয়ে এসেছে। এটা স্পষ্টভাবেই বলতে চাই, তারা বাংলাদেশকে একটা তালেবানি রাষ্ট্র করতে চায়। যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে, সেই বাংলাদেশ কখনও পাকিস্তানি, আফগানিস্তানি বা তালেবানি রাষ্ট্র হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর এই ধরনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে একত্রিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, “বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার নামে সাম্প্রদায়িক মহল দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যে চেষ্টাটি করছে, এটি শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।”
বক্তারা বলেন, আজকে যে অন্ধ মৌলবাদী শক্তি ভাস্কর্যের বিরোধিতা করছে, তাদের পুলিশি ব্যবস্থায় শাস্তি দিলেই হবে না। তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সচেতন করে তুলতে হবে যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো অক্ষয় থাকে। আজ আমরা মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপগোষ্ঠীগুলোর যে ধৃষ্টতা দেখছি, তা একদিনে তৈরি হয়নি। একাত্তরের পরাজিত এই অপশক্তিগুলোর প্রতি বারবার নতজানু নীতি প্রদর্শন করেছে বর্তমান সরকার। মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যা, পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকীকরণ, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণসহ নানাবিধ রাজনৈতিক মেরুদ-হীন কর্মকা-ের ফসলই হলো জাতির পিতাকে নিয়ে তাদের আজকের এই ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ। অবিলম্বে সংবিধান থেকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিল করে বাহাত্তরের অসাম্প্রদায়িক সংবিধানে ফিরে যেতে হবে। মৌলবাদের জুজুর ভয়ে রাষ্ট্রের প্রশ্রয়-আপসের অবসান ঘটাতে হবে।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ছাড়াও এ কর্মসূচিতে অংশ নেয় সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অ্যাসোসিয়েশন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, প্রজন্ম ’৭১, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ইতিহাস সম্মিলনী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সম্প্রীতি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংসদ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ), জাতীয় যুব জোট, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ কেন্দ্র, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন জাতীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধ সংহতি পরিষদ,. বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ), বাংলাদেশ ফার্মাসিস্ট ফোরাম, গৌরব ’৭১, অপরাজেয় বাংলা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার, কর্মজীবী নারী, জাতীয় নারী জোট, নারী মুক্তি সংসদ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, শেখ রাসেল ফাউন্ডেশন ইউএসএ (বাংলাদেশ চাপ্টার), জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা, সেক্যুলার ইউনিটি বাংলাদেশ, ইউথ ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, ঘাসফুল শিশু কিশোর সংগঠন, বাংলাদেশ মানবাধিকার আন্দোলন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলাদেশ।


